এসব ভাবছি, ঠিক তখুনি বাপ্পা চেঁচিয়ে ওঠে, পাপা, পাপা সাপ।
শুনে সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথা ঘুরে যায়। কিছু মনে থাকে না। পাগলের মতো ছুটে যাই বাপ্পার কাছে। কোথায়, কোথায় সাপ?
বলটা দু’হাতে বুকে জড়িয়ে বাপ্পা দাঁড়িয়েছিল বাগানের শেষপ্রান্তে। হাসনুহেনা ঝোঁপের কাছে। হানুহেনা ঝোঁপটা বিশাল হয়ে উঠেছে কোন ফাঁকে আমি কখনও খেয়াল করিনি। বিকেলবেলাই আবছা অন্ধকার জমে গেছে ঝোঁপের তলায়। ঝিঝি ডাকছে। আমি ওসব খেয়াল না করে বাপ্পাকে জড়িয়ে ধরি। কোথায় সাপ?
বাপ্পা আঙুল তুলে ঝোঁপের তলাটা দেখায়। সেখানে পড়েছিল, একটা সাপের খোলস। একটা সাপ আছে বাগানে। খোলস পাল্টেছে। দেখে আমি চমকে উঠি। বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। আমার সাজানো বাগানে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে আততায়ী সাপ! বাপ্পা যখন তখন বাগানে আসে। বাপ্পাকে যদি দংশায়।
আমি আর ভাবতে পারি না। দুহাতে পাগলের মতো বাপ্পাকে বুকে জড়িয়ে ধরি। তারপর বাগান ভেঙে ছুটতে থাকি। বাপ্পাকে নিয়ে বহুদূরে চলে যাব আমি, সম্পূর্ণ নিরাপদ কোনও জায়গায়। যেখানে অশুভ কোনও ছায়া বাপ্পাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
বকম বকম – প্রদীপ আচার্য
খোপের ভেতর পায়রা দুটো এক হলেই বকম বকম। ওড়ার প্রবল নেশা। আকাশ কোথায়? উড়বে যে? ফ্ল্যাট বাড়ি। বলতে গাল ভরা। আসলে তো পায়রার খোপ। খোপের ভেতর শুধু দুটো পায়রা। সুমন আর নীতা। পায়রা হতেই সুমন গোবরডাঙার বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে এসেছে। সাধ করে বাইপাসের ধারে এই নিরিবিলি ফ্ল্যাটটা নিয়েছে।
বাপের ভিটেতে ভিড়েভাট্টায় দাম্পত্য জমে না। চঞ্চতে চঞ্চতে ঠোকাঠুকি আর বকম বকম জমে না। ভাল খাওয়াদাওয়া জমে না। গনাগুষ্টির মুখে না তুলে রসনাতৃপ্তি সম্ভব নয়। বাধাবন্ধনহীন, স্বাধীন আয়েসি ঘুম জমে না। রোববারে বেলা দশটায় সূর্যির মুখ দেখার সুখ নেই। এক কথায় সুখের মুখ দেখা বনধ। সুমন বলে, ছোট পরিবার ব্যাকডেটেড। অণুও নয়। চাই ক্লিয়ার আই মিন পরমাণু পরিবার। তা সেই পরমাণু পরিবারে পায়রা হয়ে আছে সুমন আর নীতা। আর শুধু বকম বকম, বকম বকম।
কাল রাত থেকে বকম বকম বন্ধ। শোওয়ার পরে কাল রাতেই কথাটা বলেছে সুমন। সুমনের কথাটা যেন বন্দুকের টোটার মত উড়ন্ত পায়রার ডানা বিদ্ধ করল। কেতরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল অসহায়, আহত পারাবত। সুমনের রূপসী বউ নীতা। প্রায় প্রতি মাসেই এই এক হ্যাপা। কথাটা পাড়তেই হয়। অথচ পরম্পরায় এই একই চিত্রনাট্য। রকমফের নেই কোনও।
