চম্পা ব পড়শিদের উদ্দেশ্যে আপন মনে ঠোঁট বেঁকাল। এমন ভালোবাসার মর্ম তোরা কী বুঝবি, ছাই। সব হিংসুটের দল। মুখে আগুন তোদের।
সেদিন সই বলছিল—হ্যাঁরে চম্পা, তোর বটুঠাকুর বলছিল, ঠাকুরপোদের সঙ্গে একটা ঢলানি ঢঙি মেয়ে নাকি অ্যাক্টো করে। দেখিস বাপু। পুরুষমানুষের খেয়াল আর ভিজে মাটির দেয়াল। দুটোকেই বিশ্বাস নেই।
চম্পা আপন মনে আবারো খিলখিল করে হেসে ওঠে। এবার জলের ওপরতলে সেই হাসির রঙ্গ জলচাকার মত ছড়িয়ে যায়।
তার ঘরের মানুষটাকে সে আদ্যন্ত এমনভাবে চেনে যে ভাবতে চাইলেও অবিশ্বাস কখনো মনের মধ্যে দানা বাঁধতেই পারে না। লোকটার এক এক দিনের এক এক নতুন নতুন কীর্তি তার মনের ব ধুলো বালি ঝড়ের মত উড়িয়ে নিয়ে যায়।
হঠাৎ গায়ে কাঁটা দিয়ে শীত করে উঠতেই চম্পা চমক ভেঙে দেখল, সে বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ বুক পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে আছে। পুকুরপাড়ের ছায়াগুলো গাছেদের দূরত্ব পেরিয়ে জলটাকে আরো যেন কালো করে তুলেছে। কেমন ছমছমে। চারপাশে কেউ কোথাও নেই। শুধু একটা নাম না-জানা সান্ধ্যকীট অদ্ভুত স্বরে হঠাৎ ডেকে উঠল।
ঘাড় উঁচু করে চম্পাবতী একবার দেখে নিল জলছোঁয়া সিঁড়ির ধাপের ঠিক ওপরের ধাপটা। সেখানে নতুন লাল পেড়ে তারেশাড়ি আর গামছাটা। আর, গামছার ভজে রাখা আছে সেই লাল কার। আর, তার মধ্যে বন্দি একটা বিন্দুতে চম্পার সমস্ত ভবিতব্য।
চম্পার সমস্ত শরীর নিজের অবশে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।
চোখের তারায় বিধে রেখে হঠাৎই আসনের পাশ থেকে ডান হাতের মুঠোয় খামচে তুলে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। ঠিক চম্পার কোলের ওপর এসে পড়েছিল। আর সেই মৃদু আঘাতেই ঘোর কেটে গিয়েছিল চম্পার। কোলের শাড়ির ওপরে জ্বলজ্বল করছে একটা রক্তজবার কুঁড়ি। আনন্দে, কৃতজ্ঞতায় উদ্বেল চম্পা জলরা আবছা চোখ তুলে আবার তাকাতেই ভীষণ অবাক হয়ে দেখল সামনের বেদির ওপর এক উজ্জ্বল মহাপুরুষ নিমীলিত চক্ষু। ধ্যানমগ্ন। শান্ত। স্থির।
ততক্ষণে চারপাশের সবাই এই পরম ভাগ্যবতী বউটির দিকে চরম কৌতূহলে চেয়ে আছে।
বুক জলে দাঁড়িয়ে চম্পা নিজেকে উন্মোচন করতে শুরু করল। তারপর একহাতে সিক্ত বস্ত্র সম্পূর্ণ অনাবৃত চম্পাবতী জলের আড়াল থেকে আস্তে আস্তে উঠে চলল জলের ওপরের শেষ সিঁড়িটির দিকে।
লজ্জাহীন আবরণহীন চম্পাবতী নতুন গামছাটার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তুলে নিল তার স্ত্রী জমের পরম প্রাপ্তির আশ্বাস। আর তখনই সে আবার দেখল সেই চোখ দুটো। রক্তকষায়। সদ্যোপিত ধ্যানভগ্ন জ্যোতির্ময় উজ্জ্বল বাদামি চোখের দুটো তারা। তার শরীরের সমস্ত যৌন রন্ধ্রে যেন অনন্তকাল বিধে থাকবে। অথচ তাতে একবিন্দু পাপ নেই। একতিল কাম নেই। কোথাও কামনার লেশমাত্র স্পর্শ পর্যন্ত নেই।
চম্পা চোখ বুজে ফেলল। কতক্ষণ এমনি ছিল সে নিজেও জানে না। হঠাৎ সে শুনতে পেল তার নিজেরই নাম। কে যেন ডাকছে। দূরে। সই-এর গলার মত।
ঘোর কাটতেই বুঝল সে একা সন্ধ্যার অন্ধকারে নির্জন ঘাটের সিঁড়ির শেষ ধাপে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ধরা সেই মন্ত্রপূত রক্তজবার ফুল। একটা রুপোর মাদুলির মধ্যে ভরে লাল কারে ফাঁস দিয়ে বাঁধা। তাকে এই মুহূর্তে কোমরে ধারণ করতে হবে। তারপর নতুন কাপড় পরে আর গামছা গায়ে ঘরে ফিরে যাবে সে।
.
