এমন সময়ে সুলতার তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হতে শোনা গেল, ও কি, ও কি করছে আপনি? ওটা আমার, আমাদের ওটা।
দরজার দিকে যেতে গিয়ে ভদ্রমহিলা হকচকিয়ে থমকে গেলেন। যাকে অন্তত বারকয়েক লীলা বলে ডাকতে শোনা গেছে কামরায়, সেই ভদ্রমহিলাই। আর এই বালির ঝড়ে যখন সুলতার চোখ যাচ্ছে তখন সে এ জিনিসটা ঠিকই লক্ষ্য করেছে, তাদের ছোট হ্যান্ডব্যাগটি ভদ্রমহিলার হাতে।
বালির ঝড়ের মধ্যেও ভদ্রমহিলার দুটি আয়ত চোখ লজ্জায় ও বিস্ময়ে উদ্দীপ্ত হলো। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থিতিয়ে গেলেন একেবারে। যদিও রং নেই ঠোঁটে, স্বাভাবিক রক্তাভাটা ছিলো। ঈষৎ পুরু ঠোঁট দুটি চকিতে একবার দংশে তাড়াতাড়ি সুলতাদের বেডিং এর ওপর হ্যান্ডব্যাগটা রেখে বলে উঠলেন, ‘ছি ছি, আমি একেবারে জানতে পারি নি। কিছু মনে করবেন না। কিন্তু—’
চোখে আর মুখে হাত চাপা দিলেন উনি। ঝড়ের কামাই নেই। বালি ঢুকছে। মাথায় সুলতার মতনই হবে। বয়সটা কম হতে পারে, বেশী হতে পারে। ধরবার উপায় নেই। কারণ এখন শিবনাথই দেখছে কি না। তবে সব মিলিয়ে, ভদ্রমহিলার শ্যাম চিক্কণ মুখে কিছু একটা বিশেষত্ব ছিলো। সেটা কী, বলা মুশকিল। বোধ হয় আকাশ নীল মানেই যে এক নয়, নানান রূপ অরূপের বিশেষত্ব থাকে, প্রায় সেই-ই রকম। স্নিগ্ধ উজ্জ্বল আর বোধ হয় সুন্দর। সে তাড়াতাড়ি সান্ত্বনা দিতে গেল। ততক্ষণে দরজার প্রায় বাইরে থেকে পুরুষ গলায় প্রশ্ন এল, “কি হয়েছে লীলা?”
লীলা বললেন, ‘কিছু নয়। আমাদের হ্যাণ্ডব্যাগটা নিয়েছ?’
জবাব এল, ‘নিয়েছি।‘
লজ্জায় ও বালির ঝড়ে যদিও রুদ্ধশ্বাস, তবু হাসলেন লীলা। বললেন, ‘ছি ছি, কী যে কাণ্ড!’
সুলতা কোনোরকমে আঁচলের বাইরে মুখ এনে বললো, তাতে কি? ওরকম হয়ে যায়।
মুক্তি পেলেন ভদ্রমহিলা। সুলতার ওকথাকটি যেন জেল সুপারিন্টেণ্ডেন্টের মুক্তির আদেশের মতো শোনাল। উনি নেমে গেলেন বালির ঝড়ের মধ্যে। শিবনাথ ততক্ষণে কুলিকে মাল তোলবার আদেশ দিয়েছে। তাড়া দিল সুলতাকে, চল চল, আর দেরি নয়। ওদিকে স্টীমার ছেড়ে দেবে আবার।
নামতে নামতে সুলতা মুখে কাপড় চাপা অবস্থায় বলে নিলো, পরের জিনিসের হাত দিতে গেলে সবাই ওরকম না-জানার ভান করে। ওসব আমার রে জানা আছে।
শিবনাথ যেন জানতো একথাটা সুলতা বলবেই। সে বললো, যাগকে। এবার সামনের দিকে তাকাও। ভবিষ্যৎ বড় অন্ধকার বোধ হচ্চে। এই, এই কুলি, আস্তে যাও।
কিন্তু সুলতা শিবনাথের কথারই খেই টানল, ‘না, ইয়ার্কি নয়, ওসব আমি জানি। ওটা আমার কত সাধের শৌখিন জিনিস জান? হাতিয়ে তোত নিয়েছিলো প্রায়। অমন সুন্দর ফুটফাট জিনিসটি দেখলে সকলেরই ভুল হয়ে যায়। আঃ! উঃ! গেলুম গেলুম।‘
শিবনাথ বললো, ‘বলছি তখন থেকে চুপ করো। মুখে বালি ঢুকে গেছে তো?’
