কিছুক্ষণ পরে মৃগাংক বলল, আমি চলি তাহলে।
নন্দিতা হাসল, বড় ক্লান্ত সে হাসি, কিন্তু কিছু বলল না। মৃগাংক ভাবল, ওর হাসিটা কেমন পুরন, বয়স্ক। ওর মনে হল, নন্দিতার শরীরে এখন অনেক ভাজ।
নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে ল্যাচকির চাবি ঘুরিয়ে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেল মৃগাংক। বাসবি বসে আছে ওর জন্য, টেবিলে খাবার ঢাকা। অপরাধীর মত মৃগাংক জিজ্ঞেস করল, ফিরলে কখন?
বাসবি বলল, সেই সন্ধেবেলা। জানো আজ সারাদিন খুব মজা হল। দাদার এক বন্ধু বিকাশদা জার্মানি থেকে ফিরেছে। বিকাশদার গাড়ি চড়ে সারাদিন ঘুরলাম আমরা, এয়ারপোর্ট, চিড়িয়াখানা, বোটানিক, কত কি দেখলাম। তুমি তো আর কোনোদিন নিয়ে যাও না।
মৃগাংক তাকিয়ে দেখল, বাসবির সারা মুখ উজ্জ্বল, উদ্ভাসিত। এই মুহূর্তে যে কোনো পুরুষই ওর প্রেমে পড়তে পারে।
বালির ঝড় – সমরেশ বসু
ট্রেন এসে পৌঁছুলো প্রায় এক ঘন্টা দেরিতে।
সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। কিন্তু দিকে দিকে প্রসারিত তার লেলিহান জিহ্বা এখনো গুটিয়ে নেওয়া হয়নি। এখনো গরম বাতাসের ঝাপ্টা! পায়ের তলায় আদিম পাথুরে-মাটিতে এখনো জ্বলন্ত অঙ্গারের উত্তাপ।
গাড়ির জানলা দিয়ে আগেই লক্ষ্য পড়েছিলো দগ্ধ-ধূসর তিন-পাহাড়ের পিঠ। এই পশ্চিমা সূর্যের জ্বলন্ত থাবায় যেন একটি অতিকায় পশুর মতো ঘাড় গুঁজে পড়ে আছে পাহাড়টা। পশুটা মৃতপ্রায়।
কিন্তু গাড়ি যতই সামনে এগোচ্ছিলো, ততই একটা জিনিস বুঝে ওঠা যাচ্ছিলো। দূরে ওগুলো কী? ওই ধোঁয়া ধূসর যেন মাটি থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আকাশব্যাপী অন্ধকার করে দিচ্ছে? যেন ওই অতিকায় পশুটা পা ছুঁড়ছে এখনো মরার যন্ত্রণায়? খাবি খাওয়ার মতো। বালি উড়ছে যেন তারই অন্তিম নখরাঘাতে—তার শেষ দাপাদাপিতে।
তারপর গাড়ি আরো এগিয়েছে। টের পাওয়া গেছে, বালি-ই উড়ছে। দিগব্যাপী অন্ধকার করে দিয়ে যেন একটা কাঁপালিক খ্যাপা হয়ে ফিরছে। হাসছে অট্টরোলে। আদিম মানবের জাদু-বিশ্বাসের একটা খেলা দেখাচ্ছে যেন সে।
সামনে মাঠ কি ঘাট কিছু বোঝার উপায় নেই। সম্ভবত খোলা চরভূমি। তারপরে গঙ্গা। কারণ, দূরে স্টীমারের একটি অস্পষ্ট ছায়া যেন দেখা যাচ্ছে। আরো দেখা যায়, যেন কতকগুলো প্রেতছায়া ছুটে আসছে। দেখা যেতে যেতেই ছায়াগুলো এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো ট্রেনের কামরায়। ওরা যে কুলি, তা আর চেনার উপায় নেই। ততক্ষণে খোলা জানলা দরজা দিয়ে গরম বালুকারাশি কামরাগুলো ভরে তুলতে আরম্ভ করেছে।
মুহূর্তে একটা বীভৎস তাণ্ডব শুরু হলো। ঝোড়োবাতাস আর বালু যেন তপ্ত খোলার মুড়ি-ভাজা বালি তার সঙ্গে মানুষের হাঁক-ডাক চীৎকার। মানুষের চেয়ে বেশী। কুলির ধস্তাধস্তি।
সুলতা-শিবনাথদের কামরাতেও তাণ্ডবটা শুরু হয়েছে। সুলতা ব্যাপারটা ঠিক বুঝতেই পারেনি। কিছুটা বুঝি বেলা শেষের আমেজে আর গাড়ির দোলানিতে ওর চোখ জড়িয়ে আসছিলো। তারপর সহসা বালুর আক্রমণে রুমাল চেপে ধরেছিলো মুখে। এবার বোম্বাই–
সিকের গোটা আঁচলটাই মুখে মাথায় টেনে এনে বিরক্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো, এটা কি হচ্ছে?
