অকস্মাৎ নিষ্ঠুর আঘাতে সে মূর্তি ভেঙে গিয়েছিল।
কাজরীর বাবাই খবরটা এনে গিয়েছিলেন। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে নাকি তাঁর ঘুম হচ্ছিল না। গোপনে কুণাল সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়েছিলেন তিনি।
কাজরীকে একদিন তিনি ডেকে পাঠালেন। তার কাছে উদঘাটিত করে দিলেন কুণালের প্রকৃত পরিচয়।
কাজরীর চোখের সামনে রূপেবর্ণে-গন্ধে-ভরা তিলেতিলে গড়ে-ওঠা আনন্দলোক মুহূর্তে বিবর্ণ বিরস হয়ে ওঠে। মনের কানায় কানায় ভরে-ওঠা অমৃত বিষে রূপান্তরিত হল।
কাজরীর বাবা রণদাবাবু ম্যাকনেইল অ্যান্ড বেরীতে খবর নিয়ে জেনেছিলেন যে, কুণাল সেখানে চাকরি করে না। তারপর হঠাৎ কুণালের মায়ের খোঁজ পেলেন; বাগবাজারের এক অখ্যাত গলিতে মাটির দুটো ঘর ভাড়া করে তিনি তার নাবালক ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকেন। কুণালের সামান্য রোজগারই তার একমাত্র অবলম্বন। কোনও এক মাড়োয়ারীর গদিতে কুণাল নাকি কাজ করে, বেতন তিন শো নয়, দেড় শো। বি.এ. পাস করেই সে নাকি চাকরিটি নিয়েছিল। দিল্লী য়ুনিভার্সিটিতে এম.এ. ক্লাসে ভর্তি সে কোন কালেও হয় নি। কাজরীর সঙ্গে কুণালের বিয়ের খবর কুণালের মা বিয়ের প্রায় এক মাস বাদে জানতে পারলেন। এতদিন কুণালের কোন খোঁজ ছিল না। বাড়ি ছেড়ে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়েছিল কুণাল। রণদাবাবুর নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে কুণালের মা তার কাছে এসেছিলেন।
রণদাবাবুর কাছে তিনি তার ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য ভিক্ষা জানিয়ে গেছেন।
রণদাবাবু কাজরীকে বললেন, বুদ্ধি-বিবেচনা তো তোর কম নয় মা, এখন ভেবে দেখ কী করব!
দু চোখে দুঃসহ জ্বালা ছিটিয়ে কাজরী বলল, কে তোমাকে অত খোঁজ খবর নিতে বলেছিল বাবা! তোমাকে আমি বলিনি আমাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি তুমি করো না?
দু চোখ কপালে তুলে রণদাবাবু বললেন, গোয়েন্দাগিরি কাকে বলছিস মা। কুণালের মা নিজেই খোঁজখবর নিয়ে এলেন, তাতেই জানলুম
রণদাবাবুর কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কাজরী।
রোজকার মত সেদিন রাত্রে কুণাল দু ছড়া রজনীগন্ধার মালা নিয়ে ঘরে ফিরেছিল। মালা দুটো টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে দিল কাজরী।
এ কী করলে কাজরি!কুণাল আর্তস্বরে বলে ওঠে।
ঠিকই করেছি। কঠোর স্বরে কাজরী বলল ও আমার গলায় তোমার হারে ফুলের মালার চেয়ে দড়ি দেওয়াও ভাল। তোমার অসংখ্য মিথ্যার মত ও-মালাটিও তো ছল!
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কুণাল। কাজরীর কথাগুলো যেন গলিত ধাতুর মত তার কানে এসে ঢুকতে থাকে। অতি কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে নিয়ে সে বলল, সব শুনেছ মনে হচ্ছে, কিন্তু কী করে?