এখন গড়িমসির সকাল। অফিসের তাড়া নেই আজ। মুখে মেঘ নিয়েই চা করে দিয়েছে নীতা। সুমন খবরের কাগজের আড়াল সরিয়ে সন্তর্পণে তাকিয়েছে। কিছু বলার ঝুঁকি নেয়নি। অন্য দিন হলে কাগজ হাতে চায়ের কাপে চুমুক জমালে তপ্ত কড়ায় ফুটতে থাকে কথার উড়কি ধান। কোন জল কোনদিকে গড়াচ্ছে, কোন ধামার নীচে কোন তদন্ত কমিশন, লাল ফিতের ফাঁসে কোন রিপোর্ট, কোন প্রকল্প বিশ বাঁও জলে, কাদের স্বার্থে এবারের বাজেট—সব মিলিয়ে হাতে মিনিট পনেরো সময়। কাগজ যত না পড়া, তার চেয়ে বেশি বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ। নীতা বলে, রক্ষে করো বাবা। ওসব অত বুঝি না। বুঝতে চাই না।
সুমন হাসে। মনে মনে বলে, সেই ভাল। রূপচর্চা আর রান্নার রেসিপি। মেয়েরা এর বেশি বুঝতে শুরু করলে সুমনের মতো পুরুষ সিংহেরা ভেড়া হয়ে যাবে। সুমন জানে বাইরের টান বড় সর্বনেশে। স্বাধীনতার স্বাদ চেখে দেখার সুযোগ দিলে নীতার মতো রূপসীদের ওপর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলকে উঠতে পারে। বেশি এনলাইটেন্ড না হওয়াই ভাল। তাতে ভালমন্দর বিচারবুদ্ধি প্রখর হয়। জাগ্রত হয় স্বতন্ত্র রুচিবোধ। উরিব্বাস! পুরুষের এমন ঘোর সর্বনাশ আর হয় না! বই আর বউ ভাই সামাল সামাল। বুক শেলফ-এ বন্দি থাকুক বই। আর বউ বন্দি থাকুক হেঁসেলে। বউয়ের দৌড় হোক বড়জোর হেঁসেল টু বেডরুম। এসব ভেবে মনে মনে ফন্দিবাজের মতো হাসে সুমন।
.
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দেয়। ফস করে একটা সিগারেট জ্বালায়। তোয়ালে কাঁধে ফেলে টয়লেটের দিকে পা বাড়ায় সুমন। বেডরুমের দিকে একঝোঁক নজর চালে। নীতা নিঃসাড়ে শুয়ে আছে। যেন অপার অনুকম্পা হল। অসহায়তা যেন সকরুণ ছাপ ফেলল নিরুপায় সুমনের চোখেমুখে। ঠোঁটে সিগারেট চেপে টয়লেটে ঢুকে পড়ে সে।
আজ অফিসের তাড়া নেই। অন্য দিন সুমন পায়রা দশটার অফিস ধরতে উড়াল দিলে নীতা সারাদিন ঠায় একা। ফাঁকা ফ্ল্যাটের চার দেওয়াল তখন রে-রে করে তেড়ে আসে। কেবল নেটওয়ার্কের দৌলতে সারাক্ষণ টিভি চলে। মন দিয়ে দেখে না কিছুই। বু চলে। হাবিজাবি একশো চ্যানেল। আসলে নৈঃশব্দের আর এক নাম অন্ধকার। ফাঁকা ফ্ল্যাটে সেই অন্ধকার একেবারে ঘুটঘুটি। হাঁপিয়ে ওঠে ফাইভ হান্ড্রেড পার্সেন্ট হাউস ওয়াইফ নীতা।
চিলচিৎকারে পাছে বকম বকম চাপা পড়ে যায়, তাই তিন বছর ঘুরলেও সন্তান চায় না সুমন। নীতাও জোর করে না। নীতার তেল চকচকে পালকের জৌলুস পাছে। কমে যায়। পাছে রং ফিকে হয়। সেই ভয়। তা ছাড়া নীতা জেনে গেছে পুরুষের মধ্যে সন্তানের নেশা জাগাতে নেই। সন্তান মানে তো ছেলে চাই। ওই ছেলে চাইতে গিয়ে মিতুদির তিন মেয়ে। এখনও তাড়না করে অলকদা। বলে, নাকি বংশরক্ষা হবে না। কী হরিদাসের বংশ রে তোর? মেয়েরাই ছেলে তৈরির কল? বকম বকম করতে করতেই নীতা ঠারেঠোরে সুমনকে এ শুনিয়েও রেখেছে। তাই ওদের স্বপ্নের মতো সাজানো বেডরুমে স্বর্গীয় পারিপাট্য। রাবার ক্লথ বিছানার কৌলীন্য কাড়তে পারেনি।
