ছেলের কথা বলতে বলতে বুড়ো আজকে কেমন যেন উদাস হয়ে পড়েন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ওকে একবার এদেশটা দেখে যাবার জন্যে নেমন্তন্ন পাঠান না কেন? না হয় আপনার হয়ে আমরাই পাঠাই।
কিছু লাভ নেই। তার যে অনেক কাজ। হ্যাঁ, যে জন্যে তোমাকে ডেকেছিলাম।
বুড়ো হেনিংস থামেন। একটা সরু বেলজিয়ান চুরুটের মুখে আগুন লাগিয়ে নিবিষ্ট মনে চুরুটটা পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হবার পর বল্লেন, বোর্ড অব ডাইরেক্টরসকে আমি লিখেছিলাম। বোর্ড তোমাকে চার মাসের ছুটি দিতে রাজি হয়েছে। তোমার সৌভাগ্যে আমি কিন্তু রীতিমতে ঈর্ষাবোধ করছি।
বুড়ো উচ্চ হাসিতে ফেটে পড়েন। বোর্ডের চিঠিটা আমার সামনে এগিয়ে দিলেন, বিলেতে অথবা ইউরোপের যে-কোনা জায়গায় ছুটিটা কাটাতে পারো।
ছুটি নেয়ার ব্যাপারে ওজর আপত্তি বা বাগবিস্তারেব অবকাশ আর নেই। তবে যেভাবে ছুটি জুটলো সে সম্পর্কে কিছু জানা দরকার। বল্লো, আমিতো ছুটি চাই নি।
তোমার হয়ে আমি চেয়েছিলাম। তোমাকে জানানো উচিত ছিলো সে কথা মানি। জানানো হয় নি সে জন্যে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
সাগরপারের বোর্ড যে কাজ ইতিমধ্যে অনুমোন করে পাঠিয়েছে, তাকে প্রত্যাখ্যান করলে একটা হুলুস্থুল পড়ে যাবে। বিব্রত হবে বুড়ো। হৈ হুল্লোড়ে আমার উৎসাহ নেই। তবে যেভাবে ছুটি আমার ঘাড়ে চাপলো তাকে অভিনন্দন যোগ্য কোনোকিছু বলে মনে হচ্ছিলো না। বুড়োকে বল্লাম, আপাতত এই শহর ছেড়ে কোথাও যাবার পরিকল্পনা আমার ছিলো না। কাজেই ছুটি নেবার কথা মনে হয় নি।
বুড়ো হাত তুলে থামিয়ে দেয় আমাকে। ভাবখানা এই যে এ নিয়ে কথা বাড়াবার সুযোগ নেই।
এ ছুটি তোমার খুব দরকার তারেক। একটু ভেবে দেখলে তুমি আমার সাথে একমত না হয়ে পারবে না। কাজের জন্য ভাবতে হবে না তোমার। সে ব্যবস্থা হয়ে গেছে। কুয়ালালামপুর থেকে তোমরা রিপ্লেসমেন্ট এসে যাবে দুয়েকদিন ভেতর। না আসা পর্যন্ত আমিতো আছিই।
বল্লাম, আপনার কাজে খুঁত থাকে না। সে আমি জানি। একটা কথার সরাসরি জবাব দেবেন? বুড়ো বনে, একশোবার।
কোম্পানির কাজ ঠিকমতো করছিনে বলে কি আপনাদের মনে কোনো সন্দেহ দেখা দিয়েছে?
