আমারে কয় তোমার বিরুদ্ধে এ্যাবস্কণ্ডিং হওয়ার এ্যালিগেশন। তোমাকে আমি সব জায়গায় খুঁজি।–কেন? কেন আবার কি? তোমাকে চাই। আবার কি আলো জ্বালাবে? বুলার মুখটা দ্যাখা যেতো। কিন্তু সুইচে হাত দেয়ার আগেই বুলার মিহি স্বরের নিশ্বাস শোনা যায়। আরে, এ তো ঘুমিয়ে পড়েছে তার পাতলা ফর্সা রোগা হাতটা জাহাঙ্গীরের ঘোড়ের ওপর আলগোছে রাখা। হাতটা ধরে জাহাঙ্গীর পাশে রেখে দেয়, নিজেও শোয় একটু দূরে সরে। এই মেয়েটা স্বামীর প্রেমের গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরের ব্যাপারে কি তার কোনো মনোযোগ নেই। জাহাঙ্গীরকে সে কি কোনো পাত্তাই দেয় না। তার ধারণা কি এই যে জাহাঙ্গীর সব বানিয়ে বানিয়ে বলছে?–কেন, জাহাঙ্গীর কি মিথ্যাবাদী? চাপাবাজ? কেন, এরকম ভাববে কেন? জাহাঙ্গীর কি প্রেম করতে পারতো না? কিংবা কোনো মেয়েই তার প্রেমে পড়বে না? জাহাঙ্গীর উঠে বাথরুমে যায়। ফের এসে খাটের ধারে বসে থাকে। মনে হয় একা একা শুয়ে থাকাটা অনেক আরামের। এইটুকু সেমি-ডবল খাট, সেখানে দুজন ঘুমানো? বিশি।–কাল ভোরবেলা বেরিয়ে যাবে, সারাদিন, এমন কি রাত্রি পর্যন্ত অফিসের কাজ করবে। কতো কাজ বাকি পড়ে আছে। বায়তুল মোকাররম-গুলিস্তান এলাকার বড়ো দোকানদাররা দেশি ফার্মের ওষুধ রাখতে চায় না। তাদের কনভিন্স করা দরকার। ম্যানেজিং ডিরেক্টর দিন দিন তার ওপর বিরক্ত হয়ে উঠছে, অর্ডার আসেনা কেন? কবীর অর্ডার আনে, বেলাল অর্ডার আনে, তুমি করো কি? কবীর কি বেলাল তো তার মতো এরকম এলিয়ে পড়েনি। সকাল নেই বিকাল নেই রাত নেই—বৌয়ের সঙ্গে ম্যাদামার্কা ছেলেদের মতো দিনরাত কেবল ফুসুর ফাসুর করবে তোতা অর্ডার আনবে ওর কোন বাবা?— তাও যদি মেয়েটা ওকে বিশ্বাস করত। তা বুলা ওকে বিশ্বাস না করলে সে কি করত পারে? দোষ তো শালার মহিলা পুলিশের। হিপ-হিপ-হ্বরে যদি সত্যি-সত্যি ওকে ডেকে একটু কথা বলতো তা হলে বুলা কি অবিশ্বাস করে এতো সহজে পার পায়। হিপ-হিপ-হুররে কি তার সঙ্গে পড়তো না? তার কি এই মেয়েটিকে হিপ-হিপহুররে উপাদি দেয়নি? তবে? —অবশ্য কলেজে পড়তে কোনো মেয়ের সঙ্গেই জাহাঙ্গীরের কথাবার্তা হয়নি।, হিপ-হিপের সঙ্গেও হয়নি। তো, পুলিসে পরিণত হওয়ার পর কথা বললে মেয়েটার কি এমন ক্ষতি হতো?
সকালে ঘুম ভাঙে তার বেশ দেরিতে। মুখ ধুয়ে এসে দ্যাখে চা টা সাজিয়ে অপেক্ষা করছে বুলা। এর মধ্যেই বুলার গোসল-টোসল সারা। তার ভোলা ভিজে কালো চুলের মধ্যে ফর্সা মুখটা ভারি কচি ও নিষ্পাপ। কি সুন্দর, না? ভেসপায় স্টার্ট দিতে দিতে জাহাঙ্গীর ঠিক করে, বিকাল বেলার আগেই ঘরে ফিরবে? বুলাকে ধরে ঠেসে চুমু খাবে। তারপর ওকে পেছনে বসিয়ে নিয়ে অনেক দূর ঘুরে আসবে। মালীবাগের ওদিকেটাও যাবে। পুলিশবক্সে মেয়েটা থাকলে চোখজোড়া মেলে একটু দেখবে। দ্যাখানো দরকার।
কিন্তু বিকালবেলা ভেসপার আওয়াজে বুলা বেরিয়ে এলে ওর মুখটা ভার-ভার ঠেকে। কি ব্যাপার? মুশতাক ভাই এসেছিলে। আবার মুশতাক ভাই? দূর! ফার্মেসিগুলো একবার ঢু মেরে এলে হতো, কিছু না কিছু অর্ডার কি আর পেতো না?–কেন, মুশতাক ভাই কেন? সুনীলদাকে আজ সকালে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে, মেডিক্যাল কলেজে আছে। বুলা এক্ষুণি দেখতে যাবে। জাহাঙ্গীরকেও যেতে হবে— আবার সুনীলদা। আবার মুশতাক ভাই।
আমি কি করবো? তুমি যাও।
ওমা। তাই কি হয়। সুনীলদা তোমাকে দেখবে না? আমাদের ছোটোবেলার গানের ওস্তাদ। আমাকে কি আদর করতো।
যাবো। জাহাঙ্গীর চা খেতে খেতে বলে, কিন্তু আমার তো অফিরে খুব জরুরি কাজ। তোমারে রং মেডিক্যালে নামাইয়া দিয়া যাই।
ফিরবো কি করে?