সুলতার মুখ তখন শিবনাথের কুক্ষিতলে। সেখান থেকেই কাঁদো কাঁদো স্বরে জবাব এলো, শুধু মুখে নাকি? চোখ নাক কান সব বালিতে ভরতি হয়ে গেল। কী জঘন্য। আর কতদূর?
—আর একটুখানি।
শিবনাথও বেজায় রকম বেসামাল। তপ্তবালু তারও স্যান্ডেল পরা পা পোড়াচ্ছে। মুখে ও গায়ের ভোলা অংশে যেন কোটি কোটি বিষ-পিঁপড়ে হুল ফোঁটাচ্ছে ছুটে এসে। যেন বাস-ভাঙা-রোষে, ফুঁসে ফুঁসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এসে ইতিমধ্যে সন্ধ্যার অন্ধকারও নেমেছে। বুঝি একটা যোগ-সাজস করেই নেমেছে এই বালির ঝড়ের সঙ্গে। এক বালির অন্ধকারেই রেহাই নেই, তার ওপরে সন্ধ্যার কালিমা। আর অবস্থা সকলেরই সমান। কে যে কার ঘাড়ে পড়ছে। পা মাড়িয়ে দিচ্ছে, সে সব দেখবার বিচার করবার অবসর নেই। একটা গড্ডলিকা প্রবাহের মতো চলেছে সবাই লাইন ধরে। সামনের লোকটা ভুল করলে, পেছনের সব লোকেরই বিপথগামী হবার সম্ভাবনা।
তবু এ দুর্দৈবটা যেন শিবনাথের কাছে ধরাবাঁধা জীবনের একটি ব্যতিক্রমের উল্লাসে উচ্চকিত হয়ে উঠছে। কাজের চাপে পর্যুদস্ত সাব-এডিটরের বেসামাল অবস্থা তো নয় এটা। নিতান্ত বউ নিয়ে বেরিয়ে পড়া পথের খেলা এটা। আসুক না যত খুশি। কতক্ষণ আর। তবু তো জানা গেল বালির ঝড়ের লীলা। মরুভূমিতেও কি এমনি হয় নাকি। কী একটা কবিতা যেন তার মনে মধ্যে তোলপাড় করতে লাগলো; মুখে এলো না। তার আগেই সুলতার রুদ্ধ গলা শোনা গেল, কী সর্বনেশে ঝড়। আর কতদূর গো?
–‘এসে পড়েছি’
সুলতার অবস্থা দেখে কষ্ট হলো, হাসিও পেলো শিবনাথের। সে দেখলো আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে, সুলতা প্রায় একটি বোম্বাই সিলকের বস্তায় পরিণত হয়েছে। প্রায় ঝুলে পড়েছে শিবনাথের বলিষ্ঠ কাধ ধরে।
শিবনাথ বললো, ‘একটু সোজা হও, এইবার আমরা ঢালুতে নামছি।‘
সন্ত্রস্ত গলা শোনা গেল সুলতার, ‘পড়ে যাব নাকি?’
‘–না।‘
স্টীমারে পা দিতে না দিতেই বালির প্রকোপটা একেবারে শেষ হয়ে গেল। হাওয়াটা সম্ভবত পূর্ব-দক্ষিণাগামী। কিংবা পাগলা বেসামাল বাতাস। দিক ঠিক নেই। আপাতত নদীর বুক ঠেলেই বাতাস বহমান। তাতে জলকণা আছে, বালি নেই।
দোতলার প্রথম আর দ্বিতীয়শ্রেণীর অবস্থাও খুব সুখকর নয়। শুধু যে রুদ্র বৈশাখের তাপ দগ্ধ সমতলবাসীর পাহাড় ভ্রমণের টান, তা নয়। উত্তরবঙ্গ আর আসাম-গামী তাবৎ লোকের ভিড় একটি স্টীমারেই।
সুলতা কোনোরকমে একটু জায়গা করে নিয়ে শিবনাথকেও ডাকলো। তারপর হেসে ফেললো শিবনাথের ধবধবে সাদা ভ্র দেখে তাড়াতাড়ি নিজেরই রুমাল দিয়ে শিবনাথের ভ্র, চোখ, মুখ মুছে দিতে গেল।
