সুমনের ছোট্ট লাগেজ। একদম হালকা। চাপা খুশির দমকে লাগেজটাকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে লুফে নিল। যাক আর কোনও বাধা নেই। ফালতু ঝঞ্ঝাট পার হয়েছে। সুমন পায়রার বুকের খাঁচায় এতক্ষণ ডানা ঝাঁপটাচ্ছিল অযুত পায়রা। দারুণ উচ্ছ্বাসে খাঁচা ছাড়া হয়ে তারা এখন কঁক বেঁধে বেরিয়ে আসছে। আরও একটা ট্যাক্সি যেন উড়েই এল। ‘হেই ট্যাক্সি’ আওয়াজ তুলে ওটাকে থামাল। নিজেকে সেঁধিয়ে দিল ট্যাক্সির পেটে। সোজা গিয়ে উঠল সতীর ফ্ল্যাটে।
সতী সবে ফিরেছে অফিস থেকে। বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে ওকে। সুমনকে বসতে বলে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল সতী। উত্তেজনা নিয়ে বসে থাকে সুমন। সতী এই ফ্ল্যাটে একা থাকে। সুন্দর সাজানো। উত্তরপ্রদেশের মেয়ে সতী। এখন বাঙালি মেয়েই বুঝবে সবাই। একটা নামী কোম্পানির কম্পিউটারের সিস্টেমে আছে। সতী ডিভোর্সি। নীতার চেয়ে অনেক বেশি সম্পদ ওর শরীরে। একটু একটু করে ভাঙিয়ে খেতে মজা। সুমন তাই করে। সতীও বোঝে সুমনটা ভীষণ লোভী।
ঘরময় ঝলমলে আলো। মাথার ওপর বিজলি পাখার সোঁ-সোঁ চক্কর। সতী ওর লোকাট গাউনটা জড়িয়ে একবার এ-ঘরে এল। সুমনের মত নিল। চা না কফি? সুমন বলল, না, না, চা নয়, কফি নয়। আগে দু পাত্র ঢালব। উফ যা গেছে কাল থেকে।
এবার কদিন বলে এসেছ?
কেন? তিন দিন! তিনদিনই তোমার টানা ছুটি। ফোনে তো তাই বললে।
সতী পাত্র সাজিয়ে হুইস্কি ঢেলে দিল। বসল সুমনের মুখোমুখি সোফায়। সুমন বলল, তুমি নিলে না? আমি এখন একটু চা করে খাব। সুমন চুমুক জমায় হুইস্কিতে। সতী উঠে কিচেনের দিকে পা বাড়ায়। মেঝেতে শ্লিপারের ঘষ্টানি। সতীর চলায় একটা অদ্ভুত ছন্দ আছে। সুমন হুলো বেড়ালের মতো সতীর পেছনটা লক্ষ করে। থাবা দিয়ে গালের কষ বেয়ে পড়া হুইস্কি মুছে নেয়।
খানিকবাদে চা হাতে ফেরে সতী। চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, এ সময় নিজে চা করে খেতে ইচ্ছে করে না।
ঠিক আছে কাল বেড-টি করে খাওয়াব।
বউকে কখনও করে খাওয়াও?
ধুর দরকার হয় না।
একটা সোজা সরল বউ পেয়ে বর্তে গেলে। সতীর একথায় সুমন যেন বা সামান্য আহত হয়। বুঝে চকিতে মুড পালটে নেয় সতী। হাত বাড়িয়ে সুমনকে কাছে টানে। বলে, রাগ করলে? তোমার বউ সোজা সরল না হলে তোমাকে এভাবে ছিনিয়ে এনে রাখতে পারতাম? সতীর কথা কিছু কানে যায় না সুমনের। আদুরে খোকার মতো নাক গুঁজে দেয় সতীর চুলের অরণ্যে। সতীর ছাড়া চুলে হেয়ার স্প্রের অদ্ভুত মায়াবী গন্ধ। আবেশে মেঝেয় কার্পেটের ওপর বসে পড়ে। সতীর কোলে মাথা এলিয়ে দেয়। সুমনের চুলে সতীর ম্যানিকিওর করা আঙুল ডুবে যায়। বিলি কাটে সতী। বলে, তুমি একটুও হ্যাপি নও। ডিভোর্স চাইছ না কেন?
