তিন মাসের মধ্যেই আরতির সব দাঁত একটা-দুটো করে উৎপাটিত হয়ে গেল। ভাটপাড়ায় ভাস্বতী বলেছিল, থার্টি টুঁ অল আউট। দাঁত বের করে আর হাসতে হচ্ছে না! সব গেটআউট। মুখটা তেবড়ে গেল। বয়েস এক লাফে বেড়ে গেল কুড়ি। মাড়ির ওপর পরম যত্নে ডেন্টিস্ট সাজিয়ে দিলেন নকল দাঁত, সবচেয়ে দামি দাঁত। আরতির মা আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন, দাঁত হল মুখের শোভা। কৃপণতা কোরো না বাবা! ঘুরবে ফিরবে ফিক করে হাসবে।
বিকাশ বলল, দেখি মুখটা একবার তোলো। ঘরে আর কেউ নেই তাই সাহস করে বলতে পারল।
বহু সাধ্যসাধনায় আরতি লাজুক মুখে এমন চোখে তাকাল, বিকাশের মনে হল নতুন করে শুভদৃষ্টি হচ্ছে। চোখে সেই রাতের ধারালো দৃষ্টি না থাকলেও একটা স্বচ্ছ গভীরতা আছে। দু সন্তানের জননীর চোখে সেই দুষ্টুমি নেই, বউয়ের চোখে মার চোখ। শোবার আগে আরতি দাঁত দু-পাটি খুলে জলের বাটিতে ডোবাতে যাচ্ছিল। বিকাশ বললে, রাতের এই তো সবে ভরা যৌবন, এর মধ্যে ফোকলা হবে! তোমার মুখটা মাইরি এরকম পালটে গেছে! আগের চেয়ে ভালো হয়ে। গেছে। চলো কাল একটা ছবি তুলে আসি। আবার ছবি। আরতি হাসতে গিয়ে সামলে নিল। নতুন দাঁত। এখনও অভ্যাস হয়নি। কেবলই মনে হচ্ছে খুলে পড়ে যাবে। মনে নেই ওই ছবিটা তোলার সময় কী কাণ্ড হয়েছিল?
তা হয়েছিল। তখন প্রেমের ভাঁটা চলছিল। এখন দাঁতের ঝিলিকে আবার জোয়ার এসেছে। তোমাকে ভালোবাসতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। মাইরি। তোমার হাসিতে আমার টাকার চেকনাই লেগেছে।
বিকাশ আরতির কোমরটা ধরে কাছে টেনে নিল। একমুঠো কোমর আর নেই, একটু চর্বি জমেছে। তাহলেও চোদ্দো বছর পেছিয়ে যেতে খারাপ লাগল না। কানের কাছটা তোমার হাজার টাকার দাঁত দিয়ে সেই, সেই প্রথম রাতের মতো একটু কুটকুট ইঁদুর-কামড় দাও না।
আহা কী আব্দার! তারপর যাক আর কি ভেঙে। মনে নেই ডাক্তারবাবু কী বলেছেন? ডেলা ভেলিগুড়, আমের আঁটি, ছোলা ভাজা, চকোলেট বার, শাঁক আলু এসব নকল দাঁতে চলবে না। আমার কানটা তোমার লিস্টে নেই। একটা রিকোয়েস্ট রাখো না গো। তোমার জন্যে এত করলুম। দংশনে বিকাশ সে আনন্দ পেল না। তেমন ধার নেই। ভসকা পেঁপের মতো স্বাদ। নকল। দাঁতে আর যেই হোক, লাভবাইট তেমন জমে না। দাঁত ওষুধ মেশানো জলে গা ধুতে গেল। দাঁতহীন আরতি বিকাশের পাশে লেপের তলায় এসে ঢুকল। বিকাশ হু করে একটা শব্দ করল। হাই তুলে বলল, ঘুমিয়ে আছে এক দিদিমা সব যুবতীর যৌবনে। তাই না!
