টিভিটা যেন দাঁড়ে পোষা ময়না। অনর্গল কথা কয়। সেই কথার তোড়ে, ফাঁকে ফাঁকে কমার্শিয়াল ব্রেক, বিজ্ঞাপনের কোলাহলে একাকিত্ব কাটে। নইলে নিজের পায়ের শব্দই যেন তাড়া করে আসে। খোপের পায়রা ওরা দুজনই। থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বারের প্রেজেন্স পছন্দ নয়। বন্ধুবান্ধরে ঝুটঝামেলা ফ্ল্যাটে বয়ে আনে না সুমন। কৌশলে এড়িয়ে যায়। সকালে দুধ নিয়ে আসে ঢ্যাঙা পন্টু। নীতা দরজায় এক বোতল ফাঁক করে। পন্টু দুধের বোতল গলিয়ে দেয়। সঙ্গে খবরের কাগজ। ব্যস নিমেষে পগারপার। সবিতা আসে পাক্কা সাতটায়। ডোর বেল বাজে ডিংডিডং। দরজা খুলে দেয় নীতাই। সুমন তখনও বিছানায়। কাজ সেরে আটটা নাগাদ সবিতা ওর আঁচলে হাতের জল আর মুখের ঘাম মুছতে মুছতে নামে। নীচে এক ঘর সিক্কিদের ফ্ল্যাটে গিয়ে ঢোকে। দশটার মধ্যে সুমন নাকে মুখে গুঁজে ডানা মেলে দেয়। তারপর ঘড়ির কাটা বেঁকে বসে। খরগোশ কাটা যেন কচ্ছপ হয়ে যায়। চলতেই চায় না। সারাদিনের জমে থাকা কথার বরফ তাই রাত্রে উত্তাপে গলাতে থাকে নীতা। বকম। বকম। বকম বকম।
কাল রাতেও চলছিল বকম বকম। তাল ঠুকছিল সুমন। কিন্তু আচমকা তালভঙ্গ হল। ছত্রখান হয়ে গেল নীতার তাবত আয়োজন। কথাটা তখনই বলেছে সুমন। বলতে হবেই। না বলে উপায় কী?
টয়লেট থেকে বেরিয়ে সুমন দেখল ব্রেকফাস্ট রেডি। বাটার টোস্ট, পোচ, সঙ্গে মজা মর্তমান। খোসা ছাড়ানো। খাবার টেবিলের কাছে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল নীতা। সুমন বেরতেই ক্ষীণস্বরে বলল, খাবার দিয়েছি। তুমি খাবে না? জবাব পেল না সুমন। নীতা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। পরদা এমন সরানো থাকলে খাবার টেবিলে বসে কর্নিয়ার ক্যামেরায় বেডরুমটা বিলক্ষণ ধরা পড়ে? ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে নীতা। ঝঝ বোশেখ এখন। সকাল আটটা, নটার রোদেই তেতে উঠেছে ব্রহ্মাণ্ড। বেডরুমের সিলিং ফ্যানটা বড় বেয়াড়া পজিশনে ঝুলছে। বিছানা ইস্তক হাওয়ার দৌড় নেই। তাই শখের পেডেস্টাল এল। ঠায় দাঁড়িয়ে নীরবে ঝড় তুলে দেয়। দেখনদারিও বেশ। সেটারই বোতাম চেপে শুয়েছে নীতা। হাওয়ার দাপটে দেওয়ালে দোল খাচ্ছে ল্যান্ডস্কেপ।
কাল রাতে অমনোযোগী সুমন ধরা পড়ে গেল।
নীতা বলল, তোমার শরীর খারাপ নাকি?
নাহ্। কই তেমন কিছু না।
তবে? কিছু ভাবছ তুমি? বলল কী ভাবছ?
