তা বটে। শামীমার এ রকম মনে হলো, তা বটে, ইয়ার্কিটা রসালো হলেই জমে ভাল আর বিদায়ের সময় মন খারাপের কথা বলে মন খারাপ করাটাও যুক্তিসঙ্গত নয়। বেশ, মেনে তো নিচ্ছেই সে, কিন্তু মেনে নিয়ে সে এখন কি করবে? চা খাবে আর টেলিভিশনের চ্যানেল বদলাবে? তারপর, তারপর, তারপর?
শামীমা ভেবে দেখল তার কিছুই করার নেই। এ অবশ্য ভেবে দ্যাখার কিছু নয়। এ তো জানা কথা। তবু, রকিব ঢাকার বাইরে রওনা দিলে প্রতিবার সে এরকম ভেবে দ্যাখার ভান করে। পায় না কিছু, এবারও পেল না। অথচ সামনে পাঁচ-পাঁচটা রাত, পাঁচ-পাঁচটা দিন। রাতগুলো পার করতে হবে তার, দিনগুলোও। কি করে এতাট সময় পার করবে সে, ঠেলে ঠেলে? দু’হাতে ঠেলবে প্রাণপণ? আর মুখে বলবে—যা, যা, সর সর’?
শামীমা রান্নাঘরে গেল। চা বানাল। চায়ের কাপ হাতে বেডরুমে ফিরে সে টেলিভিশন ছাড়ল। মন খারাপ তার, হ্যাঁ মনই খারাপ তার। রকিব যতদিন থাকে না, ততদিন মন তার ভীষণ খারাপ হয়ে থাকে। রকিব না ফেরা পর্যন্ত তার মন ভাল হবে না। এটাও সে মেনে নিয়েছেনা হয় মন খারাপই থাকল তার, তবে তার শুধু একটাই কথা—এই দিন আর রাতগুলো পার করে দেয়ার কোন ব্যবস্থা যদি থাকত। কিন্তু এ রকম হবে না কখনও, কোন ব্যবস্থাই সে পাবে না। এটাও জানা আছে তার। সুতরাং একঘেয়ে এক নীরস সময় পার করতে করতে তাকে অপেক্ষা করতে হবে রকিবের ফেরার।
মন খারাপ থাকবে তার, পাশাপাশি—সে অস্বীকার করে না—শরীর, হ্যাঁ, এটাও একটা ব্যাপার বইকী। সে জানে রকিব ফিরে এসে জিজ্ঞেস করবে—এবার তোমার স্বপ্নে কে এল?
পাঁচ রাত থাকবে না রকিব, এর মধ্যে ও রকম এটা স্বপ্ন সে দেখবেই। এটা কেউ বলতে পারে না। নাও সে দেখতে পারে ওরকম কোন স্বপ্ন। একবার আরও অনেকদিন বাইরে ছিল রকিব, তখন কোন স্বপ্নই তাকে বিব্রত করেনি। হ্যাঁ, বিব্রতই বলবে সে। রেকম কোন স্বপ্ন সে সত্যিই দেখতে চায় না। নোংরা লাগে তার, সে অস্বস্তি বোধ করে এবং এ কথা শুনলে রকিব হয়ত হাসবে, কিন্তু এ কথা ঠিক এর রকম স্বপ্ন দ্যাখার পর তার ক্ষীণভাবে হলেও মনে হয় রকিবকে সে ফাঁকি দিয়েছে। তবে ওটা এড়ানোর উপায় তার জানা নেই। বরং এভাবে ব্যাপারটা মেনে নেয়া উচিত—ওটা নিছকই একটা শারীরিক প্রক্রিয়া, ওটা হবেই।
টেলিভিশনের চ্যানেল বদলাতে বদলাতে শামীমা একটু হাসল—এবারও কি হবে? খুব হেলাফেলায় কাঁধ ঝাঁকাল সে, সে চায় না থোক, তবে হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। যদি হয়, কার সঙ্গে হবে? মাঝে মাঝে শামীমার খুবই অবাক লাগে। কী যে একটা ব্যাপার—সে কত কেউই না চলে আসে ওরকম স্বপ্নে। অবাক হতে হয়—আরে এ কেন! এ কোত্থেকে ঢুকে পড়ল! কিন্তু ঢুকে পড়ে, ওই যে, যে সজলের কথ সে আর ভাবে না, সে সজল কী সহজেই চলে এল।
এবারও কি সজল আসবে? সজলের ব্যাপারটা, তার খুব লজ্জা লাগছে ভাবতে, তার ভিতর সেদিন এক অন্য রকম অনুভূতি তৈরি করেছিল। তবে না, সে চায় না সজল আসুক। ওরকম একটা স্বপ্ন আসবে কি না, তা-ই অবশ্য জানা নেই। তবে যদি আসেই ওরকম কোন স্বপ্ন, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, শামীমার মনে হলো,—তাহলে এমন কেউ আসুক স্বপ্নে, যাকে সে চেনে না। হ্যাঁ, যাকে সে চেনে না, এমন কেউ—যাকে সে কখনও কোথাও দ্যাখেনি। ঘুম ভাঙার পর তাহলে সে খুব অবাক হয়ে যাবে। প্রচণ্ড এক অস্থিরতা তাহলে তাকে গ্রাস করে নেবে—কে, কে, কে! কিন্তু তাকে সে শনাক্তই করতে পারবে না।
আর এইভাবে, আশ্চর্য, কে এসেছিল, কে ছিল ওটা—এরকম ভাবতে ভাবতে অস্থির সে রকিবের না থাকা সময়টুকু পার করে দিতে পারবে না?