একলা আসতে পারবা না? মুশতাক সাহেব পৌঁছাইয়া দিতে পারবো না।
থাক। আমার আর গিয়ে কাজ নেই। বুলার একটু ভিজে গলার মিষ্টি স্বর ও একটু ঝাঁপসা নোনতা চোখের কোঁচকানোটা এতো সুস্বাদু লাগে যে জাহাঙ্গীর সঙ্গে সঙ্গে কাৎ হয়, আচ্ছা চলো
ভেসপার পেছনে বসে বুলা কবক করে যাচ্ছিলো, কথা একবার শুরু করলে মেয়েটা থামতে পারে না। কথাও বলে এতো মিষ্টি করে, এর আগে এ রকম মিষ্টি ভাষায় কথা বলা মেয়ের সঙ্গে জাহাঙ্গীর কোনোদিন আলাপ করেনি। জাহাঙ্গীর সিনা টান করে, মাথা সোজা রেখে ভেসপা চালায়। বুলা একনাগাড়ে কতো কথা বলে। বেশির ভাগই তাদের ছেলেবেলার কথা। খুব ছেলেবেলায় তারা কুমিল্লায় থাকতো। সুনীল সেনগুপ্ত না থাকলে তার গান শেখাই হতো না।–মুশতাক থাকতো তাদের পাশের বাড়ি। তারা একসঙ্গে গান শিখেছে।–কুমিল্লা কি সুন্দর শহর, ঢাকার মতো এ রকম মানুষ গিজগিজ করে না। ঢাকায় সুনীলদার মতো তোক একটাও নেই। বেচারা বিয়েথা করেনি। এখন বয়স ষাটের কোঠায় পড়েছে, দ্যাখার লোক নেই একটাও–দ্যাখো, বিধবা বড়োবোন ও ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্যেই বিয়ে করলো না, অথচ ভাগ্নে-ভাগ্নিগুলো চাকরি নিয়ে বিয়ে করে ব ড্যাং ড্যাং করে চলে গেলো ইণ্ডিয়ায়, এখন তাকে দেখবে কে? বুলাকে এতো ভালোবাসতো, এতো যত্ন করে গান শিখিয়েছে, বলতো, তুই কোনো দিন গান ছাড়িস না–সুনীলদা যদি শোনে যে বুলা গান ছেড়ে দিয়েছে তো এতো কষ্ট পাবে। জাহাঙ্গীর ভাবে, কেন? বুলা গান ছাড়বে কেন? বুলাকে তার বলতে ইচ্ছা করে, তুমি গান শিখতে চাও, শেখো। যতো টাকা লাগে আমি রোজগার করে আনবো। দরকার হলে কোথাও পার্ট টাইম কাজ নেবো। দেশের বেস্ট ওস্তাদকে রেখে দেবে। তোমার কথা এতো মিষ্টি, এই কথায় সুর দিলে না জানি কি সৃষ্টি হবে। কিন্তু এসবকথা বলাটা মুশকিল। এ ছাড়া মেডিকাল কলেজের গেট এসে পড়ে। দোতলায় ওয়ার্ডের এক কোণে নাকে অক্সিজেনের পাইপ গোঁজা রোগা সুনীল সেনগুপ্তকে দেখে জাহাঙ্গীরের বুক উথলে ওঠে হায় রে, মানুষটা একেবারে নিঃসঙ্গ শুয়ে রয়েছে। বুলা পায়ে হাত রেখে সালাম করলে জাহাঙ্গীরও নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করে। সুনীল সেনগুপ্ত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে মুশতাক এসে পড়ে, তার হাতে ফ্ল্যাক্স। মুশতাক বুকে বলে, দাদা, বুলার হাজব্যান্ড, চিনতে পেরেছেন? সুনীলদার ঠোঁট কাপে, ঠোঁটে হারি কিন একটি রেখা তৈরির চেষ্টা তার ব্যর্থ হয়।
