তবে ধরো আমার পক্ষে গান বাজনার ব্যাপার–।
আবার? চোপ! বুলার হাত আরো চেপে বসে, ঐ সব লোক গুণীলোক, ওদের খুব শ্রদ্ধা করি, কিন্তু ওদের ভালোবাসা মুশকিল। বুঝলে না, রাত দিন বিছানার ওপর বসে খালি রেওয়াজ করে, বাইরে যায় না—এসব পুরুষ মানুষের সঙ্গে ঘর করা যায়?
জাহাঙ্গীরের কোনো সাড়া না পেয়ে বুলা ফের বলে, একই লাইনের হাজব্যান্ড ওয়াইফের কথা বলছো? তুমি তাহলে গুলশানের মেয়েটাকে বিয়ে করলে না কেন? এইবার বলো তো?
জাহাঙ্গীর কি বলবে? গুলশানের মেয়েটিকে বিয়ে করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তবে ওরকম কোনো মেয়ের সঙ্গে সত্যি সত্যি আলাপ থাকলে মাঝে মাঝে যাওয়া যেতো। বুলাকে বলে, বোল তো, এসিব গুণীলোক কি তোমার মতো এরকম বেপরোয়া মোটর সাইকেল চালাতে পারে?
বুলার আঙুলে জাহাঙ্গীর চুমু খায়। এমন কি তার তর্জনী নিয়ে একটু একটু চুষতেও শুরু করে। বুলা ফের বলে, বলো ওরা পারে?
জাহাঙ্গীর এবার আত্মসমর্পণ করে, আমাদের হিপ-হিপরেও আমার ভেসপা চালাবার ভঙ্গি দেখেও ধরে ফেললো।
ও হ্যাঁ, গল্পটা শেষ করলে না? ভাইয়ারা এসে সব মার্ডার করলো।
মহা উৎসাহে হিপ-হিপের গল্প শুরু করলেও এবার তেমন জমে না। সেই যে সাউন্ড মারা ছেলেদের হাত থেকে উদ্ধার করে জাহাঙ্গীর তাকে রিকশায় উঠিয়ে দিলো এরপর থেকে
তা মেয়েটার সঙ্গে তোমার যোগাযোগ কেটে গেলো কি করে? গল্পটা তো আগেও শোনা হয়েছে। সেই স্মৃতি থেকে বুলা এই প্রশ্ন করে।
কিন্তু জাহাঙ্গীর এবার অন্যরকম কথা বলে, যোগাযোগ বন্ধ হইবো ক্যান? না মানে ধরো, একই ক্লাসে পড়ি, রোজ দ্যাখা হয়। আবার কোনো অসুবিধা হইলে আমারেই ধরতো। বলতে বলতে জাহাঙ্গীর একটু লাজুক মতো হাসে, ছেলেরা একটু ঠাট্টাও করতো। একবার পিকনিক করতে গেলাম চন্দ্রা, আমরা কয়জন হাঁটতে হাঁটতে একটু নির্জন ঝোঁপের দিকে গেছি তো হঠাৎ দেখি, বুঝলা আমাগো দুইজনের একলা ফালায়া বিচ্ছুগুলি কৈ ভাগছে। আমরা হাসি। ইসে কয়, আরে বসোনা।
তোমার নিশ্চয়ই ভালো লাগলো? বুলা প্রায় উঠে বসে।
তা অস্বীকার করতে পারবো না, একটু ভালো তো লাগতোই।
সতি? ডুবে ডুবে জল খেয়েছে, না? বুলা আরো শোনবার জন্য উদগ্রীব। এই গল্পের আগেকার ভার্সনে কিন্তু জাহাঙ্গীরের সঙ্গে হিপ-হিপের এতোটা মাখামাখি বা পিকনিক—এইসব ব্যাপার ছিলো না।
আমাকে বলে, আমাদের বাসায় তো আসলেন না। আমার মা আর বড়োআপা আপনাকে দেখতে চায়।
মানে মেয়েটি তাহলে বাড়িতে ওসব বলেছে? বুলার এই উদ্বিগ্ন জবাবে জাহাঙ্গীর বলে, মনে হয়।
তুমি ওদের বাসায় গেছো?
আমি? জাহাঙ্গীর একটু ভেবে বলে, বাসায় টাসায় যাইতে ভালো লাগে না। মেয়েদের বাসায় বাসায় ঘোরা, কার্পেটের উপরে বইসা হারমোনিয়াম একখান লইয়া প্যাঁ প্যাঁ করা আমার পোষায় না।
বুলা কিছু বলে না। জাহাঙ্গীরের কথায় এ ধরনের ঝাঁঝ আগে কখনো দ্যাখেনি। জাহাঙ্গীর বলতেই থাকে, মেয়ে ক্লাসমেটের বাড়ি গিয়ে ডাক দিমু, ও মিনু, ও ডলি, একটা গান ধরো তো? তারপর শিঙাড়া, চানাচুর, চা খাইয়া ঘরে ফেরা—এইগুলি পুরুষ মানুষের কাম না, বুঝলা? এইগুলি করে হিজড়ারা, বুঝলা? হঠাৎ বেড-সুইচে খুট করে শব্দ হয়, ঝলমলে আলোয় জাহাঙ্গীর কুঁকে বুলার মুখ দ্যাখে। ফর্সা মুখ কাগজের মতো ফ্যাকাস কি হলো?