বুড়ো হেসে ফেলেন, কাজ বেশি করছে। সেখানে আমার আপত্তি আছে। তাছাড়া তুমি খুব ক্লান্ত—আমি অনেকদিন ধরে লক্ষ করেছি। এতো কাজ করারও মানে হয় না, এতো ক্লান্তি নিয়ে কাজ করা তার চেয়েও অর্থহীন।
বুড়োর কথায় সস্নেহ কর্তামির সুর, কিছু অভিযোগ, কিছু তিরস্কার, কিছু কৌতূহল। হয়তোবা তারও অজান্তে, অলক্ষ্যে এসে ভিড় জমিয়েছে। বিপরীত কিছু বল্লে বুড়ো মনে ব্যথা পাবেন। তাছাড়া প্রতিবাদ করার মতো কোনো কথা তো সায়েব বলেন নি।
হেনিংসের কথা মেনে নিলাম। এর ফলে নিমেষে মনের গুমোট বেশ খানিকটে কেটে যায়। পরিস্থিতির অভিনবত্বে অভিভূত হয়ে আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ি। হেনিংস মনে মনে খুব খুশি হয়েছে। তার সারা মুখে অপার্থিব আনন্দ। আরেকটু দাঁড়ালে আমি যে তার একটু বেসামাল অবস্থা দেখে যেতে পারতাম সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত।
বুড়ো সায়েরে ওখানেই এতো দেরি হয়ে গেলো যে রাবেয়ার কথা রাখতে পারি নি। এজন্যে আমি যে দুঃখিত বোধ করছি তা নয়।
বাড়িতে ফিরে রাবেয়াকে দেখতে পাবো আশা করি নি। ভেবেছিলাম সে নিশ্চয়ই মিটিং করতে চলে গেছে।
আশ্চর্য। রাবেয়া সময় মতো না ফেরা নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি করলো না। বরং যেন কিছুই হয় নি এমনিভাবে বল্লো, তুমি ভারী অবুঝ। বুঝলে?
হুঁ।
সত্যি কথা বলতে কী রাবেয়ার সামনে মুহূরে জন্যে নিজেকে একটু অপরাধী লাগছিলো। সেই কখন থেকে আমি একলা বসে আছি। কিছুতেই সময় কাটলো না। না পেরে কী করলাম, জানো?
নাতো!
বড়বু’কে টেলিফোন করলাম। ঝাড়া আধঘন্টা। মিশেল বেশ কিছু কবিতা শিখে ফেলেছে। কী ঝরঝরে কথা, বুক জুড়িয়ে যায়।
বড়বু, মানে আমার বিধবা বড় বোন। মিশেল আমাদের একমাত্র ছেলে, তিন বছরের। জন্মের পর থেকে বড় জোর করে নিয়ে যান। কোনোকালে ফেরত পাওয়া যাবে কিনা সে সম্পর্কে আমাদের সন্দেহ আছে। বড়বু’র ধারণা, তার কাছে থাকলে মিশেল মানুষ হবে।
এ ব্যবস্থা আমাদের, বিশেষত রাবেয়ার মনঃপূত নয়। কিন্তু বসুর দুঃখময় দিকটা ভেবে সেও খুব বেশি আপত্তি করতে পারে নি। মিশেলকে নিয়ে তিনি মোটামুটি ভালোই আছে। রাবেয়া রোজই একবার মিশেলকে দেখে আসে।
আমার মনে হলো ন্যাকামি। মিশেলের কথা আনা হয়েছে। খুব সুপরিকল্পিতভাবে। রাবেয়ার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আমি শোবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। সেও এলো পেছনে পেছনে।
এমন একলা লাগছিলো!
অর্থাৎ বিলম্বে আমি এসে পড়াতে সেই দুঃসহ অভাববোধটা এখন আর নেই। একথাই কি রাবেয়া আমাকে বোঝাতে চায়?
মনে হচ্ছিলো ঘাড়ে পিঠে চাবুক পড়ছে নির্দয়, বিরতিহীন ঘুরে দাঁড়িয়ে রাবেয়ার চোখে চোখ রাখি। ক্লান্ত স্বরে বলি, তাই নাকি?
আমাকে চা দিয়ে রাবেয়া বেরিয়ে গেলো। স্কুল কমিটির মিটিংয়ে।
.
আজ পর্যন্ত কোথাও কোনো সংঘর্ষ বাঁধে নি, তার কারণ হয়তো এই যে রাবেয়া যেভাবে সমস্ত ব্যাপারটাকে দেখছে, আমার দেখার ধরনটা তা থেকে একেবারে আলাদা। অথবা আমরা দু’জনেই সংঘর্ষ এড়াবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছি।
রাবেয়ার কথা রাবেয়া জানে।
