এইভাবে একবার ওকে চটাতে পারলে রসালো রসালো খিস্তি শোনা যায়, কিন্তু না চটিয়ে একটু ভ্যানতাড়া করলে পাওয়া যায় ক্ষীরসমুদ্রের সন্ধান।
আসলে যা সত্যি তা হচ্ছে মোহিনীর কোন পিছুটান নেই। পিছনে যে বয়সগুলো চলে গেল, সেগুলো তো আর ফিরে পাওয়ার উপায় নেই, মিছিমিছি কেবল জাবর কাটা। বরং যতক্ষণ তোমার শ্বাস আছে সামনের দিকে তাকাও, চলো চলো আর চলো। চরৈবেতি। তবে ওই যে রামায়ণীর কথা তুলে ওকে একটু টুসকি মারা হল, ওই রামায়ণীর প্রসঙ্গেই মোহিনী বড় দুর্বল। রামায়ণীর ভিতরে যে আগায় সেই আগুনের ছোঁয়া একবার যে পেয়েছে সে কি কখনো দুর্বল না হয়ে পারে!
ফলে প্রতিদিন সন্ধ্যা না হতেই রামায়ণীর দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায় মোহিনী। আগে আগে বটতলায় সাত হাটের হাটুরেদের সঙ্গে গলাগলি করে বসে ভবতারিণীর সেবা করত, এখন আর ঢাকঢাক গুড়গুড়ের বালাই নেই। সোজা বোতল মুঠো করে রামায়ণীর দরজায় এসে ডাক পাড়ে, ও আমার সন্ধ্যামণি গো, দুয়ার খোল!
রামায়ণীও অপেক্ষাতেই থাকে। দরজা খুলে একঝক খুশির ঝলক হয়ে সামনে দাঁড়ায়, মোহিনীকে ঘরে এনে মাদুর পেতে বসতে দেয়, বসো। আজ যে বড় সকাল সকাল?
ঘরে একখানা লণ্ঠন জ্বলে। আর দেখা যায় খান কয়েক ছায়া, মানুষের না জন্তুর ঠিক বোঝা যায় না। জানালার ওপারে ঘুটঘুটি আঁধার জমে থাকে। কখনো কখনো মিঠেল মিঠেল হাসনুহানার গন্ধ ভেসে আসে, আবার কখনো আলোর টিপ, ঠাণ্ডা আলোর জোনাকি উড়তে উড়তে রামায়ণীর শাড়ির ভঁজে গা লুকোয়।
মোহিনী আয়েশ করে বসে। রামায়ণী একটা রুপোর পাত-মোড়া গড়গড়া এগিয়ে দে?। মোহিনী জানে ওটা কড়ি মোক্তারের কেনা। কড়ি মোক্তার আর বেঁচে নেই। কিন্তু গড়গড়াটা আছে বলেই মোক্তারের কথা মনে পড়ে। মোক্তার ওকে ভালবেসে আর কি দিয়েছিল কে জানে। রামায়ণী স্বীকার না করলেও মোহিনী জানে, অনেক টাকা ঢেলেছিল কড়ি মোক্তার। রামায়ণীর পিছনে মুঠো মুঠো টাকা খরচ করেছিল। কিন্তু কি এল গেল! শুকনো টাকা কড়কড় করে বসে বাতাসে উড়ে গেল। ডম্বৰু বাজিয়ে সেই শালা ঘড়িআলা তা মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলে গেল, তাজ্জব সব ব্যাপার।
রামায়ণীর বয়স কম হয়নি, দু কড়ি পার তিন। এ বয়সে কাম মরে কামনা মরে। কত যে কামনা তা হিস্কে কষতে গেলে মাথা বনবন করে। অথচ কামনা থেকে জন্ম নিচ্ছে যত রাজ্যের অতৃপ্তি। শূন্য কুম্ভ শূন্যে রয়ে গেল চিরকাল।
আচ্ছা বড়লাট, একটা কথা শুধাই!
মোহিনী হাসে, আরক্ত চোখে তাকায়, নিজের কাছেই তো উত্তর আছে বাপু, আমায় কেন?
উত্তর থাকলে কি আর শুধাই। শোন না, এই রোজ সন্ধ্যা না হতেই আমার কাছে এসে হাজির হও, কি চাও?
