কথা নেই, অন্ধকার ঘরে কেবল শব্দ। সোনার কলকজার একটা শব্দ; কোন সুদূর অনন্তকাল ধরে বয়ে চলে শব্দটা, আশ্চর্য।
ভোর হলেই আবার সব ফাঁকা। আকাশে দোল খাওয়া পাখিদের দিকে তাকিয়ে মাথার চুল ছেড়ে মোহিনী। যাহশালা মাথাটাই খারাপ হয়ে গেল না তো। রাতে এসে সত্যি সত্যি যদি কেউ শুয়েছিল পাশে তবে চিহ্ন থাকে না কেন! নাকি নেশা, নাকি ঘোর, নাকি–
লোকে ডাকে, বড়লাট। কি গো বড়লাট ভালো?
মোহিনী হাসে, কে জানে বাপু, ভালো না মন্দ ঠিক বুঝতে পারি না।
তোমার ঘড়িআলা কেমন আছে?
মোহিনী গুম মেরে যায়। কথাটার মধ্যে একটু ব্যঙ্গ আছে। পরে গলা বাড়িয়ে পাল্টা নেয়, ফের ঘড়িআলার কথা! খারাপ কিছু বলেছ তো মুখ ছিঁড়ে নেব বলছি।
লে হাওয়া কথা না বলতেই চোটপাট, গাছে না উঠতেই এক কাদি নামিয়ে দিলে যে।
মোহিনী বোধহয় তার ভুল বুঝতে পারে। একটু নরম হয়। আসলে কি জানো বাপু, একটা গণ্ডগোলে পড়ে গেছি। তাই কি বলতে কি বলে ফেলি।
কি গণ্ডগোল গো? ঝামেলা না থাকলে বল না শুনি।
বলব! মোহিনী এপাশ ওপাশ তকায়। তারপর বলেই ফেলে। রাত হলে বাপু, এক শালা পাসে এসে দিব্যি আরামে ঘুমোয়। অথচ বেটাকে হদিশ করতেই পারি না। কে হবে বলো দেখি?
কে আবার, হাত বুলিয়ে দেখলেই তো পার।
তা কি আর বুলাই না। গায়ে হাত দিলেই কেমন যেন মাখম মাখম লাগে—
বটে বটে! খানাখন্দে হাত পড়ে না?
মোহিনী ঠিক ইঙ্গিত বুঝতে পারে না। চোখ গোল গোল করে তাকায়।
মানে ইয়ে আর কি! বুকের দিকটা উঁচু উঁচু?
মোহিনী এবার আরক্ত হয়। চেঁচিয়ে ওঠে, এই শালা ফুটো শানকি! হুড়কো দেখনি বুঝি, না! ভাগ, ভাগ বলছি।
অথচ মিথ্যে নয়, মোহিনীর জ্বালায় মোহিনীই ভুগছে। রামায়ণীকে একদিন কথাটা বলল মোহিনী, যদি ভরসা দাও তো একটা কথা বলি।
বলো।
কদিন ধরে বড্ড ঝামেলায় পড়েছি, সেই বেটা ঘড়িআলা—
আবার ঘড়িআলা! মরণ আমার।
আহা শোনই না। রাতে যখন শয্যা যাই, সেই শালা কৃষ্ণের জীব ঝাঁপটি মেরে পাশে এসে শুয়ে থাকে।
কে শোয়। রামায়ণী যেন আকাশ থেকে পড়ে।
বিশ্বাস করো। সেই শালা ঘড়িআলাই যে আমি বুঝতে পারি।
রামায়ণী কিছুক্ষণ চুপ মেরে লক্ষ্য করে ওকে। বুঝেছি, হয়ে এসেছে তোমার। বলি, একটা কথা শুনবে?
কি কথা?
এবার বরং ভালো দেখে একটা ওঝা ধরো। ওঝায় বিশ্বাস না কর, হেকিম আছে, কোবরেজ আছে, একটা কিছু বিহিত কর।
মোহিনী জানত, এই ধরনেরই উপদেশ দেবে লোকে। হো হো করে হাসে। তাই যদি করব, তা হলে আর তোমায় শোনাতে আসব কেন?
রামায়ণী বলে, ওই ঘড়িআলা কেবল তোমার ঘাড়েই চাপেনি, রক্তের মধ্যেও সেধিয়ে বসেছে। রাতে যখন দেহটা তোমার আলগা হয় ও বেটা তখন বেরোয়। আর দশজনের তো এমন হয় না।
আর দশজনের সঙ্গে তুলনা করছ! আবার হাসে মোহিনী। তুলনা ঠিক না, তবে–আচ্ছা, শৈল শোয় না তো পাশে?
