বলতে বলতে দু হাত বাড়িয়ে হঠাৎ কাজরীকে সে জড়িয়ে ধরে নিষ্ঠুর আলিঙ্গনের মধ্যে নিষ্পিষ্ট করতে করতে বলল, তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না কাজরী। আমার জীবনের আর সব চাওয়া-পাওয়া ফুরিয়েছে, শুধু তোমাকে চাই।
ছেড়ে দাও আমাকে।—অমানুষিক চিৎকার করে ওঠে কাজরী ও ছাড় আমাকে ছাড়।
কাজরীর চিৎকারে আকৃষ্ট হয়ে নিমেষের মধ্যে এক দল তোক ছুটতে ছুটতে এসে উপস্থিত হল।
কাজরীকে ছেড়ে দিল কুণাল। লোকগুলো প্রায় সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে : কী হয়েছে?
কাজরী হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ওই লোকটা আমার গায়ে হাত তুলেছিল।
মুহূর্তের মধ্যে ইডেন গার্ডেনের শান্ত স্তব্ধ সন্ধ্যার বুকে রক্তাক্ত বিভীষিকার সৃষ্টি হল। নিমেষে এতগুলো লোক এতখানি নৃশংস হয়ে উঠল কী করে, কাজরী ভেবে পেল না।
আত্মরক্ষার বিন্দুমাত্রও চেষ্টা করেনি কুণাল। তার ভয়লেশহীন ঋজুতা এক মুহূর্তের জন্যও নুয়ে যায়নি। একটি কথাও সে বলেনি, অস্ফুটতম চিৎকারও তার গলা থেকে বেরিয়ে আসেনি।
ছায়াভরা বিষাদ তার আয়ত চোখ দুটিতে আচ্ছন্ন করে ছিল, কাজরীর মুখের ওপর নিস্পলক নিবদ্ধ সরল সকরুণ অবিকৃত দৃষ্টি শূন্যতার মধ্যে মিলিয়ে যাবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আকাশের তারাগুলির মতই প্রদীপ্ত হয়ে রইল। ওদের দুজনের সোহাগনিবিড় সব কটি সন্ধ্যার নিবিড় মায়া যেন সেই কটি মুহূর্তে তার চোখ দুটিতে ছাপিয়ে উঠেছিল।
কাজরীর পরবর্তী প্রতিটি বিনিদ্র রাত্রির বুকে ওই দৃষ্টির স্বাক্ষর থেকে গেছে।
অ্যাম্বুলেন্স এল। কুণালকে মেডিক্যাল কলেজের এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হল।
কাজরীর বহু উৎকণ্ঠিত দিন ও রাত্রি জীবন-মৃত্যুর নিষ্ঠুর দ্বন্দ্বের সাক্ষী হয়ে রইল। প্রথম একটি মাস জুড়ে শঙ্কা ও সংশয়, তারপর অতি ধীরে ধীরে সেরে উঠতে থাকে কুণাল। কাজরীর অনেক দিনের শঙ্কাভীরু প্রতীক্ষার শেষে কুণালের জ্ঞান ফিরে এল— সে চোখ মেলে তাকাল। তাকাল বটে, কিন্তু কোথায় সেই সুদূর স্বপ্নলীন দৃষ্টি, যাতে স্বর্গের হাতছানি প্রত্যক্ষ করেছিল কাজরী? এ কোন্ অপরিচিত আগন্তুক, যার শূন্য চোখে চাওয়া চির অপরিচিতের রাজ্যে ব্যর্থ অন্বেষণে দিশেহারা? চেতনা হারাবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত প্রদীপ্ত স্বর্গের আলো কোথায় হারিয়ে গেল। কাজরীর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে।
রণদাবাবু বললেন, ওর পাওনা শাস্তিই ও পেয়েছ, তার জন্য দুঃখ করিস নে মা। ওকে অ্যাসাইলামে ভর্তি করার ব্যবস্থা করে তুই ঘরে ফিরে আয়।
কাজরী বলল, সে হয় না বাবা।
