বাঁহাতে লুঙ্গিটা খামচে, খিল তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগের মুহূর্তে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তার স্বামী চিৎকার করে উঠল।
—অতই যদি বিয়োবার শখ তো কাউকে ঘরে ঢোকালেই তো হত। আমি তো কত রাত্তিরেই ঘরে ফিরি না।
শারীরিক যন্ত্রণার কোন বোধ মেঝেতে পড়ে থাকা চম্পাকে আর পীড়িত করছিল না। শুধু খোলা দরজার বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে তার অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। অনেক রকমের মিশ্র ভাবনা। এলোমেলো। পরস্পর সম্পর্কহীন।
একসময় চম্পা ধড়মড় করে উঠে বসল। তার ভারি উন্মুক্ত বুক দ্রুত স্বাসপ্রশ্বাসে ওঠানামা করছে। মুখে চোখে গরম হলকা। রগের দুপাশের শিরা দপদপ করে মাথার মধ্যে যেন আগুনের স্রোত ছড়িয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ সে কোমরের গ্রন্থি থেকে সেই ধাতুপিণ্ডটাকে একটানে ডান হারে মুঠোয় ছিঁড়ে নিল। তারপর জানালার আবছা আলোকিত গরাদের ফাঁক দিয়ে ছুঁড়ে দিল সেই ধাতব আশীর্বাদ।
ঠং করে জানালার লোহার শিকে বাধা পেয়ে মাদুলিটা আবার ঘরের অন্ধকার মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। চম্পার নাগালের বাইরে। এক দুরূহ অজানা কৌণিকে।
আস্তে আস্তে একটা তীব্র অনুভূতি তার সমস্ত সত্ত্বা আর চেতনাকে কাপিয়ে। দিয়ে গলার কাছে ফেনার মত উঠে আসতে লাগল। চম্পা অনেকক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত শরীর মন শক্ত করে নিজেকে সংবরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। পারল না। সামনের অতিপ্রাকৃত গুল্ম অন্ধকারে দুহাত বাড়িয়ে যেন কোন অতল গহ্বরের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। তারপর চম্পার সেই নগ্ন উপুড় শরীর, সেই শক্ত ঠাণ্ডা জমিনটায় দশ আঙুলের নখ বিঁধিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।
বলিছে সোনার ঘড়ি – বরেন গঙ্গোপাধ্যায়
লোকে ডাকে বড়লাট? মোহিনী একগাল হাসে।
কে মোহিনী?
আমাদের মোহিনী, মোহিনীমোহন। নিচের পাটিতে দাঁতের সংখ্যা কয়েকটা কমে গেছে। আগে দাড়ি রাখত না, এখন রাখে। এখন বয়স হয়েছে তিন কুড়ির কিছু বেশি। এ বয়স থেকেই মানুষ তিন-ঠেঙে হতে থাকে, কিন্তু মোহিনী এখনো দিব্যি দু ঠ্যাঙেই হিল্লি দিল্লী করতে পারে। দেখে মন হয়, বেশ মজবুত আছে ভিতরে মাল মশলা। সবাই জানে, মোহিনী জীবন শুরু করেছিল বিশাল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে, বিশাল একটা মহীরূহের মতো নিজেকে বিস্তার করে যাওয়ার বাসনা নিয়ে। কিন্তু যৌবনকাল থেকেই দাসত্ব করেছে বাংলা দু নম্বরের।
ফলে যা হয়, খুব মেজাজী লোক বলে খ্যাতি আছে ওর। মোহিনীর নিজের ভাষায়, মানব জনম পেয়েছি তখন আর ছেড়ে কথা কই কেন! বাঁচতে হয়তো লাটের মতই বাঁচব। তাও আবার ছোটলাট নয়, বড়লাট। আর জীবনভর সাধনা করে যাব।
কি সাধনা।
প্রেমের সাধনা, ভালোবাসার সাধনা। বাই তারিফ করে যাবে, হ্যাঁ বড়লাটের মতই একজন মানুষ এই জগৎ সংসারে ভালোবেসে বেঁচেছিল বটে। সাবাস বড়লাট, সাবাস।
ফলে এসব ক্ষেত্রে যা হয়, পাঁচ পা-আলা গরুর পেছনে যেমন মানুষ লাগে, খোঁচায়, উত্যক্ত করে, লেজ ধরে টানে, ঠিক তেমনি মোহিনীকে দেখে ফোড়নকাটা লোকেরও অভাব হয় না। একটু ঝাল নুন মিশিয়ে গা জ্বালা করা কথা শোনাতে পারলে আর রক্ষা নেই, অমনি ঝিক্কর দেয় মোহিনী, এই শালা ফুটো শানকি, বেশি ফাঁচ ফ্যাচ করবি না বলচি। দুধ আর পিটুলি বুঝি এক!
