তাই নাকি, তাই নাকি? ওঃ, কি মধুর যোগাযোগ। গতজন্মে পত্নীসুখ জোটেনি আমার। তাই এজন্মে স্ত্রীভাগ্যশালী হবার বাসনায় পথে নেমেছি।
শুভকাল উপস্থিত বিবেচনা করে মুখুজ্জে পেত্নী আনন্দবিহ্বল হয়ে পড়লেন। পাছে দেরী হলে নানা বাধা এসে হাজির হয় সেজন্য তড়িঘড়ি ঘেঁটুফুলের মালা পরিয়ে দিলেন সেই গাইয়ে ভূতের গলায়। গাইয়ে ভূত আবার সেই মালা প্রেমাস্পদের কণ্ঠে পরিয়ে দিল। চারচোখের মিলন হতেই কনের চক্ষুস্থির।
সহসা তারা পরস্পরকে চিনতে পারলেন। আরে, তারা যে ইহলোকের মুখুজ্জে দম্পতি। কিন্তু মালাবদল যে হয়ে গেছে, তাই দুজনের কারও কিছুই করার রইল না। শুধু একটা সত্য তারা উপলব্ধি করতে পারলেন—স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন হলো জন্মজন্মান্তরের চিরবন্ধন—কোন কালেই তা ছিন্ন হবার নয়।
বন্ধ্যা – তমাল লাহা
চম্পাবতী একবার করে এসে জানলার কপাটের ফাঁক দিয়ে দেখে যাচ্ছে। তারপরে আবার রান্নাঘরে হেঁসেল গুছোতে চলে যাচ্ছে। আর প্রতিবারেই ফিরে যাবার সময় তার মুখটা বেশি বেশি করে ভার হয়ে যাচ্ছে। শেষ দুবার বিড়বিড় করে আপনমনে কাকে যেন কী বলতে বলতে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। আর নুনের বয়ান, মশলার কৌটো, চা-দুধের শিশিগুলো শুধু একটু মাত্রাতিরিক্ত ঠকা ঠকা শব্দ করে নড়ে চড়ে বসে জানান দিতে লাগল, চম্পাবতী ভিতরে গুছোন দিচ্ছে।
শেষ বেশ চম্পাবতী পাকাঁপাকিভাবে রান্নাঘর ছেড়ে হলুদমাখা আঁচলে জলে ভেজা হাত আর ঘামে ভেজা মুখ মুছতে মুছতে ঐ জানলার কপাটের ফাঁকে চোখ গলিয়ে দাঁড়াল, তখন বাইরে বিকেল প্রায় মরে এসেছে। চম্পাবতীর নাকের তেঁতুলপাতাটা আচমকা খুশিতে ঝিকমিক করে উঠল। যদিও মুখে কোন রোদ পড়ে নি তাও কেমন লালচে গোলাপি আভায় ভরে উঠল চম্পাবতীর শ্যামলা চিকন মুখ, তেলতেলে ভেজা ভেজা ঠোঁট, আর পাখির ডানার মত স্বাভাবিক ভুরু। আর আটপৌরে তাঁতের শাড়ির ঘোমটার বেড়ের ফাঁকে তার চল্লিশ পেরুনো টান টান ত্রিভুজ গ্রিবায় একটা নীলচে শিরা যেন অকারণই চঞ্চল হয়ে উঠল।
চম্পাবতীর ওটা সংস্কার। হাজার গরমে ভেপসে গেলেও বা বাড়িতে কেউ না থাকলেও সে ঘোমটা খুলবে না। সেই যে কবে কোন ছোটবেলায় তার দিদিমা তাকে শুনিয়ে দিয়েছিল—দিদিভাই, ঘোমটাটা হল হায়া। মেয়েমনিষ্যির ওটাই আসল পোষাক। হায়া না থাকলে আর রইলটা কী। বুঝলি দিদিভাই, তাহলে তো মেয়ে জম্মোটারই কোন মানে রইল না।
সেই যে মনে গেঁথে গিয়েছিল, ব্যাস। আর সেই ঘোমটার ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হতে পারে নি। একলা স্নানের সময়ও সে বে-আব্রু হতে পারে না। নিজেকেই কেমন যেন লজ্জা লাগে তার।