আঁতকে ওঠে সুমন। ডিভোর্স কেন? নীতা ওকে ভালবাসে। বিশ্বাস করে। কেতাবি ভাষা অনেক সময় ভাঙিয়ে বুঝতে হয়। কিন্তু নীতার মুখরিত দু চোখ যে ভাষা উগরে দেয়, সে ভাষা ভাদ্রের দিঘির জলের মতো স্বচ্ছ। সুমনের মতো স্মার্ট, বুদ্ধিদীপ্ত পুরুষেরা সে ভাষার বিশারদ। নীতার চোখে তাকিয়ে সুমন শুনতে পায় ওর বাত্ময় দু চোখের মৌন উচ্চারণ। সতীর শরীরটা সুমনকে পতঙ্গের মতো টানে। শাসন মানে না।
হুইস্কির গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে প্রসঙ্গ পালটায় সুমন। এই তিন দিন সূর্যের মুখ দেখব না সতী। তোমার কোলে শুয়ে থাকব কচি খোকার মতো। দুগ্ধপোষ্যের মতো। আর আমি ফিডিং বোতলে মদ ভরে খাওয়াব তোমাকে। তাই তো?
এগজাক্টলি সো। স্টক রেখেছ তো?
রেখেছি। বলেই সতী ভাবে এই তো সুযোগ। এই সুযোগেই ব্যাপারটা গুছিয়ে নিতে হবে। নীতা কেমন গুছিয়ে সংসার করছে, তা একবার অন্তত দেখতে চায় সতী। ভীষণ কৌতূহল। সুমনকে তা জানতে দেওয়া যায়? অথচ নীতার সংসারটা একবার দেখলেই নয়। তা ছাড়া একটা মেয়ের পরম সম্পদই যখন তার হাতের মুঠায়, তখন সেই মেয়ের সংসারে তিনদিন অন্তত রাজত্ব করার অধিকার তারও আছে। তাই বলল, সুমন তোমার সঙ্গে একটা পরামর্শ আছে।
পরামর্শ! আমার সঙ্গে? বলল না।
বলছি, অফিসের দাস বুড়ো ভামটা পেছনে পড়েছে। তিন দিন ছুটি। গন্ধ শুকতে শুকতে ফ্ল্যাটেও এসে পড়তে পারে। তারপর তোমাকে আমার ফ্ল্যাটে দেখলে বিশ্রী স্প্রেড করবে।
তা হলে?
চলো না আউটিং-এ যাই।
ধুর পোষাবে না।
তা হলেতোমার ফ্ল্যাটেই চলো। বউ তো নেই। আমিই না হয় কদিন তোমার বউ-এর রোল-প্লে করে আসি। কী বলো?’ আসল উদ্দেশ্যটাকে এত হালকা চালে উগরে দিতে পারবে নিজেও ভাবেনি সতী। পাছে ধরা পড়ে যায় তাই পালটা তৎপরতা নেয়। বলে, অবশ্য তোমার অসুবিধে হবে। প্রতিবেশীরা আছে না! থাক।
ধুর প্রতিবেশী। গোলি মারো। কেউ কাউকে চিনি না। তা ছাড়া বেশিরভাগ ফ্ল্যাটেই বাসিন্দা আসেনি। আমার উলটোদিকে তত তালায় জং পড়ে গেছে। তাই ও নিয়ে ভাবি না। কথা শেষ করে খানিক গুম মেরে থাকে সুমন। সতী খুবই সতর্ক নজর রাখে সুমনের দিকে। বলটা সুমনের কোর্টে খুবই সন্তর্পণে ঠেলে দিয়েছে সে। সুমনকে আর ঘাঁটায় না। সুমন ভাবতে থাকে। ভাবে, সতীর মতো একটা নষ্টা মেয়েকে সে তার বেডরুমে নিয়ে তুলবে? মনটা খচখচ করে। তাই বলে, দাস এসে পড়তে পারে। এটা তোমার আশঙ্কা। নাও তো আসতে পারে।
শোনো সুমন, এসব পুরুষদের চিনতে ভুল হয় না আমার। কোনও না কোনও ছুতোয় দাস আসবেই। এবার আমাদের অন্তত এই ফ্ল্যাটে থাকা চলবে না। চলো আউটিং-এ যাই। দীঘা যাবে? সুমন চিবুক শক্ত করে। বলে, ঠিক আছে, চলো আমার ফ্ল্যাটেই যাই।
