অবশেষে এক অমাবস্যার রাতে চারদিক যখন শুনশান তখন মুখুজ্জে পেত্নী, স্বামীর অভাব তথা পুরুষলালসায় স্বয়ংবরা হবার জন্য ঝোঁপ-জঙ্গল, জলায়-বিলে, পোড়োবাড়িতে হানা দিলেন। চারদিকে অথৈ আঁধারের বন্যা। অন্তরে তার রূপের বন্যা হৃদয়ে পতিবিরহের জ্বালা। মুখুজ্জে পেত্নী রাজজাগা নিশাচর পাখির কর্কশ সুরের টানে বেভুল হয়ে জোনাকির টিপিটিপি আলো জ্বলার মৃদুমন্দ তালে তালে ঝিঝির করুণ রাগিনীতে আপন বেদনা মিশিয়ে দিয়ে ব্যাকুলা-বিহুলা হয়ে পথ চলতে লাগলেন। তাঁর পাগলিনী আলুথালু রূপ দেখে ছানাপোনা কচিকাচা ভূতের দল তার সংস্পর্শ এড়াতে সবেগে স্থান ত্যাগ করতে লাগলো। কেবল এক বৃদ্ধ খঞ্জবধির মেছোভূত জলায় মাছধরার কাজে এত মনোযোগী ছিল যে কামবিধুরা পতিলোভী পেত্নীর আগমনের কোন শব্দ শুনতে পেল না।
মুখুজ্জে পেত্নী অগ্রপশ্চাৎ ভুলে খঞ্জ বধির মেছোভূতকে এইজন্মের পতি হবার জন্য প্রস্তাব নিবেদন করলেন। কানে কিছু না ঢোকার কারণে মেছোভূত নীরব থাকলো পেত্নীসুন্দরীর প্রস্তাবে। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়ে পেত্নী সুন্দরী শীর্ণবাহুযুগল দিয়ে মেছোভূতের কণ্ঠলগ্না হবার চেষ্টা করামাত্র সে পেত্মীর মুখে ছুঁড়ে মারলো পচা মাছের গলা দেহ।
ঘরে আমার রূপসী শাঁকচুন্নী বউ থাকতে আমাকে ফুসলোনর মতলব আঁটছিস হতচ্ছাড়ি? তোর সাথে আমাকে শাকচুন্নী যদি একবার দেখে তবে তুই মরবি—আমি তো মরবই। যা-যা পালা, রসবতী হয়েছিস, রসিক নাগর চিনতে পারছিস না?
রসবতী আর নাগর কথাগুলো মনের আগুন বাড়িয়ে দিলো পেত্নীর। কিন্তু পচামাছের আঘাতের যন্ত্রণা তাতে কমল না। এতকাল এইভাবে তিনি অপরকে শাসন করে এসেছেন একতরফা ভাবে। আজ ভাগ্যের পরিহাসে একটা ল্যাংড়া ভূতের কাছে তার প্রেম নিবেদন ব্যর্থ হলো। অপমান বোধ তাকে কুরে কুরে খেতে লাগলো। কিন্তু, এত সহজে হাল তিনি ছাড়বেন না। তিনি জানেন প্রেমের পথে হাজারো বাধা। এত অল্পে হাল ছেড়ে দিলে তার পতিলাভের আশায় যে ছাই পড়বে।
কিছু রাত বাদে প্রথম প্রেমের ব্যর্থতার জ্বালা কিছুটা প্রশমিত হবার পর তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে পতিশিকারে ব্রতী হলেন। একরাতে ঘুরতে ঘুরতে অসংবৃতা হয়ে এক। পরমসুন্দর যৌবনোচ্ছল ব্রহ্মদৈত্যর সাক্ষাৎ পেলেন। ব্রহ্মদৈত্যর অনিন্দকান্তি দর্শন করে মুখুজ্জে পেত্নীর অন্তরের বিরহজ্বালা দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো। ‘প্রেম দাও, প্রেম দাও’ আকুতিতে তার অন্তঃকরণ প্রেমরসসিক্ত হতে আরম্ভ করলো। স্থান কাল ভুলে মোহিত হয়ে তিনি ব্রহ্মদৈত্যিকে প্রেম নিবেদন করে বসলেন।