বন্ধন – ভাগ্যধর হাজারী
পাড়ায় মুখুজ্জে গিন্নির দুর্নাম বড় একটা কম ছিল না। তবুও পাড়ার লোকে কখনও কখনও সজ্ঞানে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতো কারণ মুখজ্জে গিন্নির কৃপায় পাড়াতে কাকচিলের উৎপাত ছিল না বললেই চলে। তাঁর গালিবর্ষণের লাভাস্রোতের ঠ্যালায় ঘরজ্বালানি পক্ষীকূলও মুখুজ্জে বাড়ী ও অসংলগ্ন অঞ্চল সভয়ে এড়িয়ে চলত।
মুখুজ্জে গিন্নির বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। মা বাবা বড় সাধ করে মেয়ের নাম রেখেছিলেন সুভাষিনী। তা তাদের দেওয়া নাম সার্থক হয়েছে বটে; সুভাষিনী দেবী কদাপি সেই নামের আংশিক অমর্যাদাও করেননি এ যাবৎ কাল। কারণে অকারণে যে কোন জায়গায় তিনি অপদস্থ হলেই গৃহে প্রত্যাবর্তন করে স্বামীকে তীব্র বাক্যবাণে জর্জরিত করতে তিনি ভয় পেতেন না। ঘরের বাইরে তিনি যত অন্তর্মুখী, স্বামীসান্নিধ্যে তিনিই আবার রণরঙ্গিণী চামুণ্ডাসদৃশা।
পক্ষান্তরে, মুখুজ্জেমশাই নিতান্তই গোবেচারা ধরনের জীব। সমাজে একপ্রকার নোক থাকে যারা ভেবে থাকেন বিবাহের পরমক্ষণ থেকেই স্বামীগণ স্ত্রীর নিকট বলিপ্রদত্ত। আমাদের মুখুজ্জেমশাইও সেই ধরনের। তাই কাদায়পড়া গরুর মত গাড়োয়ানের পাঁচনের শত আঘাত সহ্য করেও কোনদিন তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন না অথবা পুচ্ছ তাড়না করে স্ত্রীর রোষবহ্নিতে ইন্ধন জোগালেন না। দিকচক্রবালকে স্পর্শ করার আশায় যতই এখোন যাক না কেন তা যেমন অধরাই থেকে যায়, মুখুজ্জেমশাইও দাম্পত্যসুখের স্পর্শানুভূতি লাভের চেষ্টা করে সেরকমই পুনঃপুনঃ ব্যর্থ হন।
মুখুজ্জেদম্পতি নিঃসন্তান। মুখুজ্জেমশাই সরকারের উচ্চপদে চাকুরী করনে একসময়। এখন মাসে মাসে পেনশন হিসেবে যা পান তাতে বুড়োবুড়ির ভালভাবেই চলে যায়। তাছাড়া বসতবাড়ির কয়েকটা ঘর ভাড়া দিয়েও বেশ কিছু টাকা ঘরে আসে। সংসারে আর্থিক অনটন বলতে যা বোঝায় তা তাদের ছিল না। তবু অভাব ছিল—ভাবের অভাব।
যৌনবয়সে মুখুজ্জেমশাই স্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু বিধি বাম থাকার জন্য আর তাঁর সর্বদা ডানপন্থা অবলম্বন করার কারণে তিনি বামাজাতির মনোহরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইয়ার বন্ধুরা এই ব্যাপারে কটাক্ষ করলে তিনি হাসিমুখে বলতেননাঃ ভাই, মনোচোরা হয়ে ফাঁসি যেতে পারব না। এই বেশ আছি। হজম না করতে পারি, বদহজমের জ্বালা থেকে তো বেঁচেছি।
তিনি স্ত্রীর হাত থেকে সত্যিই বেঁচেছিলেন না কি বেঁচে মরার স্বাদ পাচ্ছিলেন তা তর্কের বিষয়। সত্য এই, স্ত্রীর প্রতি তার ভালবাসা বিন্দুমাত্রও কমেনি; লাঞ্ছনাগঞ্জনা, কটুক্তি বই তার ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিলেন।
প্রতিবেশিরা এসবের সব খোঁজই রাখতে। তাই সকালসন্ধ্যা কলহপ্রিয়া স্ত্রীর অমধুর লাভাস্রাবী বাক্যস্ফুরণে শব্দদূষণের মাত্রা তীব্রতর হলেও তারা প্রায়শই নীরব থাকতেন। কখনও তাদের বিরক্তির কথা কেউ যদি প্রকাশ করে ফেলত সুভাষিণী দেবী ঘরের ভেতরে গোবধের পালা মাঝপথে থামিয়ে সম্মার্জনী হস্তে বার হয়ে প্রতিবাদীর ঝুলিঝাড়নের কাজে প্রবৃত্ত হতেন। আমরা সচরাচর সে বাড়ির ছায়া মাড়াতাম না।