মোহিনীর গলার নলি বেয়ে তপ্ত ঝলকে ঝলকে নেমে যায়, কি যে চাই, তা কি ছাই স্পষ্ট করে জানি নাকি! তবে হয়তো ভুলে থাকতে চাই। দু দণ্ড শুধু ভুলিয়ে রাখ দেখি আমাকে।
লোকে বড় নিন্দে-মন্দ করে যে?
এই লোকেই আবার পাঁচ মুখে একদিন প্রশংসা গাইবে। লোক মানেই তো নৈবিদ্যি কলা, যেমন সাজাবো তেমনি সাজবে, যেমন বসাবে তেমনি বসবে। হি হি করে হাসে মোহিনী।
কৌতুকে তাকিয়ে থাকে রামায়ণী, মাথাটা তোমার বিগড়ে গেছে বড়লাট।
মোহিনী আবার হাসে। হাসতে হাসতে চোয়াল ঝুলে পড়ে, কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো হাতের আঙুল গিঁট পাকায়। ছায়াগুলো বিকৃত হয়। বুকের ভেতর থেকে খুবলে বেরিয়ে আসে অদ্ভুত এক অনুভূতি। আসলে কি জানো, স্বপ্নে ছাড়া লোকটাকে আমি ধরতেই পারি না। বড় পেছু লেগেছে আজকাল।
কাকে ধরতে পারো না? কৌতুকে তখনও তাকিয়ে থাকে রামায়ণী।
কাকে আবার! সেই যে বেটা ঘড়িআলার কথা বললাম। সারাক্ষণ ঘড়ি হাতে ন কন করে ঘুরছে। চাবি দেয় আর চলে। ধেই ধেই করে কেবল নেচে বেড়ায়। সারাক্ষণ কেবল শব্দ। টিকিস টিকিস শব্দ, বুকের ভেতরে যেন পাড় দেয়।
ধুস, আবার সেই এক কথা। ছাই-ভস্ম ভেবে ভেবে মাথায় তোমার পোকা ধরে গেছে।
তরল আগুন নেমে আসে ঝলকে ঝলকে। কণ্ঠনালী বেয়ে বুকে বুক থেকে আরো নিচে। বোঝ আর বোঝ, সে বেটাই বড় জ্বালায়।
রাত গভীর হলে মোহিনী টলতে টলতে বাড়ি ফেরে। বাড়ির দরজায় তখন কৃষ্ণের জীব পাহারাদার একটা কুকুর। ল্যাজ নেড়ে উঠে দাঁড়ায়, ঘাম চাটে মোহিনীর। মোহিনী ওকে বুকে তুলে ধরে, আদর করে। রামায়ণীর কাছ থেকে সরে এসে রামায়ণীর কথাই বেশি করে মনে পড়ে ওর। কি যেন একটা যাদু মন্ত্র লুকোন আছে ওর ভিতরে, ঠিক মত হদিশ করতে পারে না মোহিনী।
টলতে টলতে কখন যেন ও আছড়ে পড়ে বিছানায়। তারপর নেশার ঝোকে দুলতে শুরু করে। দুলতে শুরু করে মাটি, আকাশ, গাছপালা, ফুল পাখি। দোলে, দোলে আর দেলে।
হঠাৎ। নিঃশব্দে সমস্ত দুলুনি ওর থেমে যায়। কে? কে বাবা কৃষ্ণের জীব। হাত বিছিয়ে দেহটাকে ও স্পর্শ করে। নিটোল একটা দেহ। হাঁ, পাথর খোদাই মসৃণ একটা অবয়ব। ধীরে ধীরে হাতের অনুভত্ব বোঝার চেষ্টা করে মোহিনী, কে রে হতে পারে! রামায়ণী নয়। রামায়ণীর আসার কথা নয় এখানে। তবে কি শৈল? শৈল তার পাখ ছাড়ান পাখির বাচ্চার মতো কাকলাস ছেলেটাকে মাই ধরিয়ে শুয়ে আছে ঘরের আর এক প্রান্তে। শৈলর লোহার গারদের মতো হাড় গিজগিজ করা বুক। অথচ এর বুক কত প্রকাণ্ড, কত ছড়ান। কে হতে পারে! এই কে আবার জ্বালাতে এলে গো মাঝরাতে?
