এখনও ভাবলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
পুরো তিনমাস আগে থেকে মতলব কষেছিল দুজনে। গঙ্গাজল সই-এর ছোট জায়ের বাপের বাড়ি কর্ড লাইনে মাঝের গাঁয়ের পরে দুয়ারপাতায়। তার পাশের গ্রাম বৃন্দাবনপুর। গ্রামের সীমানায় ক্যানেলের ধারে খুব বড় একটা শ্মশান। বস্ত্রখানেক ধরে একজন সাধু হঠাৎই সেখানে এসে রয়েছে। সবাই বলে ত্রিকালদর্শী ব্রহ্মজ্ঞানী। অগুণতি বছর ধরে নাকি হিমালয়ের কোন দুর্গম গুহায় তপস্যা করে সিদ্ধি পেয়েছে। যে যা মানত করছে তাই ফলছে।
সেদিন মাঝদুপুরে সই এসে হাজির।
—ও সই, তোর কাছ থেকে পান খেতে এলুম। আমার বাটায় আজ পান বাড়ন্ত। তোর বঠাকুরও দুদিন ধরে বাড়ি নেই।
—তাতে কী হল। আমি থাকতে তোমার ভাবনা করার দরকারই বা কী। আজকাল বুঝি আমাকে পর ভাবতে শুরু করেছ?
—পর ভাবলে কি আর দৌড়ে আসতুম। পান ফুরোনোটা তো ছুতো। তোর জন্যে খবর আছে। জোর খবর।
সই বেশিক্ষণ আর আগডুম বাগডুম খেলতে পারে না।
-যে দিন থেকে তোর বটঠাকুর গেছে আমি শুধু ঘর আর বার করছি। কখন তোকে একলা পাব। হারে, পানু ঠাকুরপো আবার এক্ষুনি ফিরে আসবে না তো রে?
—সে ভয় নেই। তোমাদের ছোটঠাকুর এখন তিদিন ঘরমুখো হবে না। বর্ধমানে পালা আছে। তুমি বস তো। আমি হেঁসেল গুছিয়েই আসছি। আমার জন্যেও একটা পান সেজ। আমারটায় একটু বেশি করে খয়ের।
–বুজেছি গো বুজেছি। পুরো কৌটোটাই উপুড় করে দিচ্ছি না হয়। কিন্তু এখন পান খেয়ে লাল টুকটুকে ঠোঁট করে কাকেই বা দেখাবি। ছোট্ঠাকুরতো ঘরেই নেই। এমনিতেই তো রূপের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। তার ওপর আবার এত বাহার কেন লা।
বলে ফেলেই সই বুঝলো বড় বেফাস ঠাট্টা হয়ে গেছে। এমনিতেই স্নেহের রঙ্গে রসে রসিকতায় তার চেয়ে বছর তিন চারেকের ছোট পাশের বাড়ির এই বউটাকে সে কীভাবে যেন আপন করে নিয়েছে। মায়ের পেটের বোনের চেয়েও যেন বেশি। তাই ওর জীবনের সব দুঃখ, আর না-পাওয়া ফাঁকগুলো ভরানোর জন্য সে সবসময় উন্মুখ হয়ে থাকে। তবু ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে গেল। এই জন্যেই বলে মেয়ে মানুষের মরণ।
চম্পা ততক্ষণে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সুন্দর মুখের ওপর বেদনার একটা আবছা ছায়া আর চোখের কোণের থমকানো জল, আটপৌরে বেশবাস—সব মিলিয়ে যেন একটা বিষাদপ্রতিমা।
সই-এর বুকটা তা দেখে দুমড়ে মুচড়ে উঠল। হাঁটু মুড়ে বসতে বসতে চম্পা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস লুকোতে চাইল। তারপর ধরা গলায় বলতে থাকল।
—আমার কি আর দেমাক দেখানোর রাস্তা আছে, সই। ভগবানই তো আমার সব দেমাক ঘুচিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে জম্মের আসল দেমাকই যে কোনদিন আমি দেখাতে পারব না, সই। এই তুচ্ছ শরীর আর রূপের ঠমক আর কদ্দিন। পোকা পড়ল বলে।
—আর বলিসনে সই। কী বলতে মুখ ফসকে কী বলে ফেলেছি তার জন্যে আমাকে তুই এইসব শোনাচ্ছিস। তুই কি চাস আমি তোর পায়ে মাথা কুটে মরি। তোর জন্যে …..।
কান্না বড় ছোঁয়াচে। দুটো প্রায় সমবয়সি মেয়েমানুষের চোখে তা এখন আরো চুম্বক।
.