মোহিনী বলে, শৈল শোয় তার ছেলে কোলে, ঘরের আর এক প্রান্তে। আমার শোয়া নাকি খারাপ, আমি নাকি হাত পা ছুড়ে মানুষ খুন করি।
তালে এক কাজ কর না, সন্দেহ রেখে আর লাভ কি! এবার যেদিন পাশে এসে শোবে দড়িগাছা দিয়ে পাশমোড়া করে বেঁধে ফেল। দশজনকে ডেকেঢুকে দেখাও।
মোহিনী বলে, তাই দেখাতে হবে দেখছি।
তক্কে তক্কে থাকে মোহিনী। সোনার ঘড়িটা শব্দ করে টিক টিক টিক…ঠিক ব্রহ্মতালুতে, শিরদাঁড়ায়, মনে হয় ঠিক বুকের এই কোমল জায়গায়, কিংবা রক্তের ভিজ্ঞ, কোষে কোষে মজ্জায় মাংসে হাড়ে, সোনার ঘড়িটা শব্দ করে, ঠিক কোন
জায়গা থেকে যে শব্দটা ভেসে আসে বুঝতে পারেনা মোহিনী।
কত বয়স হলো গো বড়লাট?
তা আজ্ঞে তিন কুড়ির কিছু বেশি?
তোমার সাধনা? কতদূর এগোলে হে শিল্পী?
তা আজ্ঞে…না, আর কোন জবাব পায় না মোহিনী। তা আজ্ঞে, বীজ বপন তো করেছি, ফলের আশায় দিন কাটাই।
আর কত কাল কাটাবে। সেই যে লোকটা পেছু লেগেছে চেননি তাকে? পারবে তাকে ঠেকিয়ে রাখতে?
নাহ্, এ সব কথা ভাবলেই শালা মাথাটা কেমন গরম হয়, চাদিটা কেমন ফটফাট করে। হাতে, পায়ে, কপালে, ঘাড়ে গিট পাকায়। কাঁকড়ার মতো হামলে পড়ে কাদা খোঁচাতে ইচ্ছে করে। বেশ খানিকক্ষণ ছটফট করে বেলাবেলিই আজ রামায়ণীর দরজায় এসে দাঁড়ায় মোহিনী।
ওমা গো! কি কপাল আমার! আজ যে বড় সূয্যি না ডুবতে?
চলে এলুম।
শৈলর সঙ্গে কষে ঝগড়া করেছ বুঝি?
শৈলের সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গে?
ওমা গো সে কি রকম! কি নিয়ে হলো?
ঝগড়া করার ইচ্ছে হল, করলাম। ছুতোর অভাব হয় নাকি?
রামায়ণী ওকে বসতে দেয়? এগিয়ে দেয় সেই গড়গড়া। কড়ি মোক্তারের কথা সারাদিনের পর আর একবার মনে পড়ে ওদের। জব্বর গড়গড়াটা কিন্তু।
লোকটাও ছিল জব্বর। অমন অকালে যে চলে যাবে জানতুম নাকি!
মোহিনী আবার গুম মেরে যায়। আসলে বুঝেছ, ওই ঘড়িআলাই যত নষ্টের গোড়া।
আবার ঘড়ি!
তরল আগুন গলা দিয়ে নামিয়ে দেয় মোহিনী। সত্যি কথায় বুঝি ভয়। তা বাপু সাধ করে কি আর বলি, বলায়।
বলায়, বেশ তবে বলল। রামায়ণী লণ্ঠন জ্বালে। ঘরের ভিতর কুড়িয়ে আনে ছায়া। বাইরেটায় আবার আঁধার জমে। হাসনুহানার গন্ধ। জোনাক জ্বলে ঠাণ্ডা আলোয়। মোহিনী বলে তার সাধনার কথা, ভজনের কথা। রামায়ণী কেবল হাঁ হাঁ করে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কেবল দেখে, বড় পাগল ভোলা। অথচ মুখে বলে না। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছায়া দেখে। ঘরের বেড়ায় ছায়া, মানুষের না জন্তুর ঠিক বোঝা যায় না। দুঃখ পায়, আহা, এমন পাগল ভোলা না হলে কি ঠাই পেতে এখনে।