অবস্থাটা শিবনাথের খুব সুবিধের নয়। দম চাপতে গিয়ে, প্রায় দৈববাণীর মতো কড়া আর মোটা শোনালো তার গলা, বালির ঝড়।
এই সহসা-দুর্যোগের ওপর যেন রেগে উঠে, প্রায় শাসিয়ে উঠলো সুলতা, ‘বালির ঝড়? কী বিশ্রী।’
পশ্চিম গঙ্গার খেয়ালী ঢালু পাড়ে, দূরবিশারী এই ধুধু বালুচরে কোনো এক অজানা দিগন্ত থেকে ঝড় উঠে এসেছে কে জানে! মানুষের মন রাখা সুশী-বিশ্রীর চৈতন্য তার নেই। না মানে শাসন, না মানে কর্ষণ। গাড়িটা থেমেও না থেমে যতই চাকা ঘষে ঘষে ইঞ্চি ইঞ্চি এগোয়, ততই ঝড়ের দস্যিপনা বাড়ে।
এবার বিরক্তির চেয়ে কষ্টটাই টের পাওয়া গেল সুলতার, ‘উঃ, গেলুম! এ আমরা কোথায় এসেছি?’
যেন অনেক দূর থেকে জবাব দিলো শিবনাথ, শরিগলি ঘাট।
-তারপর?
এখানেই নামতে হবে আমাদের। নেমে স্টীমারে উঠতে হবে।
–ওরে বাবা!
বুঝি ভয় পেয়েই সুলতা দু’হাত বাড়িয়ে শিবনাথকে ধরে তার পিঠে মুখ জলো। শিবনাথেরও দু’চোখের কোল বালুকণায় ঝাপসা হয়ে গেল। সে সস্নেহে বললো, একটু সামলে নাও সুলতা। স্টীমারে গিয়ে উঠলে আর লাগবে না।
সুলতা প্রায় ঠোঁট ফুলিয়ে বললো, কী করে সামলাব। সব তছনছ করে দিচ্ছে
শিবনাথ হাসলো একটু। মুখ নামিয়ে এনে বললো, তা বেড়াতে গেলে একটু কষ্ট সইতে হয় না বুঝি! কষ্ট করলেই কেষ্ট মিলবে।
–যাও! তোমার সবটাতেই ফাজলামি। আমি বলে কানা হয়ে যাচ্ছি। আর গায়ে যেন ছুঁচ ফোঁটাচ্ছে গরম বালি, ইস্।
রক্তের মতো লাল তরল শাড়িটার আঁচল তখন লুটিয়ে পড়েছে। অতলপৃষ্ট জলের মতো লাল নাইলনের জামাটা শাড়ি পরিত্যক্তা। তেইশ চব্বিশ বর্ষণের অনেকটাই অনাবৃষ্টির লক্ষণাক্রান্ত শরীরে, অন্ধকারে নিওন-আলোর বিজ্ঞাপনের মতো অন্তর্বাস সুস্পষ্ট। প্রসাধন অনেক আগেই ধুয়ে মুছে গেছে ট্রেনের গরমে ও ঘামে। এখন চোখ ঘষে ঘষে কাজল হয়েছে চোখের কালি। বালি ইতিমধ্যেই সাদা স্তর ফেলেছে চুলে বালি খোঁপার ভাঁজে ভাঁজে।
শিবনাথের অবস্থা এমন কিছু ভাল নয়। তরে পুরুষ হওয়ার সুযোগটাই একমাত্র সুযোগ। সে কোঁচাকে মালকোচা করে নিয়েছে। রিস্টওয়াচে বেঁধেছে রুমাল।
এদিকে কুলিদের ডাকাতে-হাত পড়েছে তাদের মালের ওপর। কামরার অন্যদুটি পরিবার তখন কুলির মাথায় মালপত্তর চাপিয়ে নামতে উদ্যত। সুলতার আঁকড়ে ধরা হাত এবার কোমর থেকে না সরালে নয় শিবনাথের।।
