আমারও ভালো লাগে গ্রামে থাকতে।
একথার যোগ্য সাড়া দিতে গেলে বলতে হয়, বেশতো তুমিও চলো। আমি তার ধারে কাছেও গেলাম না। মনে হচ্ছিলো, রাবেয়া আমাকে গ্রামের বাড়িতে অন্ততপক্ষে সপ্তাহ দুয়েক কাটিয়ে আসার জন্যে উৎসাহিত করছে।
.
গ্রাম শহরের দ্বৈত প্রেরণা রাবেয়ার ভেতরে অনায়াসে জায়গা পেয়েছে। সে আমি জানি। কিন্তু সে কি এবারে সত্যি সত্যি আসতে চেয়েছিলো? আমার তা মনে হয় না। চাইলেই আমি তাকে নিয়ে আসতাম না।
গ্রামের বাড়িতে তিনদিন কাটতে না কাটতে আমি অস্থির হয়ে পড়ি। একেতো গ্রামে আমার ভালো লাগে না। বিশেষত সন্ধ্যা হতে না হতেই যেভাবে অন্ধকার জেঁকে বসে তাতে আমি রীতিমতো অসুস্থ বোধ করি। চতুর্থ দিনে বুড়ো ফুফুর শত আপত্তি সত্ত্বেও আমি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম।
পরিকল্পনা নিখুঁত। অত্যন্ত ভেবেচিন্তে আমি সন্ধ্যার ট্রেনে চেপে বসেছি। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ঢাকায় পৌঁছে যাবো। আরো আধঘন্টা পরে বাড়ি।
বড়ো সড়কের ওপর ভাড়া মিটিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিই। এখন আর মাত্র আধ মিনিটের মাথায় বাড়ি। সড়কের ওপর থেকেই দেখেছি, শোবার ঘরে আলো জ্বলছে।
রাস্তায় থাকতেই কান পেতে রাখি।
পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। মনে হলো, শোবার ঘরে কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমার আর শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে না। যন্ত্রচালিত্রে মতো এগুচ্ছিলাম, শোবার ঘরের দিকে। দরোজার ওপর কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম, জানিনে। সামনে গাঢ় বুজ রংয়ের ভারী সিষ্কের পর্দা। মনে হয়েছিলো সমস্ত অস্তিত্ব তখন শ্রবণেন্দ্রিয় নির্ভর।
কান্নার পালা শেষ হয়েছে রাবেয়ার। এখন সে কথা বলছে, সংশয়ের আরতো কোনো অবকাশ নেই। হঠাৎ বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমি অভিভূত হয় পড়ি। তাদের মহত্ত্বের তুলনা হয় না।
আমার আরো আগে তৎপর হওয়া উচিত ছিলো। তাহলে দীর্ঘদিন ধরে নরকযন্ত্রণায় ভুগতে হতো না।
আশ্চর্য! আমরা বিয়ে করেছিলাম ভালোবেসে। রাবেয়াকে জানতাম সেই কোন ছোটবেলা থেকে। ভাবি নি কোনোদিন সে অধঃপাতের পথ বেয়ে এতোখানি নিচে নেমে যাবে। দেখেছি, চিরকাল সে মিশুকে প্রকৃতির। কোথাও আটকায় না। চলাফেরায় ফুর্তি থাকার ফলে। স্বাচ্ছন্দ্য তার নিত্যসঙ্গী।
রাবেয়া রূপসীও।
ভদ্রতায় সে নিখুঁত।
মনটা মার্জিত।
এ বই রাবেয়ার স্বপক্ষে ছিলো।
অগণিত ভক্তের ভেতর থেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে আমাকে কেন যে সে বেছেনিয়েছিলো তার অর্থ আমার কাছে অস্পষ্ট ছিলো না। এখন মনে হচ্ছে রহস্যাবৃত হয়ে আমি চিরদিনের জন্যে তলিয়ে গেলাম।
