কাজরী বলল, না।
সে কি! নিজের বাড়িতে যাবি নে!
দোহাই তোমার বাবা, কিছুদিন একা থাকতে দাও আমাকে।
বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে অনেকেই সহানুভূতি জানাতে এগিয়ে আসে। কিন্তু কাজরী সযত্নে সবাইকে এড়িয়ে চলে। তার প্রতিটি দিন যেন ভারবাহী নৌকার মত স্বেচ্ছামত ভেসে যায়। অনুভূতিশক্তি যেন ভোতা হয়ে গেছে, দুঃখ-ক্লেশবোধও বুঝি নেই।
য়ুনিভার্সিটি-লাইব্রেরির এক কোণে সকাল থেকে সন্ধ্যা বইয়ের স্তুপের মধ্যে প্রাণপণ নিজেকে হারিয়ে ফেলবার চেষ্টা করে সে, তার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা তার থিসিসের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করে সে যেন বিশ্বসংসারকে বিস্মৃত হতে চায়।
কিন্তু পারে না। আত্মশাসনের কঠোরতা সত্ত্বেও অবাধ্য পাগলা ঘোড়ার মত মন তার লাগামছাড়া হয়ে অতি-অবাঞ্ছিত চিন্তাগুলির অলিতে গলিতে ছুটোছুটি করতে থাকে। কঠোর বিস্মৃতির মধ্যে যাকে সে প্রাণপণে তলিয়ে রাখতে চায় মনের কঠিনতম আগল ভেঙ্গে বার বার সে আত্মপ্রকাশ করে। মনের সমস্ত ঘৃণা-জড়ো করা আগুনে ওর স্মৃতির শেষ কণাটিকেও পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতে গিয়ে সে নিজেই দগ্ধ হয়। তার লজ্জাকর স্মৃতি তার সমস্ত সত্তাকে জড়িয়ে থাকে। এ যেন চরম লজ্জাকর রাহুগ্রাস, যার কবল থেকে মুক্তি নেই।
বাক্স ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ একদিন কুণালের একটি ছবি বেরিয়ে পড়ল। ছবিটি হাতে নিয়ে কাজরী প্রথমে ভাবল ছিঁড়ে নিশ্চিহ্ন করে। কিন্তু পরক্ষণে তার নিজের অজ্ঞাতসারে নিজেকে সে যেন ছবির মধ্যে হারিয়ে ফেলল। দেবদুলভ অনিন্দ্য মুখকান্তি, আয়ত উজ্জ্বল চোখ-জোড়ায় কোথাও এক ফোঁটা পাপ নেই। কাজরীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন বেদনায় মুচড়ে ওঠে। ওর সেই বিদায়-মুহূর্তের বেদনাবিদ্ধ করুণ দৃষ্টি মনে পড়ে গেল তার। যত মিথ্যারই আশ্রয় নিক, ওর ভালবাসায় সত্যিই তো কোনও ফাঁকি ছিল না।
কাজরীর মনের পাহাড়প্রমাণ কঠোরতার বরফগুলি গলতে থাকে। তার শুষ্ক চোখের মরুদাহে মেঘের ছায়ার সঞ্চার হয়, অশ্রুধারায় বহু বিনিদ্র প্রহর কেটে যায়।
সে ভেবে পেল না কী করবে। ওকে ফিরিয়ে এনে অনুতপ্ত অশ্রুভরা আত্মসমর্পণের জন্য তার সমস্ত নারীহৃদয় আকুল হয়ে ওঠে, কিন্তু একবার যে মন সংশয়বিমুখ হয়েছে, সে যেন আর সহজ হতে চায় না। অকুণ্ঠ আত্মদান আর বুঝি সম্ভব নয়।
লাইব্রেরি-ঘরের কোণে সন্ধ্যাগুলি বড় নিঃসঙ্গ, বড় বিষণ্ণ মনে হয় কাজরীর। বাইরে ক্রমশ-ঘনিয়ে-আসা অন্ধকার যেন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তার সমস্ত ভবিষ্যৎ জীবনকে যেন এই অতলস্পর্শী অন্ধকারের মধ্যে সে প্রত্যক্ষ করল। পিছনে ফেলে-আসা দিনগুলির স্বপ্ন সৌরভের স্মৃতি লাইব্রেরি-ঘরের বন্ধ বাতাসকে উতলা করে তোলে। কাজরী ভয় পায়। যেন চিরদিনের মত তার জীবন থেকে সমস্ত রঙ-রস নিঃশেষে মুছে গেছে, এক সীমাহীন নৈঃসঙ্গ্য যেন তিলে তিলে তাকে গ্রাস করছে।