তোমার মা আমার বাবার কাছে এসেছিলেন। তা ছাড়া ম্যাকনেইল এ্যান্ড বেরীতে আমার বাবার যাতায়াত আছে। কঠিন জমাটবাঁধা গলায় বলল কাজরী।
পাংশু হয়ে ওঠে কুণালের মুখ। কিন্তু সে কয়েক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে কাজরীর প্রদীপ্ত চোখ দুটির দিকে চেয়ে সে বলল, নিজের দৈন্য ও তুচ্ছতা নিয়ে তোমরা কাছে এগুতে সাহস হয়নি, তাই মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছিলাম। মিথ্যের দুঃসহ গ্লানির বোঝা মাথা পেতে নিয়েছিলুম তোমাকে পাবার জন্যে।
কিন্তু কেন?—দু চোখে অমানুষিক জ্বালা ছিটিয়ে কাজরী বলল। কী করে জানলে তোমার দারিদ্র্য আমি সহ্য করতে পারব না?
কুণাল গাঢ় কণ্ঠে বলল, আমার দেউলে-হওয়া জীবনে দাঁড়াবার জায়গা নেই। সেখানে তোমার যোগ্য ঠাই ছিল না। আমার দৈন্যের ফাঁকে ভালবাসার ফুল ফোঁটাতে পারতুম না। ভারবাহী পশুর পরিচয় নিয়ে কী করে বলতুম তোমায় যে, তোমাকে আমি ভালবাসি?
তাই বলে নিজের বিধবা মা, নাবালক ভাইবোনদের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে এসে নিজের সুখ খুঁজেছ!
কুণাল ম্লান হেসে বলল, নিজের সুখ! সুখই শুধু দেখছ কাজরী! রম সুখের জন্যে রম দুঃখের মূল্য আমি দিয়েছি সে তো তুমি জান না।
খুব হয়েছে, থাম। কাজরীর সুন্দর মুখে নির্দয় কাঠিন্য ফুটে ওঠে : ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলতে খুব পার। মিথ্যে মিথ্যে—যা বলছ সবই মিথ্যে। এক ফোঁটা সত্য নেই তোমার মধ্যে। তোমার ভালবাসাও মিথ্যে।
মড়ার মত সাদা হয়ে ওঠে কুণালের মুখ। তার আহত দৃষ্টির মর্মান্তিক বেদনা কাজরীর নজরেও এল না।
খাটের একটি প্রান্ত দু হাত দিয়ে চেপে ধরে যেন প্রাণপণ আঘাত হজম করবার চেষ্টা করেছিল কুণাল। কোন কথাই বলতে পারেনি।
কাজরীর মনের আগুন আত্মবিস্মৃত চিৎকারে ফেটে পড়ে : আর এক মুহূর্তও তোমার সংস্রব আমি রাখতে চাই না। এই এক মাস তোমার ধ্ব মিথ্যেকে মাথা পেতে নিয়ে নিজেকে তোমার কাছে সঁপে দিয়েছি, এর জন্য নিজেকেও আমি ক্ষমা করব না। আমি চললুম।
না, যেয়ো না।–বলে খপ করে কাজরীর একটি হাত ধরে ফেলল কুণাল। হাতে যেন হাজারটা বিছে কামড়ে দিয়েছে, এমনি মনে হল কাজরীর। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে বলল, ছুঁয়ো না আমাকে। ঠক, জোচ্চোর কোথাকার!
কুণাল শিউরে ওঠে। অস্বাভাবিক সে শিহরণ। অব্যক্ত যন্ত্রণায় তার সুন্দর মুখটা দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। কাজরী দেখল।
অনতিবিলম্বে কুণালের ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেল কাজরী। কুণাল নিষ্প্রাণ পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল, একটি কথাও বলল না।
হিন্দুস্থান রোডে দীপাদের হস্টেল। সেখানে গিয়ে উঠল কাজরী। রণদাবাবু খবর পেয়ে ছুটে এসে বললেন, এ কী, এখানে কেন? বাড়ি চল।
