ঘরে ঢুকেই অবাক হয়ে গিয়েছিল কাজরী। গলার স্বরে যাকে কল্পনা করেছে, চাক্ষুষ যেন অবিকল তাকেই দেখতে পেল। দেহের ঋজুতায় পৌরুষের অভিব্যক্তি, আত্মভোলা সুন্দর মুখ, আকাশের মায়া-জড়ানো টানা টানা চোখ দুটি যেন সুদুর স্বপ্নে সমাহিত।
কাজরী ঘরে ঢুকতেই দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হল। এক মুহূর্তে ওরা পরস্পরকে চিনে নিয়েছিল। কাজরীর স্মৃতিতে সেই প্রথম দৃষ্টির রোমাঞ্চ আজও শিউরে ওঠে। অনেক অন্বেষণের শেষে স্বপ্নসম্ভবাকে আবিষ্কারের বিস্ময় বুঝি ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল কুণালের চোখ দুটিতে।
কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর কুণাল আবার পূর্বকথার জের টেনে বলতে শুরু করে কাজরী লক্ষ্য করল যে তার কথার খেই সে হারিয়ে ফেলেনি।
দীপার পাশে বসে কাজরী তার কানে কানে জিজ্ঞাসা করেছিল, হ্যাঁ রে দীপু, ভদ্রলোকটি কে?
দীপা বলল, কে এক কুণাল সেন। পূর্বাচলের সভ্য হতে চান শুনলুম।
সভার শেষে কাজরীর কাছে এসে কুণাল বলল, নমস্কার কাজরী দেবী। আপনি বোধ হয় আমাকে চিনতে পারেননি?
বিব্রত মুখে কাজরী বলল, না তো।
কুণাল হেসে বলল, আট বছর আগেকার ইন্টারকলেজ ডিবেটে ধারালো তলোয়ারে মত ঝলসে উঠেছিলেন আপনি। বক্তব্য আপনার বেশী ছিল না, কিন্তু মনে স্থায়ী দাগ রাখার মত। সেদিনকার বিতর্কে আমারও সামান্য অংশ ছিল। কিন্তু আপনার সামনে আর সকলের মত আমিও নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছিলুম।
মাথা নীচু করে কাজরী বলল, বড্ড খারাপ আমার স্মরণশক্তি! কিচ্ছু মনে থাকে লো।
কুণাল বলল, আমার স্মরণশক্তিও খুব সুবিধের নয়। কিন্তু—
পরক্ষণে গলার স্বর নামিয়ে সে বলে ফেলল, আপনাকে ভুলতে পারিনি।
নিমেষে আবীর রাঙা হয়ে ওঠে কাজরীর মুখখানা। মাথা নীচু করে ডান হারে অনামিকায় শাড়ির আঁচলের প্রান্ত জড়াতে থাকে সে।
গলার স্বর খাদে রেখে কুণাল বলতে থাকে, সেদিনকার বেস্ট ডিবেটার হিসেবে আপনিই মনোনীত হয়েছিলেন। কবে কথা বলতে শিখেছি স্মরণ নেই, সেদিন আপনার কথা শুনে কিন্তু আবিষ্কার করলুম যে আমরা শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
কাজরী লজ্জা-জড়ানো মৃদু কণ্ঠে বলল, আপনার কথা শুনে কিন্তু তা মনে হচ্ছে না।
কুণাল হেসে বলে, এ আপনারই দান। সেদিনকার ডিবেটে আমার ব্যর্থতা আপনার সাফল্যের মধ্যে আশ্রয় খুঁজেছিল।
মনে মনে অস্বস্তি বোধ করছিল কাজরী। কথার মোড় ঘোরাবার জন্য সে বলল, সেদিন ডিবেটে কোন কলেজকে রেপ্রেজেন্ট করেছিলেন আপনি?
কুণাল বলল, সেন্ট জেভিয়ার্স। ওই কলেজের ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র ছিলুম তখন। ইংরেজীতে অনার্স ছিল।
ও মা! আমারও তখন ফোর্থ ইয়ার। বেথুনে ইংরেজী অনার্স নিয়েই পড়তুম। কিন্তু য়ুনিভার্সিটিতে গিয়ে তো আপনাকে দেখি নি।
দেখবেন কী করে? বি. এ. পাস করে দিল্লী য়ুনিভার্সিটিতে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলুম।
প্রথম আলাপেই কাজরীর মনের অনাহত তারে ঝঙ্কার উঠেছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই তার মনের আগল আলগা করে দিয়ে অনায়াসে কুণাল তার পথ করে নিল।
তারপর কাজরী একদিন বলল, এ যে অকালবসন্ত কুণাল! বয়স তো আমার। কম হয়নি!