আর যায় কোথা, প্রথমবারে পচামাচ্ছে মৃদু আঘাতে প্রেমের লীলা সাঙ্গ হয়েছিল। কিন্তু এবারের আঘাত আরও নির্মম, আরও নিদারুণ। পেত্নীর স্বয়ং হবার আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে ব্রহ্মদৈত্য সহসা তার পায়ের একপাটি খড়ম ধই করে ছুঁড়ে মারলো পেত্নীর মুখের উপর। খড়মটা ঠকাং করে পেত্নীর অন্তঃপাতী নাকে এসে আঘাত করলো। কিছুক্ষণের জন্য মুখুজ্জে পেত্নীর চিন্তাশক্তি লোপ পেল। বোধকরি তিনি জ্ঞান হারালেন।
তিন সংখ্যাটা নরলোকে যত অশুভই হোক না কেন প্রেতলোকে তিনের বড়ই কদর। তিনবার চেষ্টা করলে নাকি সফলতা আসবেই আসবে। মুখুজ্জে পেত্নীর এখন। আশাভরসা বলতে সেই তিন। আজ তৃতীয় পর্বে স্বামী ধরতে বেরিয়েছেন তিনি। বহু্যত্নে ঘেঁটুফুলের মালা গেঁথেছেন। সেই মালা হাতে দুলিয়ে দুলিয়ে পথ চলছে তিনি। আজ তার মনে আশা ও প্রতিজ্ঞার যুগল মিলন। একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বেন আজ। ফুলমালা হাতে নিয়ে পথ চলতে দেখে কেউ তাকে বিদ্রূপ করলো, কেউ কেউ ভয়ে ছুটে পালিয়ে বাঁচলো, তামাশা দেখার আশায় গেছো ভূত, মেছোভূত, কন্ধকাটার দল নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অনুগমন করতে লাগলো। কি জানি কি কারণে সহসা পেত্নীর হৃদয় চঞ্চল হলো। তীব্র খুশিতে ভরে গেল তার মন। তার অন্তর বলছে যাকে তিনি এজন্মে খুঁজে ফিরছেন সে এলো বলে। স্বপ্নসুখের মদিরা পান করতে করতে কম্পিত বক্ষে শঙ্কিত চরণে তিনি ইতিউতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করতে লাগলেন। চলতে চলতে কত সময় পার হয়ে গেছে খেয়াল নেই তার। তিনি সংবিত ফিরে পেলেন দীন ভিখারি এক ভূতের গানের করুণ সুরে। তেঁতুল গাছের মোটা ডালে বসে তন্ময় হয়ে ভূতবাবাজী গাইছিলো—
বড় সুখে দাদা হয়েছিনু গাধা
ঘরে ছিল রায়বাঘিনী।
তাকে দিয়ে মালা বেড়েছিল জ্বালা
সাক্ষাৎ তিনি ডাকিনী।
হাতে হাতকড়া নাকে দিয়ে দড়া
পিছে পিছে অনুগামিনী।
কাঁচাখেকো দেবী ভয়ে তাকে সেবি
নির্ঘাত প্রাণঘাতিনী।
রাতভোর হতে গালি খেতে খেতে
দিন শেষে আসে যামিনী
কানে দেন সুধা ভুলি সব ক্ষুধা
সারারাত মধুভাষিণী!
সংসারে থেকে সং রঙ মেখে
হাসিমুখে দুখ চাপিয়া
সেঁতো হাসি হেসে ভজি অবশেষে
পেত্নীর গুন গাহিয়া।
গান শেষ করে ঝপাং করে ভূতবাবাজী লাফিয়ে পড়ল পেত্নীসুন্দরীর সামনে। হতচকিত হয়ে কিছুটা দুরে সরে গেল পেত্নীসুন্দরী।
ওগো, তুমি কি পথ হারিয়েছ, নাকি কিছু খুঁজছো?
ভূতের কণ্ঠে মধুর জিজ্ঞাসা শুনে মুখুজ্জে পেত্নী বিগলিত হলেন। কত কাল তিনি এরূপ মধুশ্রাবী কথা শোনেননি। কেউ তাকে সামান্যতম প্রণয় নিবেদনও করেনি। তাই আজ যেন নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। কে তুমি? আমার মনের গোপন কথা, গোপন ব্যথা জানলে কি করে? সত্যিই আমি পথ হারিয়েছি গো। একা থাকার জ্বালা সইতে না পেরে স্বামী খুঁজতে বার হয়েছি।
