সেদিন কি একটা কারণে মুখুজ্জেবাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। বাড়ির পরিবেশ আজ যেন কিছুটা আলাদা। ঝগড়াঝাটি, গালিবর্ষণ, আক্ষেপোক্তি এসবই আজ অনুপস্থিত। কিন্তু বাড়ির ভেতরে প্রতিবেশিদের জটলা দেখে কেমন যেন কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। ঘরের বাইরে প্রতিবেশিদের বিষণ্ণ কথাবার্তা আর ঘরের ভেতরে মুখুজ্জেগিন্নির করুণ বিলাপধ্বনি শুনে বাড়িতে না ঢুকে আর পারলাম না। এ আবার মুখুজ্জে গিন্নির কি নতুন রঙ্গ। যা তোক বাড়িতে ঢুকলাম।
দাদা বুঝি এইমাত্র খবরটা পেলেন? আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই অন্য একজন দুঃসংবাদটা শোনাল আমায়। জানেন দাদা, গত রাতে হার্টফেল করে মুখুজ্জেমশাই মারা গেছেন।
একথা শুনে মনটা বাস্তবিকই খারাপ হয়ে গেল। সান্ত্বনা বলতে একটা কথাই বারবার মনে হতে লাগলো যে এবার যেন মরার পর মুখুজ্জেমশাই একটু শান্তি পান। চিন্তার স্রোত আমার থেমে গেল হঠাৎ। কানে এলো মুখুজ্জে গিন্নির করুণ বিলাপধ্বনি—ঘাটের মড়া, হাড় হাভাতে। বজ্জাত মিনসে—তুই তো মরে বাঁচলি। আমাকে কোন যম দুয়োরে রেখে গেলি?
স্বামীর প্রতি মুখুজ্জে জায়ার সশ্রদ্ধ প্রেম ও প্রণয়ের ঘটা দেখে চমকে উঠলাম আমি। মুশুজ্জে মশাই সত্যিই মরে বেঁচেছেন।
শ্রদ্ধশান্তি চুকে গেল নির্ধারিত সময়ে। বৃক্ষের পতনে লতার যে দশা হয় স্বামীর মৃত্যুর পর সুভাষিনী দেবীরও তদনুরূপ দশা হলো। প্রতিপক্ষের অভাবে কেমন যেন বিমর্ষ আপাতগম্ভীর ভাব ধারণ করলেন তিনি। নিন্দুক প্রতিবেশিজন বলতে লাগলোবুড়ো কুচুটে বুড়ির হাত ও মুখ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে। আর আমরা মুক্তি পেয়েছি বুড়ির বাক্যযন্ত্রণা থেকে। যারা বয়সে নবীনা সেই লাস্যময়ীর দল বুড়িকে দেখে বিদ্রূপ করতো—দেখ, দেখ বুড়ি বুড়োকে জ্বালাতে না পেরে কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। আহা রে! বুড়ির কষ্ট দেখে আর বাঁচি না। বুড়ো নিজে মরে বুড়ির আজ এ কি দশা করলো।
তা পরনিন্দা করা যাদের স্বভাব তারা তো করবেই। তবে প্রকৃত তথ্য ছিল এই যে বুড়ি সত্যিই প্রাণের চেয়ে বুড়োকে ভালবাসত। বুড়োর প্রতি বুড়ির প্রেম ও অনুরাগ যে কত গভীর ছিল তা আমরা টের পেলাম কয়েকমাস বাদে। নারকেলের। বহিরঙ্গের ছোবড়া দেখে ভেতরের শাঁসের খবর মেলে না। ঠিক তেমনি মুখুজ্জে গিন্নির উপরের দুর্ব্যবহারের ঘটা দেখে স্বামীর প্রতি তার আবেগ-প্রণয়ের হ্রাসের কথা বিবেচনা করা মূখতার নামান্তর হলো।