গ্রামে যাবার আগে ঠিক করেছিলাম এনিয়ে দুঃখের বোঝা আর বাড়াবো না। ব্যাগ থেকে আস্তে গুলিভরা পিস্তলটা তুলে নিই। আগ্নেয়াস্ত্রের স্পর্শ প্রত্যয় আনে মনে। শরীর দৃঢ় হয়, কোথায় যেন একটু জ্বালা ধরেছে।
ঘরের ভেতর থেকে রাবেয়ার কান্নাভেজা টুকরো কথা ভেসে আসছে।
তোমার কাছে এসে আমি বাঁচবো, কতবার বলেছি। আবার বলছি। আবার।
রাবেয়ার কথা, গলার স্বর ভৌতিক মনে হয় আমার কাছে।
রাবেয়া নিশ্চয়ই তার নতুন প্রেমিকের বুকে মুখ গুঁজে গাঢ় স্বরে কথা বলছে আর স্বপ্ন দেখছে। আমি যে খুব ঈর্ষা বোধ করছি তা নয়।
সব জানা হয়ে গেছে আমার। মনটাও তৈরি।
অকম্পিত হাতে দরোজার ভারী পর্দা সরাই। কোথায় যে সেই মিহি মসৃণ জ্বালা! এই মুহূর্তে আমার শরীরে মনে সুধাবর্ষণ করে চলেছে।
রাবেয়া খেয়াল করে নি। বল্লাম, রাবেয়া। আমাদের লুকোচুরি খেলার এই শেষ। তুমি তৈরি হয়ে নাও।
রাবেয়া চোখ তুলে একবার তাকালো না পর্যন্ত। আমার মানুষ সমান উঁচু ছবিটার সামনে সে দাঁড়িয়েছিলো। অলৌকিক বিষাদের ধ্যানী মূর্তির মতো চোখের কোল বেয়ে পানি গড়াচ্ছিলো অবিরল ধারায়।
ছবিটার ওপর চোখ পড়তে পিস্তলটা কোথায় লুকোবো ভেবে পাইনে।
প্রেমের গপ্পো – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
মাগো। তুমি এতো মজা করে কথা বলতে পারো। তারপর? মেয়েটা তোমাকে কি বললো? বুলার হাসি আর থামে না, স্বামীর প্রাক-বিবাহ প্রেমের গল্প শোনে আর হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, খিলখিল এবং খিকখিক আওয়াজ বন্ধ হবার পরেও গোলগাল ফর্সা মুখের এ কোণে ও কোণে হাসির কুচি কিচিক করে। উৎসাহে জাহাঙ্গীরের ঠোঁট উপচে পড়ে, আমাকে বলে পুরুষমানুষ তার বডি হবে পুরুষ মানুষের মতো। হেঁটে গেলে মাটি কাঁপবে।
ধ্যাৎ। বুলা ফের হাসে, মেয়েরা এভাবে কথা বলে নাকি?
বললাম না, অন্য কিসিমের মাল। বলেই জাহাঙ্গীর তার ভাষা ঠিক করে, অন্য ধরনের মেয়ে। বুঝলে না? সব সময় খেলাধুলা নিয়ে থাকে আমার সঙ্গে আলাপ হয় স্টেডিয়ামে। আমি তখন ডিসকাস থ্রো প্রাকটিস করতে যাই, তো একদিন শাহীন বললো,
শাহীন কে? পরশু না নাম বললে শাহনাজ।
ঐ তো ভালোনাম শাহনাজ। ডাকনাম শাহীন। জাহাঙ্গীর একটু থেমে বলে, মানুষের দুটো নাম থাকে না? তোমার নাম–।
বুঝেছি। শাহীন না শাহনাজ। কি বললো?
আমার থ্রো দেখে বলে আপনার হাতের মুভমেন্ট খুব ম্যাজেস্টিক, আবার খুব ফাস্ট।–ওর বড়ভাই ভালো জিমন্যাস্ট ছিলো, আমাকে একদিন বলে, আপনি যদি শাহীনকে একটু দেখিয়ে দিতেন তো ভালো হয়। এবার মেয়েদের মধ্যে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন না হলে পাগল হয়ে যাবে।
তারপর?
গাড়ি করে ওদের বাড়ি নিয়ে গেলো। গুলশানের বাড়ি। বিরাট বাড়ি, সামনে লন, পেছনে মাঠ। মনে হয় হাফ স্টেডিয়াম। বাড়িতে টেনিস থেকে শুরু করে ক্রিকেট বলল, বাস্কেটবল বলো—সব কিছুর ফুল এ্যারেঞ্জমেন্ট। সুইমিং পুল পর্যন্ত আছে। একটা সাইডে শট পুট প্র্যাকটিসের জায়গা করা হলো, আমি সপ্তাহে চারদিন যাই আর। কায়দা টায়দাগুলি দ্যাখাই।