না, ভাবছি ঝামেলা আবার আমার ঘাড়ে চেপেছে। সুমনের চোখে অসহায় কষ্টের ছাপ। নীতা উদ্বিগ্ন হল। উঠে বসল। বলল, ও বুঝেছি। কবে যাচ্ছ? কথা কেঁপে গেল নীতার। কালকে যেতে হবে। মালহোত্রা ইনটেনশনালি আমাকে..নইলে দেবেশও তো আছে। এক-আধবার নয় তাকেই…কিন্তু তুমি…কথা লাট খায় সুমনের। বোঝে মেঘলা হয়ে আসছে। সেই থেকে বকম বকম বন্ধ।
সেলস-এ থাকলে ঘরকুনো হলে চাকরি ছাড়তে হবে। অফিস ট্যুরে কি বেড়ানোর মজা আছে? নীতা বোঝে না সেটা। হয়তো বোঝে। আসলে মাঝেমধ্যেই কদিন করে বাপের বাড়িতে গিয়ে কাটানো অসহ্য লাগে নীতার। তিন বছর ঘুরতে চলল। নীতার বাবা শচীনবাবুর ঘাড় এখনও কাত। বাবাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে নিজের পছন্দের বিয়ে। যে বাড়িতে স্বামীর স্বীকৃতি নেই, সে বড়িতে গায়ে পড়ে গিয়ে থাকতে বাধে। নিজেকে খাটো মনে হয়। সুমন তা বোঝে। তাই অফিস ট্যুর শুনলেই মেঘ ঘনিয়ে আসে। বকম বকম বন্ধ।
তা ছাড়া বুঝেও অবুঝ হওয়ার নামই যেন দাম্পত্য। নীতা অবুঝ হবে। সুমন। সোহাগ ঢেলে হবে। সেটুকুই নীতার দিন তিনেকের সম্বল হবে। সুমনও ভরে দিয়ে যায় সেই সম্বলের ঝুলি। সুমনের পাগলের মতো আদরের অত্যাচারে অবাক হয় নীতা। বলে, অসভ্য। অ্যাবসলিউটলি কারেক্ট। আসলে আমি একটু বুনো হতে চাই। তবে হিংস্র নয়।
তোমার এই বুনো ভাব দেখলে কেউ বলবে আমাদের তিন বছর বিয়ে হয়েছে?
নীতা একভাবে শুয়ে আছে। ওর মাখন রঙের ফিনফিনে নাইটিতে পেডেস্টলের হাওয়া দৌরাত্ম্য করছে। হাওয়ার চাপে ছাপ পড়েছে। পদ্মের মতো স্পষ্ট ফুটে আছে নীতার গড়ন সৌষ্ঠবে ভরা নিতম্ব। একটু বুনো হতে সাধ হয় সুমনের। কিন্তু আজ তা হয় না। নীতার মর্জি এখন সায় দেবে না। তা ছাড়া সাতসকালে অত কিসের তাড়না? নিজেকে শাসায় সুমন। শব্দ তুলে চেয়ার সরিয়ে খাবার টেবিল থেকে শান্ত পায়ে উঠে যায় সে। নীতার ছড়ানো চুলে আলতো হাত রাখে। আঙুলের কাজে এলো চুল গুছিয়ে দেয়। বলে, তোমায় দেখে কে বলবে আমাদের তিন বছর বিয়ে হয়েছে?
জবাব দিল না নীতা। সুমন বলল, এবার আমি নিশ্চয়ই অপোজ করব। মালহোত্রা তেমন জোর করলে আমি রিজাইন করব, তুমি দেখে নিও। নীতা চকিতে সুমনের চোখে তাকায়। কষ্ট হয়। মানুষটাকে এত অসহায় লাগেনি কখনও। নিজেকে সামলে ক্ষীণস্বরে নীতা বলল আমি কি তাই বলেছি?
সব গোছগাছ করে বিকেল পাঁচটা নাগাদ দুজনেই বেরিয়ে পড়ল। সুমন ফ্ল্যাটের দরজায় চাবি ঘোরাল। বেরুনোর মুখে নীতা ফের মুখ বার করল। সুমন নীতার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বলল, ফিরেই ও বাড়িতে ফোন করব। তুমি ভেবো না। নীতার ভেজা চোখে একঝলক হাসি রোদ হয়ে গড়িয়ে গেল।
.
বাইপাসে ট্যাক্সির আকাল। তবু বরাতজোরে পেল একটা। উঠে পড়ে নীতা। ওদের ফ্ল্যাটের সব বাসিন্দা এসে গেলে একটু জমজমাট হত। একা থাকা যেত। হয়তো। কিন্তু এখন ভাবতেই শরীর হিম হয় নীতার। ড্রাইভার মিটার ডাউন করল। ক্লাচ অ্যাক্সেলে ড্রাইভার পা নাচাতেই ছুটে গেল ট্যাক্সিটা। নীতা জানলায় ঝুঁকে পেছনে সুমনকে দেখার চেষ্টা করল। হাত নাড়ল সুমন।
