রণদাবাবু দীপা মারফত কাজরীকে বলে পাঠালেন যে, কুণালকে অ্যাসাইলামে ভর্তি না করালে কাজরীর সঙ্গে কোন সম্পর্ক তিনি রাখবেন না।
কাজরী বলল, নাই রাখলেন।
শেষ পর্যন্ত রণদাবাবু একটি চিঠি লিখলেন কাজরীকে। তিনি লিখলেন, কলেজে চাকরি ছাড়াও বাড়তি রোজগারের জন্য দু বেলা অতিরিক্ত খাটুনি খেটে তোমার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে শুনি। অবাঞ্ছিত কতকগুলো দায়িত্ব নিয়ে অনর্থক নিজেকে তুমি তিলে তিলে কেন ক্ষয় করছ জানি না। কুণাল ও তার মা-ভাইবোনদের দায়িত্ব নিয়ে তুমি আত্মনিগ্রহ করে যাচ্ছ। পত্রপাঠ তুমি ওদের ছেড়ে চলে এসে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন কর।
কাজরী এ চিঠির কোনও জবাব দেয়নি।
বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে প্রায় সকলেই কাজরীর ওপর বিরক্ত হল। কুণালকে ছেড়ে এসে আবার পুর্বের সহজ নির্ঞ্ঝাট জীবনের মধ্যে ফিরে আসতে পরামর্শ দিল ওরা সবাই। কাজরীর মনে হল, সমস্ত বিশ্বসংসার যেন তার বিরুদ্ধে এসে দাঁড়িয়েছে। মাঝে মাঝে অতল নৈঃসঙ্গবোধের মধ্যে তার মনটা যেন দিশেহারা হয়ে যায়, কুণালের ভাবলেশহীন চোখের দৃষ্টিতে সে যেন কোন আশ্রয়ই খুঁজে পায় না।
এক-একদিন তার মনে হয়, কুণাল বুঝি আর সেরে উঠবে না। ডক্টর মুখার্জির বিধাগ্রস্ত কথাবার্তাগুলি তার মনের মধ্যে আশঙ্কা জাগায়। যে আঁধার কুণালের চেনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সে যেন তার সমস্ত অস্তিত্ববোধকে ছেয়ে ফেলে।
কাজরীর সুমুখে তার সমস্ত ভবিষ্যৎ জুড়ে অবশ্যম্ভাবী আঁধারের ভয়। কুণালের আচ্ছন্ন চেতনায় এক নিমেষের জন্যও যদি একটু আলোর স্ফুলিঙ্গের সঞ্চার হত! একটি মুহূর্তের জন্যও যদি সে তাকে চিনতে পারত! এক নিমেষের জন্য যদি তার আঁধার মনে চাপা-পড়ে-থাকা বিপুল অভিমানকে ঘুচিয়ে দেবার সুযোগ পেত।
মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যায়। যেন নিষ্ফল ভারবহনের ক্লান্তিকর সম্ভাবনা নিয়ে এক-একটি দিনের প্রভাত আসে, সারাদিনের কাজকর্মে একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিগুলি মনে অবসাদ আনে। তার পর সুদীর্ঘ বিনিদ্র রাত্রি-জোড়া নৈঃসঙ্গবোধ। নিদ্রিত কুণালের মুখের দিকে চেয়ে মনের মধ্যে গুমরে ওঠে নিষ্ফল কান্না। কুণালের আধার মন যেন সমস্ত রাত্রিকে জুড়ে থাকে। তার সেই হারিয়ে-যাওয়া চোখের আলো আকাশের তারায় তারায় সুদূর স্বপ্নের স্মৃতির মত ঝিলিক দেয়। কুণালের চোখে আবার তা এসে মিশবে আর বুঝি তার কোন সম্ভাবনা নেই।
ব্যাকুলভাবে কুণালকে জড়িয়ে ধরে কাজরী বলে, সামান্য কয়েকটা মুহূর্তের জন্যও আমাকে দয়া করতে পার না? চিরদিনের মত আমাকে অপরাধী করে রাখবে? একটিবারও জানতে চাও না কী কঠিন প্রায়শ্চিত্ত আমি করে যাচ্ছি?