৩.
আজ দারুণ করে সাজতে বসেছে চম্পা। তার মনের মানুষটার ব পছন্দ আজ সে অঙ্গে ধারণ করবে।
সকাল থেকে ঘর সাজিয়েছে। এক্কেবারে মনের মত। বিছানায় নতুন চাদরে। মাথার বালিশে ফুলকাটা চাকা। মাথার কাছে ঘটিতে বাগানের সদ্য ফোঁটা এক থোকা বেলফুল আর দুটো গন্ধরাজ।
আর বিছানার পাশে একটা তিন পায়া টেবিলে একটা কাঁচের গ্লাস। জগে জল। এক বাটি চানাচুর ঢাকা দিয়ে রাখা। যদি মিইয়ে যায়। আসল জিনিসটা রেখেছে দেরাজের এক কোণে।
সই কাল সন্ধেবেলা চুপি চুপি দিয়ে গেছে।
-–শোন চম্পা, এটা রাখ। আদ্দেকটা আছে। তোর বঠাকুর মাঝে মাঝে রাতে ঘুম না এলে ওষুধের মতন খায়।
তারপরে চোখ মটকে আর হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিল।
—কিন্তু সই, আমার যে ভীষণ বুক ঢিপ ঢিপ করছে। যদি বুঝে ফেলে।
–কেন, এধ্ব একদম ছোঁয় না বুঝি?
–না তা নয়। কালে ভদ্রে, পুজো পার্বণে বা যাত্রাপালা গাইতে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে…
—তবে আর ভয় কীসের। আজ বউ নিজের হাতে সোহাগ করে মুখে ধরবে। বল নেশা হবে। আর সেই ঘোরে…..
–যাও, ছি, তুমি না। এক্কেবারে যা। কথায় কোন হায়া নেই।
—আহারে হায়া রানি। ভেবেই একেবারে লাল টুকটুকে হয়ে গেছে। তখন না জানি….।
—তুমি যাওতো, লজ্জা শরমের মাথা একদম খেয়ে দিয়েছ।
প্রায় জোর করে সই-কে বিদেয় করে দরজা বন্ধ করে পিছন ফিরতেই আয়নায় নিজেকে দেখে শিউরে উঠল চম্পা।
—কে ও? এত রূপ তার! কই এর আগে নিজেকে তো এমন করে ভালো লাগেনি তার। আজ পনেরো বছরেরও বেশি তার বিয়ে হয়েছে। আর প্রতিটি মিলনের মুহূর্তে সে ভগবানকে ডেকেছে।
ঠাকুর, এবার ঘোচাও। এবার দয়া কর। তারপর পরের মাসটার সেই দিনটার জন্য একটা একটা দিন অপেক্ষা করেছে। আর আকুল হয়ে ভেবেছে।
—যেন পিছিয়ে যায়। দশটা মাস যেন আর না আসে সে দিনটা।
তবু নির্ভুল সময়ে শরীর ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। যেন শুধু শরীর ভেঙে নয়, প্রতি মাসে একবার করে তার মনকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছে সেই একটা দিন। তার সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নকে রজঃস্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে মোচড় দিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে পরের আরো কয়েকটা রক্তাক্ত দিন।