মোহিনী যত রাগে ছেলে ছোঁকরারা তত রাগায়। ছেলে ছোঁকরাদের ভাষ্যি বড় খারাপ। মোহিনী তখন অবস্থা বুঝে কিছুটা বোধ করি থিতিয়ে যায়। দরদ ঢেলে বোঝাবার চেষ্টা করে জীবনের কথা। জীবন কি? জীবন কেমন? বাপ মায়ে তো জন্ম দিয়েই খালাস, কিন্তু বাঁচার মতো বাঁচতে পারে কজন? অথচ যে-জন ভজে, যে-জন সাধনা করে তার বাঁচায় যে সুখ সে সুখের স্বাদ কি করে পাবি তোরা? পাবি না।
বটে। তুমি পেয়েছ বুঝি বড়লাট?
পাইনি এখনো, তবে পেয়ে যাবো। বীজ বপন করলে যদি গাছ হয়, সাধনা করলে কি সিদ্ধি হবে না? আলবাত হবে। তবে কি জানিস? গণ্ডগোলটা হচ্ছে অন্যত্র।
কোথায়, কোথায়? হামলে পড়ে শুধায় সবাই।
মোহিনী বলে, গণ্ডগোলের মূলে হচ্ছে একটা শব্দ। কান পেতে একটু লক্ষ্য কর তোরাও শুনতে পাবি। শুনতে পাচ্ছিস?
কি শুনতে পাচ্ছিস?
শুনতে পাচ্ছিস না, আরে সেই যে একটা শব্দ, ঘড়ির মতো একটা শব্দ।
লো হাওয়া, কিসের ঘড়ি গো আবার?
সোনার ঘড়ি রে, সোনার ঘড়ি। সোনার ঘড়ি কি বলে জানিস না, বলিছে সোনার ঘড়ি টিক টিক টিক। ওই শালাই মনে করিয়ে দিচ্ছে সময় বড় অল্প।
ছেলে ছোঁকরারা অপরিসীম মজা পায়। তুমি শুনতে পাও বুঝি বড়লাট।
আমি একা কেন, স্বাই পায়। তবে শুনেও যদি কেউ না শোনার ভান করে আমি কি করতে পারি। আসলে বুঝলি, সেই বেটা ঘড়িআলাই যত নষ্টের। ডম্বরু বাজিয়ে ধেই ধেই করে নেচে যাচ্ছে। নাচছে, নাচছে আর নাচছে। আর নাচার তালে তালে শব্দ হচ্ছে।
বটে, বটে! তুমি তা হলে শুনতে পাচ্ছ বড়লাট, কিন্তু শুনে কোন আঁটিটা বাঁধছ? হি-হি।
এ্যই, ফের খারাপ কথা। বলেছি না খারাপ কথা মুখে আনবি না। বাঁচতে চাস তো এখনো তোদের সময় আছে সাধনা কর।
কার সাধনা গো, রামায়ণীর?
এবার যেন বুকের মধ্যে দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে : উক্তিটার মধ্যে মুখরোচক কিছু মশলা আছে। চেঁচিয়ে ওঠে মোহিনী, এই শালা ফুটো শানকি, বাপ মা
তোদের বৃথাই জন্ম দিয়েছিল দেখছি। সারাটা জীবন কাদা ঘেঁটে ঘেঁটেই গেল।