কুণালের মায়ের শুকনো চোখে মর্মান্তিক জ্বালা প্রত্যক্ষ করেছিল কাজরী। তিনি বলেছিলেন, সর্বনাশী মেয়ে! আমার সোনার ছেলেকে ভুলিয়ে আমার কাছ থেকে। কেড়ে নিয়েছ, তারপর ওকে প্রাণে মারতে চেয়েছিলে। কিন্তু এ কী করেছ! প্রাণে না মেরে এ কী সাংঘাতিকভাবে মেরে রেখেছ ওকে! আমি মা—আমি বলছি আমি যেমন ভুগছি, তার হাজার গুণ তুমি প্রতি মুহূর্তে ভুগবে।
তাই হোক মা—অবরুদ্ধ কণ্ঠে কাজরী বলেছিল।
কুণাল হাসপাতাল থেকে খালাস পেল। তাকে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে এল কাজরী।
কুণালের নিজের হাতে অতি যত্নে সাজানো ঘরগুলির মধ্যে কোথাও পূর্বস্মৃতির কোন সূত্র খুঁজে পেল না কুণাল। তার পরিচিত বস্তুগুলি তার আচ্ছন্ন চেতনায় লেশমাত্রও সাড়া জাগাল না।
সাইকিয়াট্রিস্ট ডক্তর মুখার্জি কুণালকে পরীক্ষা করে বললেন, রীতিমত শক ট্রিটমেন্ট করতে হবে। বাড়িতে রেখে করতে অনেক হাঙ্গামা—অনেক খরচও। তার চেয়ে–
কাজরী বাধা দিয়ে বলে, যত হাঙ্গামা হোক খরচ হোক, বাড়িতেই ওঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন ডক্টর মুখার্জি। হাসপাতালে বা অ্যাসাইলামে ওঁকে ভর্তি করাতে পারব না আমি।
ডক্টর মুখার্জি বললেন, কেন মা? হাসপাতলে বা অ্যাসাইলামে ভর্তি করাতে হাঙ্গামা তো কিছু নেই।
কাজরী চুপ করে রইল। ডক্টর মুখার্জিকে সে কী করে বোঝাবে যে কুণালের প্রতিটি মুহূর্তকে সে আগলে রাখতে চায় অনুতপ্ত হৃদয়ের ব্যাকুলতা দিয়ে! যে চরম ভুল-বোঝার মধ্যে তার চেতনা ডুবে গেছে, চেতনার উন্মীলন-মুহূর্তে অনুতাপের অশ্রুধারায় তার পরিসমাপ্তি ঘটাবে সে! হাসপাতাল বা অ্যাসাইলামের বিরস রুগ্ন পরিবেশ নয়, সে চায় তার বুকভরা ভালবাসার স্নিগ্ধ ছায়ায় কুণাল জেগে উঠুক।
কাজরীর জেদে বাড়িতেই চিকিৎসার ব্যবস্থা হল। দিনের পর দিন মাসের পর মাস কুণালের বোধশক্তিহীন মস্তিষ্কে চেতনার সঞ্চারের ক্লান্তিকর প্রয়াস চলে।
কিন্তু কোন ফল হয় না। কুণালের শূন্য দৃষ্টিতে এক ফোঁটা বুদ্ধির স্ফুলিঙ্গও জাগে না। মুখে ভাষা ফোটে না। সমস্ত চিকিৎসার বিরুদ্ধে অনড় হয়ে থাকে তার নিঃসাড় নির্বোধ সত্তা।
মুখ ফুটে না বললেও বোঝা যায় যে, ডক্টর মুখার্জি আর তেমন আশান্বিত বোধ। করছেন না।
ইতিমধ্যে কাজরী তার রিসার্চ ছেড়ে একটি মহিলা কলেজে অধ্যাপনার চাকরি নিয়েছে। কলেজে চাকরি ছাড়াও প্রাইভেট টুইশান ও নোটবই লেখার কাজ নিয়ে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করতে হয় তাকে। কুণালের চিকিৎসার খরচ আছে, তার মা ও ভাইবোনদের ভরণপোষণের যাবতীয় দায়িত্ব সে নিয়েছে, কেবলমাত্র অধ্যাপনার পরিমিত আয়ে সমস্ত ব্যয়সঙ্কুলান হওয়া শক্ত।
বাগবাজারের এঁদো গলি থেকে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন পাড়ায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে কুণালের মা ও ভাইবোনদের স্থানান্তরিত করল কাজরী। নিজের ফ্ল্যাটে ওঁদের সে নিয়ে যেতে চেয়েছিল; কিন্তু কুণালের মা আপত্তি করেছিলেন।