২.
গলা পর্যন্ত জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে চম্পা মাঝে মাঝে আপন মনেই হেসে ফেলছে। একবার মুখের মধ্যে জল নিয়ে কুলকুচি করে খেলার ছলে ফোয়ারার মত অনেকটা দূরে ছিটিয়ে দিল। আজ তার আনন্দ যেন আর ধরে না। সমস্ত শরীর আর মনে কী। একরকম খুশির ঢেউ যেন আছড়ে আছড়ে পড়ছে।
লোকটা একদম পাগল। তিনদিন মাত্র গেছে। তার মধ্যেই খবর পাঠিয়েছে। আজ সকালেই পাশের পাড়ার একজন বর্ধমান থেকে ফিরে এসেছে। তার হাতে পাঠানো আঠায় আটকানো একটি চিরকুট।
–আমার বেঁজি বউ। দুদিন তোমায় না দেখেই আমার মজনুর হাল। মাইরি বলছি। আজ সন্ধের ট্রেনে ফিরব। তারপর….
বাকিটা পড়তে পড়তে চম্পার মুখ চোখ একা একাই গরম আগুন হয়ে উঠেছিল। যত দিন যাচ্ছে লোকটার পাগলামি তত বাড়ছে। আদিখ্যেতা। তবে এবার থেকে কিন্তু বেঁজি বউ বললে আর সাড়া দেবে না সে।
আর একবার ফিক করে হেসে ফেলল চম্পা। তারপর দুহাত ছড়িয়ে জলের মধ্যে দু-পা ছুঁড়ে কিছুটা সামনে ভেসে যেতেই চম্পার পেছনের শাড়িটা জলের ওপর বেলুনের মত ফুলে ফেঁপে উঠল।
লোক তাকে বাঁজা বলে। আটকুঁড়ি বলে আড়ালে গাল দেয়। তার মুখ দেখে সকালে উঠলে নাকি গেরস্তের হাঁড়ি ফেটে যায়। প্রথম প্রথম তার খুব গায়ে লাগত। দুঃখ হত ভীষণ। সে একা একা কাঁদত। মনে হত যেদিকে দুচোখ যায় চলে যায়। কিংবা জীবনটাই শেষ করে দেয়। কিন্তু পারত না। শ্বশুর নেই, শাশুড়ি নেই, ননদ জা দেওর কেউ নেই। একেবারে ঝাড়া হাত পা সংসারে শুধু ঐ লোকটার কথা ভেবে সে সব সহ্য করে নিত। লোকটারও তো সে ছাড়া আর কেউ নেই। যাত্রাপাগল লোকটাকে পাড়ার লোকেরা বউ-এর ভ্যাড়া বলে। শুধু চম্পা জানে, সে কত ভাগ্যবতী। ভগবান দেন নি তাই সে মা হতে পারেনি। লোকটার কি দোষ। সে তো চম্পাকে অবহেলা করেনি। রং সন্তান দিতে পারে নি বলে চম্পা নিজেই বুকের ওর পাথর চাপিয়ে সতীন ঘরে আনতে বলেছে। তা শুনে লোকটা এই মারতে যায় তো সেই মারতে যায়। তারপর দুদিন বেপাত্তা। তিদিনের দিন যখন সে ফিরল তখন তার কালির বর্ণ রূপ আর ক্ষয়াটে চেহারা দেখে চম্পা কেঁদে বাঁচে না। পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল। আর কোনদিন চম্পা সতীন আনার নাম মুখেও আনবে না।