তোমার মুখটা দেখতে ইচ্ছা করলো। বুলার জন্যে তার মায়া হয়, হাজার হলেও মেয়েমানুষ, এভাবে কথা না বললেই পারতো। কিন্তু তাকে চুমুও খায়না। মেরামত করার চেষ্টা করে এইভাবে, তোমার গালের রঙ এতো সুন্দর।
চোখ বন্ধ করে বুলা হাসে, তারপর?
জাহাঙ্গীর একটানা কথা বলে। মেয়েটির সঙ্গে সে দু’একবার চাইনিজও খেয়েছে। কিন্তু মেয়েদের মন বুঝে চলা তার স্বভাবে নেই। সে ছিলো কলেজের এ্যাথলেটিক সেক্রেটারি, কতো ছেলে কতো মেয়ের সঙ্গে তার মেলামেশা করতে হয়। একটি মেয়েকে নিয়ে হিপ-হিপ তাকে সন্দেহ করতে শুরু করে। অথচ দ্যাখো মেয়েটোর সঙ্গে এমন কিছু মাখামাখি হয়নি। তার বড়ো ভাই ছিলো জাহাঙ্গীরের বন্ধু, একদিন এসে বলে, দ্যাখ তো আমার বোনটা ভর্তি হতে পাচ্ছে না, দেরি করে ফেলেছে, দে না তোদের কলেজে ম্যানেজ করে। তা সে হলো কলেজের এ্যাথলেটিক সেক্রেটারি, প্রিন্সিপ্যালকে গিয়ে বলে সার, খেলাধুলা করে, এই মেয়েটাকে চাই। নাজমা তো অবাক। জাহাঙ্গীরকে ডেকে ‘আমি খেলাধুলা করি আপনাকে কে বললো?’ জাহাঙ্গীর বলে, নাজমা
সেদিন না বললে পারভীন? বুলা হঠাৎ বাধা দিলে জাহাঙ্গীর দমে যায়।
পারভীন? ও এর কথা বলছি?
বলোনি? বলোছো। আগে তোমার হিপ-হিপের কথা বলো। আমার ঘুম পাচ্ছে।
এইসব গল্প শুনতে তার ঘুম পায়? জাহাঙ্গীর একটু থেমে ফের শুরু করে। তারপর অনেকদিন কোনো যোগাযোগ ছিলো না। মাস তিনেক আগে জাহাঙ্গীর খুব স্পীডে ভেসপা চালিয়ে রামপুরা যাচ্ছে, মালীবাগে পুলিশ বক্সের ভেতর থেকে একদল মহিলা-পুলিশ ট্রাকে ওঠার জন্যে বেরিয়ে আসছে। এদের একজন হঠাৎ তার দিকে বাঁশি বাজিয়ে হাত তোলে। ভেসপার ব্রেক কষতেই সামনে এসে বলে, এতো ওভারটেক করতে চান কেন? দেখি লাইসেন্স। দেখি। মহিলা-পুলিশের ধৃষ্টতা দেখে জাহাঙ্গীরের মাথায় রক্ত চড়ে গেলো। কি সাহস। চোখমুখ লাল করে জাহাঙ্গীর তার দিকে তাকালে পুলিশ ফিক করে হেসে ফেলে। আরে এ তো শালার সেই হিপ-হপ হ্বরে।—কি জাহাঙ্গীর, কোথায় যাবে?— বুলা একটু সংশোধন করার জন্যে উসখুশ করে। কারণ এর আগে গল্পটা বলার সময় সংলাপে মেয়েটি জাহাঙ্গীরকে জাহাঙ্গীর ভাই বলে সম্বোধন করেছিলো এবং তাকে আপনি করে বলেছিলো। কিন্তু জাহাঙ্গীরের বাক্যবেগে বাধা দেওয়া যায় না। তার বাক্যধারা তুমুল প্রবাহিত হয়, আমি জিগাই তুমি?—আমি তো পুলিশে ভর্তি হইছি। খুব ভালো। তুমি কৈ যাও? জানো তোমারে আমি এক্ষুণি এ্যারেস্ট করতে পারি।–তা তো পারোই, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে এ্যালিগেশন কি? —চলল, তোমার সঙ্গে যাবো, যাইতে-যাইতে বলবো। — তারপর সে করেলা কি আমার পেছনে উইঠা আমারে জাপটাইয়া ধরলো। বুলা এখানেও তাকে একবার থামাতে পারতো। পরশুদিন বলার সময় এই পর্যন্ত ছিলো, চলেন, আপনার সঙ্গে যাবো। কিন্তু জাহাঙ্গীর তাকে নেয়নি, না, আজ একটু কাজ আছে, আরেকদিন আসবো। জাহাঙ্গীর তাকে রেখেই স্পিডে মোটর সাইকেল চালিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এখন জাহাঙ্গীরকে থামানো অসম্ভব।