মুখুজ্জে গিন্নি অকস্মাৎ একদিন তার ভবলীলা সাঙ্গ করলেন স্বামীবিরহ সহ্য করতে না পেরে। বুড়ির জন্য শোক করার কেউ ছিল না—প্রকৃত সত্যানুসন্ধান না। করার ফলে কেউ দু-ফোঁটা চোখের জলও ফেলল না। নিতান্ত আমাদের অবহেলায় সেই উপেক্ষিতার শেষকৃত্য সমাধা হলো। জগৎসংসার যেমন চলছিল তেমনই চলতে লাগলো। কেবল তার বাক্য বর্ষণের অভাবে পাড়ায় পুনরায় কাক চিল শকুনের উৎপাত বৃদ্ধি পেতে লাগলো। পাড়ায় স্ত্রীলোকেরা কেবল কাক চিলের জ্বালা থেকে মুক্তিপাবার জন্য মুখুজ্জেগিন্নির কথা—তার অনর্গল গালিস্রোতের কথা সংসারে তার প্রয়োজনের কথা স্মরণ করে গোপনে অশুবর্ষণ করতে থাকলো।
***
মৃত্যুর পর বিধবা মুখুজ্জেগিন্নি প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়ে সধবা পেত্নীরূপ পরিগ্রহ করলেন। ইহলোকে এতকাল যিনি আপন সংসারের সর্বময় কীরূপে সংসার পরিচালনার চাবি নিজের অধিকারে রেখে দিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর স্বর্গের চাবির হদিশ করতে পারলেন না তিনি। নরলোকের কর্মফলতঃ তাকে পেত্নীরূপধারণ করতে বাধ্য হতে হলো। এতদিন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালিনী হয়ে গোবেচারা স্বামীর উপর নির্মমভাবে ছড়িচালনা করে তিনি এতই প্রীতি ছিলেন যে আজ একাকিনী শ্যাওড়াগাছ নিবাসিনী হয়ে নিরন্তর অন্তর যন্ত্রণা হাড়ে হাড়ে টের পেতে লাগলেন। হাড়ছাড়া দেহের আর কীই বা অবশিষ্ট আছে এখন! কঙ্কালদেহ ধারিনী হয়ে বিগতজন্মের সুখস্মৃতি স্মরণ করে অতিশয় কার হয়ে পড়তে লাগলেন মুখুজ্জে পেত্নী।
ইহলোক সুন্দরী ছিলেন তার মনে যথেষ্ট আত্মশ্লাঘা ছিল। কঙ্কালসার হলেও পূর্বজন্মের ন্যায় রূপাভিমান প্রেতলোকেও তাঁর বড় কম ছিল না। বরং রাতে রাতে তাঁর দুশ্চিন্তা বাড়তে লাগলো এইভাবে যে নবজন্মের এই দুরন্ত রূপযৌবন কোন প্রেতপুরুষের পায়ে অর্পণ করবেন। দিনের বেলায় প্রেতলোকের অস্তিত্ব থাকে না। তাই রাতে রাতে নব প্রেতযোনি প্রাপ্তা সুন্দরী পুরুষ বিরহে ক্রমশ ক্ষীণতনু আর কৃশ হতে শুরু করলেন। তিনি যতই কৃশ হতে থাকেন ততই তার রূপের জেল্লা বাড়তে থাকে। নিশীথ রাত্রির অভিসারে একাকিনী কান্তারে বসে এজন্মের ভাবী কান্তারের জন্য অন তার অন্তর বারংবার উদ্বেলিত হতে থাকে।
পেত্মীরূপ ধারণ করার জন্য লোকলজ্জার কোন ভয় নেই তার। এখানে তো ইহলোকের মত নিন্দুক লোকই নেই—তো লোকলজ্জা! তার ইহকাল গেছে; কিন্তু পূর্বজন্মের মুখরা স্বভাবের ন্যায় এজন্মেও সেই দোষের কারণে পরকালেরও প্রায় যায় যায় অবস্থা।
মুখুজ্জে পেত্নী যৌবনের তাড়নায় অস্থির। কত রাত না জানি কত কাল ধরে অনন্ত যৌবনমদরসে মত্ত নবীন ভূবাবাজীদের কাছ হতে একটু প্রেম সদ্ভাষণ শানবার জন্য মুখুজ্জে পেত্নীর অন্তরের জ্বালা বেড়েই চলল। কিন্তু ইহলোকে যুবার দল যা করে প্রেতলোকে নবীন ভূরে দল তা করে না। পেত্নী সুন্দরী মনে মনে আক্ষেপ করেন—আমরণ, ছেঁড়াগুলোর ভেতরে সম্ভোগ বাসনা বলে কিছুই নেই। নাকি। আমার মতন যুবতীকে দেখে মর্তের মাসেরা চোখের পলক ফেলত না—আর এখানে ড্যাকরার দল আমাকে দেখেই যেন পালাতে পারলে বাঁচে।
