আমিতো সারাক্ষণ ভয়ঙ্কর একটা কিছু করার জন্যে ছটফট করছি। পারছিনে বলে নিজেকে কাপুরুষ ভীরু কত কিছু বলে অহরহ ধিক্কার দিই। একেক সময় ভাবতে অবাক লাগে। এত যন্ত্রণা বয়ে বেড়াবার মতো ধৈর্য আমি পেলাম কোথা?
রাবেয়া কিন্তু সত্যিই অদ্ভুত।
কখনো সে আমার মতো ছটফট করে না। পরিস্থিতি যতোই জটিল হোক না কেন রাবেয়ার তাতে ভয় ধরে না। মুহূর্তের ভেতর সব কিছুকে সে কেমন সহজ করে রেখে যায় রাত্রিবেলা ঘুমোবার আগে রাবেয়া কতো কী যে বশ্লো। অনেক হাসালো। স্কুলটা অল্পদিনের ভেত্র দাঁড়িয়ে যাবে বলে সে বিশ্বাস করে। শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো উপদ্রব দেখা না দিলে, সে মনে করে, তার বন্ধু সুফিয়া এখন অনায়াসে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করতে পারবে। এতে কিছু শোনার পর তার ভবিষ্যৎ
পরিকল্পনা সম্পর্কে আমার মনে একটা ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্কুলের কাজ হয়ে গেলে সে একদিন উঠে যাবে তার নতুন প্রেমিকের কাছে। ইতিমধ্যে ঘর বাঁধবার ব্যবস্থা পাকা করে নিচ্ছে।
রাতে আমার ঘুম হলো না।
.
রাবেয়ার সকাল চলছিলো যথানিয়মে। তার চোখ এড়াবার জন্যে বেড-টি না খেয়ে ঢুকে পড়ি বাথরুমে। ভেবেছিলাম ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করে পরিচ্ছন্ন হয়ে আসি। তাহলে দুঃসহ রাত জাগার ক্লান্তি রাবেয়ার চোখে ধরা পড়বে না।
একেক সময় অবাক লাগে, প্রাণপণ চেষ্টায় এসব যন্ত্রণা রাবেয়ার কাছ থেকে আমি আড়াল করে বেড়াচ্ছি কেন। খুব অনিশ্চিত হলেও মনে মনে বোধহয় ক্ষীণ আশা আছে যে রাবেয়া শেষ পর্যন্ত নিজের ভুল বুঝবে এবং অনুতপ্ত হয়ে থাকবে আমার কাছেই।
সকালের চায়ের টেবিল আমাকে দীর্ঘদিন থেকে আর কোনো প্রেরণা দেয় না, ওখানে বসা এখন একটি অভ্যাস মাত্র। প্রয়োজন মেটানোর একটি নির্দিষ্ট স্থান, একঘেয়ে।
কাপড় চোপড় পরে চা ব্রেকফাস্টের জন্য টেবিলের এককোণায় বসে পড়ি। রাবেয়া চোখ তুলে তাকালো একবার। সম্ভবত একটি অসঙ্গরি প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করা তার উদ্দেশ্য— আমি সাধারণত টেবিলের এ জায়গায় বসিনে।
রাবেয়া গুনগুন করছিলো একমনে। এর অর্থ আমার কাছে বেশ স্পষ্ট। রাবেয়া জেনে ফেলেছে সারারাত আমি ঘুমুই নি। সেজন্যে তার মন খারাপ। গুনগুনিয়ে আসলে সে তার দুঃখ নিয়ে নাড়াচাড়া করছে নানাদিক থেকে সন্ধানী আলো ফেলে বুঝবার চেষ্টা করছে তার দুঃখের গভীরতা।
আতঙ্কিত হয়ে উঠি। তবে কি তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় কখনো কিছু বলেছিলাম যা শুনে রাবেয়া অসুখি হয়েছে? সে জেনেছে আমার মনের ওপর কী নোংরামি বাসা বেঁধেছে। আমার মন এখন সন্দেহে ভরা এবং বিদ্বেষপূর্ণ?