অসহ্য লাগে কাজরীর। এক-একদিন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসে, রাস্তায় জনস্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে লক্ষ্যহীনের মত ঘুরে বেড়ায় সে ইতস্ততঃ।
একদিন সে ইডেন গার্ডেনে এল। ছায়াচ্ছন্ন অস্ফুট আলোর কুহক-জড়ানো, কাকর-ছড়ানো পথে দাঁড়িয়ে থাকে সে আচ্ছন্নের মত। এ পথ যেন তার অতীতের করুণ রঙিন অধ্যায়—এপথে চলার অধিকার সে যেন চিরকালের মত হারিয়ে ফেলেছে।
প্যাগোডার অনতিদূরে অন্ধকারের সঙ্গে একাকার বেঞ্চিটার কাছে এসে দাঁড়াল সে দ্বিধাজড়িত পদক্ষেপে। অনেক মুধুর স্মৃতি সৌরভ যেন এখানকার বাতাসকে ভরে রেখেছে।
হঠাৎ যেন সেই বিস্মৃত প্রায় অতীতের স্বপ্নগুলি জীবন্ত হয়ে ওঠে করুণ আবানে।
কাজরী!
কাজরী চমকে ওঠে। কাজরীর পাশে এসে দাঁড়াল স্বপ্ন নয়, কুণাল।
আলোর চেয়ে অন্ধকারই বেশী। তবু কাজরী দেখতে পেল শুষ্ক শীর্ণ চেহারা, সরল-সুন্দর চোখ দুটিতে নিবিড় করুণ কাতরতা।
কিন্তু এ কী হল তার! তার মনের সমস্ত আকুলতা নিমেষে নিথর হয়ে মনটাকে পাথরের মত শক্ত করে তোলে কেন?
রুদ্ধশ্বাসকম্পিত স্বরে কুণাল বলল, তুমি এসেছ কাজরী?
এমনি বেড়াতে এসেছিলাম। —নির্লিপ্ত, উদাসীন কণ্ঠে কাজরী বলল।
কুণালের মাথা নিমেষের জন্য নুয়ে আসে। পরক্ষণে মাথা তুলে সে বলে, শুধু বেড়াতে?
হ্যাঁ, তাই। কাজরী বলল।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে কুণাল ক্ষীণ আর্তকণ্ঠে বলল, আমার অপরাধের কি ক্ষমা নেই কাজরী?
কাজরীর বুক ফেটে যায়। ইচ্ছে করে সেই মুহূর্তে ওর বুকে আঁপিয়ে পড়ে বলে তুমি আমার জীবনকে পূর্ণ করেছ, তোমার অপরাধ নিয়ে আমি অপরাধী হতে চাই নে।
কিন্তু এ কী নিষ্ঠুর জ্বালা তার চোখে জ্বলে! যন্ত্রণা দেবার জন্যই যেন মরিয়া হয়ে ওঠে সে। বলে, না, নেই। মিথ্যে আমি সইতে পারি নে। মিথ্যের পাহাড় সাজিয়েছ, তুমি কি জানতে না যে মিথ্যে কখনও চাপা থাকে না?
জানতুম।—ওষ্ঠপ্রান্তে ম্লান হাসি ফুটিয়ে কুণাল বলল? কিন্তু সেই সঙ্গে এই বিশ্বাসও ছিল যে তুমি আমাকে ভালবাস। তোমার ভালবাসা তোমাকে ক্ষমা করবার শক্তি দেবে ভেবেছিলুম।
কাজরী চমকে ওঠে।
কুণাল বলে চলে, বুঝতে পারছি, তুমি আমাকে ভালবাসতে পারনি। হয়তো দু দিনের জন্যে নিজেকে ভুলেছিলে।
কুণাল!–কাজরী আর্তনাদ করে ওঠে।
কুণাল স্থির অবিচল, অদ্ভুত দৃষ্টিতে বহুক্ষণ ধরে কাজরীর মুখের দিকে চেয়ে রইল। খানিকক্ষণ বাদে উত্তেজিত স্বরে সে বলে ওঠে, আমার ভালবাসা আমার প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে আগুনের মত জ্বলছে। আমি আর সইতে পারছি নে। প্রতিদান চাই না, শুধু ভালবাসতে চাই।