আঁধার ঘর – সঙ্কর্ষণ রায়
নীল-পর্দা-ঢাকা-জানলাগুলি-ভেদকরে-আসা পরিভুত ছায়াস্নিগ্ধ মৃদু আলোয় শোবার ঘরের ভেতরটা যেন স্বপ্নিল। খাটের পাশের জানলাটির গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছে কুণাল। ছিপছিপে সুঠাম দেহের ঋজুতায় পৌরুষ আছে—আশ্চর্য রকম আত্মনির্ভর দাঁড়াবার ভঙ্গি।
তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে দুহাত দিয়ে তার ডান হাতটি সযত্নে তুলে ধরে কাজরী বলল, ঘুম ভাঙল বুঝি?
কুণালের চোখ দুটি কাজরীর মুখের ওপর এসে পড়ে। কাজরীকে দেখছে, অথচ দেখছে না, অর্থহীন শূন্য দৃষ্টি।
চিনতে পারছে না সে কাজরীকে।
কুণালকে খাটে এনে বসাল কাজরী। তার পর দুহাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে সে ডাকল, কুণাল! আমার কুণাল!
কুণাল শিউরে ওঠে। কাজরীর আলিঙ্গনে ওর যেন দম আটকে আসতে চায়।
কাজরী আকুল স্বরে বলে চলে, চেয়ে দেখ কুণাল, ভাল করে চেয়ে দেখ, এই আমি—তোমার কাজরী।
কুণাল শুনেও যেন শোনে না। কাজরীর আর্ত আকুল আহ্বানে সাড়া দেয় —গত পাঁচ বছর ধরে দেয় নি।
কুণালের নির্বাক মুখের দিকে চেয়ে পাঁচ বছর আগেকার তার অজস্র কথায় মুখর দিনগুলো যেন স্বপ্নের মত মনে হয়। সুদীর্ঘ নীরবতার ব্যবধান অতিক্রম করে কুণালের কথা বলা মুহূর্তগুলোকে যেন খুঁজে পাওয়া যায় না। কুণালের কথা ভাবতে গিয়ে মনে হয় বুঝি আর কারুর কথা ভাবছে সে।
.
মনে পড়ে পূর্বাচল-সঙেঘর পাঠচক্রের সেই সন্ধ্যা। বৈঠকে পৌঁছতে সেদিন দেরি হয়ে গিয়েছিল কাজরীর। সভাকক্ষের দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে—এমন সময় কানে এল, অপরিচিত কণ্ঠে কে যেন সেদিনকার আলোচ্য বিষয় জীবনে নেতিমূলক চিন্তা অস্তিত্বমূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে কতখানি সাহায্য করে, সে সম্বন্ধে বলছে। স্পষ্ট সরল বলবার ভঙ্গী। বক্তব্য যাই হোক, বলবার ভঙ্গিমা শ্রুতিকে আকর্ষণ করে। কথার স্রোতে পৌরুষ যেন স্বতঃস্ফূর্ত। দেখবার মত মানুষের অভাব হয়নি কাজরীর জীবনে, কিন্তু শোনবার মত কথা বলতে পেরেছে কজন? পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে উৎকর্ণ হয়ে শুনল সে।