তুমি আমার চিরনবীনা-কাজরীর কানের কাছে মুখ এনে কুণাল বলল : তোমার বসন্তের সময়-অসময় নেই। চির বসন্তের রাণী তুমি।
ইডেন-গার্ডেনের নিভৃত ছায়ানিবিড় সন্ধ্যাগুলির পরিমিত অবকাশটুকু মন্থন করে অমৃত পান করে ওদের দুটি হৃদয়।
কাজরী বলল, দিনে মোটে দুটি ঘণ্টা আমাকে সঙ্গ দাও–আমার বাকি দিনের সমস্তটুকু জুড়ে থাকবার জন্য বুঝি! কাজে মন দিতে পারি নে, থসিস লেখা আর হয় না। এর চেয়ে আরও একটু সময় দাও না। আরও একটু অবসর দাও তোমাকে ভালবাসবার।
নিবিড়তম আলিঙ্গনের মধ্যে কাজরীকে বন্দী করে কুণাল বলল, আমার সমস্ত দিন রাত্রি জুড়ে থাকবে তুমি—এই তো আমি চাই। বল, কবে আমার ঘরে আসবে?
যেদিন তুমি চাও।–কুণালের বুকে মুখ গুঁজে কাজরী বলল।
বিয়ের কয়েক দিন আগে কুণাল বলেছিল, কাজরী, তোমার সাংসারিক বুদ্ধি একেবারেই পাকেনি। আমার সম্বন্ধে রীতিমত খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত ছিল তোমার।
কাজরী নিস্পলক দৃষ্টিতে কুণালের মুখের পানে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল, তোমাকে তো জানি কী আর খোঁজ নেব?
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে কুণাল বলল, তুমি জান, আমার আপনার বলতে কেউ নেই। তোমাকে পেয়ে আমার জীবনের শূন্যতা ভরে গেছে। তোমাকে নিয়ে আজ আমার জীবনের সত্যিকারের শুরু, তার আগেকার সৃষ্টিছাড়া দিনগুলোর কথা ভুলে যেতে চাই। আগে যেন জীবন্থত হয়ে ছিলুম—তোমাকে পেয়ে বেঁচে উঠেছি।
কুণালের গলা জড়িয়ে ধরে কাজরী বলল, থাক থাক, ও সব কথা নয়। আজকের এমনি সুন্দর সন্ধ্যাটিতে অন্য কথা বল।
কথায় তো কুলোবে না। তোমার ডিবেট শুনে মুগ্ধ হয়েছিলুম বটে, কিন্তু কথায় কি মন ভরে?বলে কুণাল কাজরীর তৃষিত ওষ্ঠাধরে গভীর চুম্বন এঁকে দিল।
কাজরীর বাবা-মা বিয়েতে রীতিমত আপত্তি জানিয়েছিলেন। জানা নেই, শোনা নেই—কোথাকার কে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, ভাল করে খোঁজ-খবর না নিয়ে বিয়েতে মত দিতে তারা সম্মত হননি।
কাজরী বলল, খোঁজ নেবার কোন দরকার নেই। ওর ওপর পুলিসের গোয়েন্দাগিরি তোমরা করতে পারবে না।
বিয়ের পর কুণালের ছোট্ট ফ্ল্যাটে কাজরীর নিরাড়ম্বর ঘরকন্না শুরু হল। পরিমিত উপকরণ, কিন্তু পরিমেয় ঐশ্বর্যের স্বাদ পেল কাজরী। দুটি স্বল্পায়ন ঘরে ঘরণী হলেও সে যেন ইন্দ্রলোকের ইন্দ্রাণী। একটি মানুষকে কেন্দ্র করে যেন একটা অনন্ত আনন্দলোক গড়ে ওঠে। হৃদয়মন্থন করা অমৃতসেচনে যে মূর্তিটি গড়ে ওঠে সে যেন কুণালকেও অতিক্রম করে যায়, সে যেন তার প্রেমের সাধনার সৃষ্টি।
