পাচ্ছি না। তুমি বলেছ এতে লজ্জা পাওয়ারও কিছু নেই।
রকিব সত্যিই এ রকম বলেছে। বেশ আগে একদিন কথা প্রসঙ্গে রকিব বলল, এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। খুব সাধারণ একটা জৈবিক প্রক্রিয়া। নারী কিংবা পুরুষই, যার শরীরই ভারি হোক, একা অবস্থায় আপনা-আপনি ওভাবেই হালকা হবে—এটাই নিয়ম।
হোক নিয়ম। আমার ভীষণ লজ্জা লাগে। কি একটা ব্যাপার বলো তো, ছিঃ।
উঁহু, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।
আমার পা ঘিন ঘিন করে।
সেটা করাও অনুচিত।
বিশ্বাস করো, আমি এত বিব্রত হই, আমার এত অস্বস্তি লাগে। এভাবে আমি কখনও চাই না।
উপায় নেই।
রকিরে মুখে উপায় নেই শুনতে শুনতে ব্যাপারটা বেশ কিছুটাই সহজ তার কাছে হয়ে এসেছে বইকী। সুরাং রকিব যখন তাকে জিজ্ঞেস করল—কি বলবে—সে বলতে পারত গত রাতের স্বপ্নের কথা। তারপর কিছু হাসি-ঠাট্টা নিশ্চয় তাদের হতো। কিন্তু শামীমা বলল না। তার মনে হলো হাসি-ঠাট্টা হয়ত হবে ঠিকই, কিন্তু তার আগে সে আটকে যেতে পারে, যদি হাসতে হাসতেই রকিব জিজ্ঞেস করে—তা কার সঙ্গে ব্যাপারটা ঘটল? এ প্রশ্ন যদি করে রকিব, শামীমার মনে হলো, উত্তর দিতে তার সঙ্কোচ ও দ্বিধা হবে।
নাস্তা খেয়ে উঠে রকিব বলল, আসো, এক রাউন্ড ব্যায়াম করি। তারপর নিজেই সে মাথা নাড়লনা, ভরপেটে ব্যায়াম স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ফিরে এসে। বলে সে কতক্ষণ টেলিভিশন দেখল। পোষাক পাল্টে কতক্ষণ নিজেকে দেখল আয়নায়, জিজ্ঞেস করল—কেমন দ্যাখাচ্ছে আমাকে বলো তো? বড় অফিসার বড় অফিসার মনে হচ্ছে? শামীমা বলল, মাসের উনত্রিশ দিন যাকে অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে বাইরে থাকতে হয়, সে আবার কিসের বড় অফিসার?
রকিব একটা ভেংচি কাটল, তারপর অফিসে রওনা দিল।
বারান্দা থেকে রকিবের বেরিয়ে যাওয়া যতদূর সম্ভব দেখে নিয়ে শামীমা যখন ঘুরে দাঁড়াল, সে দেখল, তার আর কিছু করার নেই। সে শেষ রাতের স্বপ্নটা ভাবতে বসল। ওটা সজলের মুখ ছিল। কিন্তু এত বছর পর সজল কেন এল ওভাবে! সজলের সঙ্গে বেশ আগে, সে তখন ভার্সিটির প্রথম দিকে, তার একটা সম্পর্ক ছিল। সে সম্পর্ক প্রেমের, এমন নয়, আবার নিছক বন্ধুত্বের কিংবা সজল কেবলই বড় ভাইয়ের বন্ধু, এমনও নয়। সজলের সঙ্গে তার গভীর প্রেম হতে পারত, সেটা গড়াতে পারত। বিয়ে পর্যন্ত, কিন্ত ওসব ছিল হতে পারা কথা, হয়নি। হয়নি বলে সে দুঃখ পায়নি এ নিয়ে তার কোন ক্ষোভ নেই, কষ্ট নেই, হাহাকার নেই। তাছাড়া সজলের কথা তার মনেও পড়ে না।
কিন্তু, মনেও পড়ে না যখন, সজল ওরকম এক স্বপ্নে কেন এল? শামীমা কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা হাসিমুখে তাকিয়ে থাকল একদিকে।
অফিস থেকে যে সময় ফেরে রকিব, তার ঘন্টা দেড়েক আগে সে ফিরে এলে। বিটকেলে একটা হাসি দিল শামীমার সামনে দাঁড়িয়ে একা একা কার কথা ভাবছিলে?