ডক্টর মুখার্জি বললেন, সেরে উঠতে বেশ কিছু সময় লাগবে মনে হচ্ছে।
কাজরী বলল, প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে ডক্টর মুখার্জি। আর কতদিন?
আর কতদিন!—ডক্টর মুখার্জি যেন অস্বস্তি বোধ করেন? সে তো আমি বলতে পারি নে মা।
কাজরী আকুল হয়ে বলে, ডক্টর মুখার্জি, পুরোপুরি ও সেরে উঠবে—এ যেন আর আশা করতে পারছি না। এখন ভাবছি, সামান্য কিছুক্ষণের জন্যও যদি ওর চৈতন্য হত!
তা কেন মা! কুণাল পুরোপুরিই সেরে উঠবে—ডক্টর মুখার্জি ঈষৎ ইতস্ততঃ করে বললেন।
কাজরী সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তার মুখের পানে তাকাল।
রণদাবাবু দীপাকে বললেন, আমি ভুলে যেতে চাই যে আমার মেয়ে বেঁচে আছে।
বান্ধবীদের মধ্যে একমাত্র দীপাই এসে মাঝে মাঝে খোঁজ নেয় কাজরীর।
দীপা একদিন বলল, বারো মাস—তিন শো পঁয়ষট্টি দিন একটা পাগলকে নিয়ে আছিস, অথচ সজ্ঞানে যারা তোর হিতাকাঙ্ক্ষী তাদের সংস্রব ছেড়েছিস! তোর জন্যে দুঃখ হয় কাজরী।
কাকে পাগল বলছিস তুই!—কাজরী প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।
দীপা বলে, কুণালের রোগটাকে তো অস্বীকার করতে পারিস না। পাগলকে পাগল বললে দোষ কী হয় ভেবে পাই নে।
কাজরী বেদনার্ত চোখে দীপার দিকে চেয়ে থাকে, কিছু বলে না।
দীপা বলল, রোগের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়। বাড়িতে রেখে কুণালের চিকিৎসার যত ভাল ব্যবস্থা কর না কেন, কোন ফল হবে না। তোর এই অহেতুক অন্ধ মমতা সব রকম চিকিৎসার প্রতিবন্ধক। ডক্টর মুখার্জির সঙ্গে আজ আমার দেখা হয়েছিল, তিনি বললেন, কুণালকে সারিয়ে তুলতে হলে প্রথমেই দরকার ওকে তোর কাছ থেকে সরিয়ে আনা।
সঙ্গে সঙ্গে কাজরীর বহু বিনিদ্র রাত্রির কালিমালিপ্ত চোখে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। রুদ্ধশ্বাস-চাপা উত্তেজিত স্বরে সে বলে ওঠে, ডক্টর মুখার্জির সঙ্গে তুই দেখা করতে গিয়েছিলি? কে বলেছিল তোকে যেতে?
দীপা হতভম্ব। আমতা আমতা করে বলে, কে আবার বলবে! কুণালের অবস্থাটা উনিই ভাল বলতে পারবেন বলে ওঁর কাছ গিয়েছিলুম।
কাজরী চিৎকার করে ওঠে, তোদের কী মতলব আমি বুঝি না ভেবেছিস! ওকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নেবার জন্যে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে চলেছিস। তাই ডক্টর মুখার্জির কাছে গিয়েছিলি।
দীপা নির্বাক, একটি কথাও বলে না।
চলে যা তুই, আর আসিস না। তোর সংস্রব আর আমি রাখতে চাই না।
কাজরীর প্রায়-চেঁচিয়ে বলা কথাগুলোর পরতে পরতে কান্নার উচ্ছ্বাস।
দীপা চলে গেল।
কাজরীর খোঁজখবর নিতে সে আর আসে ন। কুণালের শূন্য চোখের দিকে চেয়ে কাজরীর বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে। মনে হয়, কেবলমাত্র তার উপস্থিতি দিয়ে দীপা তার শূন্যতাবোধের যে বিপুল গহ্বরটার অনেকখানি আড়াল করে রেখেছিল তা যেন পুরোপুরি প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আঁধারলীন শূন্যতার গ্রাস তিলে তিলে তাকে আকর্ষণ করছে, ওখানে তলিয়ে যেতে আর বুঝি তার দেরি নেই।