মনে হচ্ছিলো ধরা পড়ে গেছি। আর রাবেয়া অপেক্ষা করছে এমন একটি মুহূর্তের জন্য যখন সে প্রমাণ করে ছাড়বে যে আসলে আমার মনটা অতি নিচু, অতি জঘন্য। ওর বাইরে আর কোনো সত্য নেই।
বুকের ভেতর তোলপাড় করছিলো। ভয় হচ্ছিলো সমস্ত কিছু তছনছ হয়ে এখনি আয়ত্বের বাইরে চলে যাবে এবং আমার—আমি, রাবেয়া, মিশেল, বড়, বাবা মা, বন্ধুবান্ধব, ঘরবাড়ি, ইচ্ছা অনিচ্ছা, নিক্ষিপ্ত হবো অনুজ্জ্বল কোনো এক প্রেতলোকে। তারপর বাকি জীবন জুড়ে বসবে ভূত-প্রেতের রাজত্ব।
স্থির ঠাণ্ডা চোখে রাবেয়া একবার তাকালো। সে দৃষ্টির সামনে দাঁড়াতে পারছিলাম না। অনিশ্চিতভাবে বল্লাম, আমাকে এক কাপ কফি দাও বরং।
.
কথায় জড়তা ছিলো। রাবেয়া বোধহয় ঠিকমতো বুঝতে পারে নি। সে বল্লো উঃ?
কফি দাও। চা খেতে আর ভালো লাগছে না। কেমন একঘেয়ে লাগে। আমার এসব মন্তব্যের সাথে রাবেয়া নিজেকে কোথাও জড়ালো না।
আচ্ছা!
প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে উঠেছি। বুকের গভীরে যে শোরগোল চলছিলো তা কিন্তু এখনো শেষ হয় নি।
রাবেয়াকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
যারা হরদম কথা বলে, কোনো কারণে যদি আর তাদের কথা শোনা না যায় তাহলে বিপদাপন্ন মনে হয়। তারা কেমন দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।
এই অস্বস্তিকর ভাবটা কাটাবার জন্যে বল্লাম, রাবেয়া, আজকে ছুটির দরখাস্ত করবো?
রাবেয়া উচ্চবাক্য করে না, চোখে চোখ রাখে। যেন সে আমার প্রস্তাবটার সারাংশ গ্রহণ করতে চেষ্টা করছে। এই সঙ্গে হয়তো আমাকে গম্ভীরভাবে নিরীক্ষণ করার কথা মনে হয়েছে ওর।
এতে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। মনের ভেতর গর্জে ওঠে অভিশাপের ভাষা। ভাবতে ভালো লাগে, রাবেয়া বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু তার কি কোনো লাভ হবে?
আজ বাদে কাল।
না হয় পরশু।
সহজ ভাষায় আমাকে জানাতে হবে তার নতুন প্রেমের কথা। সকালবেলায় এই ভাবনাকে আশ্রয় করে অপ্রধান হবার অপমান থেকে নিষ্কৃতি পেলাম।
.
আপিসে বুড়ো হেনিংসের সাথে দেখা করে দরখাস্তটা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। রাবেয়া স্কুলে যায় নি। এসে দেখি সে খুব মন লাগিয়ে ঘরবাড়ি গুছোচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলা, স্কুলে যাও নি?
না।
কেন?
এমনি, ভালো লাগছিলো না।
রাবেয়া?
বলো!
আমি আজ দুপুরের ট্রেনে বাড়ি যাবো।
হঠাৎ একটু আতিশয্য দেখা দেয় রাবেয়ার চোখে মুখে। সে খুব যেন খুশি হয়েছে এমনিভাবে বল্লো, গ্রামের বাড়িতে?
হ্যাঁ।
কী ভেবে রাবেয়া নিজেকে সংযত করে নেয়।
বেশতো, কবে ফিরবে?
রাবেয়া জানে না একথার সঠিক জবাব সে আমার কাছ থেকে পাবে না। আমি তাকে হাতে নাতে ধরতে চাই। ভদ্রতার আড়ালে সে শক্তিময়ী। ভদ্রতার ভেতরে থেকে তাকে ধরা যাবে না। কিছুদিন থেকে ভাবছিলাম। এখন আমি প্রায় নিশ্চিত যে অনুপস্থিতির সুযোগে রাবেয়া তার কাজ সেরে ফেলবার চেষ্টা করবে। এই মুহূর্তে সব কিছু যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তাই রাবেয়ার কাছে মিথ্যা কথা বলতে একটুও বাঁধলো না। বল্লাম, ভাবছি সপ্তাহ দুয়েক থাকব।