শামীমা গম্ভীর গলায় বলল, তোমার কথা যে নয়, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পার।…তুমি ও সময়ে ফিরলে যে, চাকরি চলে গেছে?
প্রায়। আমি বসকে বললাম এভাবে ঘন ঘন আমাকে বাইরে পাঠালে আমার সংসার টিকবে না। শুনে বস কি বলল জানো?
না।
বস বলল, সংসার গুলি মারেন, চাকরিই সব।…আমি অবশ্য বসকে বলিনি আমাদের ওই কাজটাও নিয়মিত হয় না। অথচ বিয়ের মাত্র দু’বছর।
বললে না কেন! বললেই পারতে।
কি দরকার। বাসায়ই তো চলে এসেছি। এখন ওটা আমরা করব। রেডি হও।
শামীমা হাসতে আরম্ভ করল—ফাজিল কোথাকার।
আমি কিন্তু রেডি হয়ে এসেছি। পরে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবে না।
শামীমার হাসি বেড়ে গেল—আমি তেমন করে দোষ দেই তোমাকে?
রকিব একটু গম্ভীর, একটু আনমনা হয়ে গেল, তা দাও না….শামীমা, তুমি আসলে খুব ভালো।
শামীমা তার ছড়িয়ে যাওয়া হাসি স্থির করল, রকিবের দিকে নরম চোখে তাকাল, বলল—বোঝো তাহলে?
রকিবের মুখে এবার হাসি ছড়াল—আমি যদি না বুঝি, কে বুঝবে বলো?
মৃদু মাথা কঁকাল শামীমা। সে খুব বুঝদারের ভঙ্গিতে বলল, তা-ও ঠিক, তা-ও ঠিক।
৪.
তারপর দিন পার হতে হতে রকিবের ঢাকার বাইরে যাওয়ার সময় হয়ে গেল। এবার পাঁচ দিন তার থাকতে হবে বাইরে। সন্ধ্যার সময় তার বাস। সে বলল, যাচ্ছি তাহলে।
যাও। ভালোভাবে যাবে। আর ভালোভাবে ফিরে এসে চাকরিটা বদলানোর চেষ্টা করবে।
অবশ্যই। রকিব গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল। সে আর বলতে। ফিরে এসেই।…ফিরে এসেই। ফোন করব।
হুঁ। ফোনটা অন্তত নিয়মিত করো।
গেলাম।… অ্যালেক্সি থাকল।
শামীমা কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল রকিবের দিকে। বলল, ওই মেয়েটাকেও, ওই যে হোটেলে দেখেছিলে এক পলক, ওই মেয়েটাও তো তোমার সঙ্গে যাচ্ছে, তাই না?
তারা দু’জন হাসতে আরম্ভ করল। হাসি থামিয়ে রকিব বলল, হ্যাঁ, আমি ওই মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি আর অ্যালেক্সি থাকছে তোমার কাছে।
শামীমা বলল, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ? তোমার যাওয়ার সময় আমরা শুধু এ ধরনের ইয়ার্কি মারি। কিন্তু শুধু কি এটাই সমস্যা, বলো? দুজন দুজনকে ছেড়ে থাকি বলে আমাদের কি মন খারাপ হয়ে থাকে না?
থাকে। রকিব শামীমার কাঁধে একটা হাত রাখল। খুব মন খারাপ হয়ে থাকে তোমার আর আমার। কিন্তু মন খারাপের কথা বলে যাত্রা সময়টা স্যাঁতসেঁতে করার কী দরকার আছে!….আর, ইয়ার্কি যদি মারতেই হয়, একটু রসালো ইয়ার্কি মারাই ভাল, কি বলল?