–যাক বাবা, এতক্ষণে ঘাটগুলো ফাঁকা হল। কতা যেন আর শেষ হয় না। বাসন মাজতে আসা, না পাড়া-পড়শির হাঁড়ি ঘাঁটা। সেই তখন থেকে নড়ার আর নাম করে না।
মুখঝামটা দিয়ে আপন মনে বকবক করতে করতে চম্পাবতী ঝটপট তার গায়ের আঁচল খসিয়ে পেট কাপড়ের বাঁদিকের গোঁজাটায় হাত দিল। আজ তার লাজ শরমের বালাই নেই।
আসলে এ পাড়ার ঐ একটাই জল সইবার বড় পুকুর। পুকুরের চারপাশে মোট আটখানা ঘাট। একটাই শুধু বাঁধানো। আর ঐ শানবাঁধানো ঘাটটাতেই দুপুরের এঁটো বাসন নিয়ে এ পাড়ার বৌঝিরা আসে প্রতিদিন। ঠাপাও যায়। তারপর বাসন ধোয়ার ফাঁকে ফাঁকে চলে গল্প। যতক্ষণ না সূর্যদেব পাটে বসেন। তারপর ধড়মড় করে সবাই ঘরে ফিরে যায়। মাঠ থেকে কত্তা বাড়ি ফিরবে, গরুটাকে জাব দেখিয়ে গোয়ালে তুলতে হবে, তুলসীতলায় প্রদীপ দিতে হবে, রাতের চুলো ধরাতে হবে …..। এমনি কতরকম ঝক্কির কথা সবার মনে পড়ে যায়।
আর যেদিন ঘাটে যে অনুপস্থিত থাকে তাকে নিয়েই সেদিন যত আলোচনা। আজ চম্পাবতী যায়নি। আর আজ তাকে কেন্দ্র করেই যে ঘাটে যত আচার খাওয়া চলছিল, চম্পা সেটা নিকস জানে। তবে তার জন্যেই যে সে অতবার জানলা দিয়ে পুকুরটা দেখছিল আর রাগে গরগর করছিল তা নয়। আসলে আর তার তর সইছিল না।
পুকুরটাকে আজ তার একা চাই। একদম একা। এবং ঘাটটাও চাই বেবাক ফাঁকা। সুনসান। তা না হলে ঐ সময় কেউ দেখে ফেললেই তো সব গেল।
গঙ্গাজল সই তাকে পইপই করে বলে দিয়েছে। একটুকুও যেন পান থেকে চুন খসে। প্রতিটি নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে পারলে তবেই সিদ্ধিলাভ। একদম অব্যর্থ। আজ পর্যন্ত একজনেরও বিফলে যায় নি।
ভীষণ জাগ্রত মহাপুরুষ। ত্রিকালজ্ঞ তান্ত্রিক। চারপুরুষের সাধনা। তেমনি রাগি। কারোর দান গ্রহণ করেন না। সিদ্ধি হলে তবে একশ আটটা রক্তজবার কুঁড়ি। মায়ের প্রণামী। এমনিতে আজ পর্যন্ত তেনার মুখের কোন কথা কেউ কখনো শোনে নি। একদম মৌনী। শুধু মাঝে মাঝে যোগনিদ্রা ভেঙে গেলে রক্তক নয়ন মেলে শুধু তিনবার হুংকার দেন—ব্যোম, ব্যোম, ব্যোম। সে বড় দুর্লভ দৃশ্য। অনেক জন্মের পুণ্য থাকলে তবেই সে শব্দ নিজের কানে শোনা যায়। সেই ঐশ্বরিক দৃশ্যের চর্মচক্ষে সাক্ষী থাকা যায়।
আর সে রকমই এক অপার্থিব মুহূর্ত ছিল সেটা। তার বন্ধ চোখের মধ্যেকার গাঢ় অন্ধকার হঠাৎ যেন একটা আলোর ত্রিশূলের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। আর সেই উজ্জ্বলতার দীপ্তিতে তার চোখের পাতাদুটো কেউ যেন জোর করে খুলে দিল।
একদম সোজাসুজি বিধে আছে। একজোড়া ঝকঝকে বাদামি তারা। তার থেকে দুটো অলৌকিক দৃশ্যমান আলোর রেখা যেন তার চোখ দুটোকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। কী ভয়ঙ্কর সুন্দর সেই পুড়ে যাওয়া। যেন সম্মোহন। চারপাশের আর সবাই যেন কোন মন্ত্রবলে উধাও।
