বল্লাম, তোমার বিশ্লেষণ যথার্থ অর্থে তোমারি মতো। কোনোকিছু বাদ পড়ে নি। যা হয় একটা করে ফেলো না কেন? না হয় কালকে একটা মিটিং ডাকো। আলোচনা করে নাও বুড়োর সাথে।
বুড়ো মানে এ আপিসের বড় সায়েব। ক্রিস্টোফার হেনিংস, বেলজিয়ান। আমার এ প্রস্তাব মুরারের মনঃপূত হয়েছে। ধন্যবাদ জানিয়ে সে টেলিফোন ছেড়ে দিলো।
সকালে ব্রেকফাস্টের সময় রাবেয়া জিজ্ঞাসা করেছিলো, আপিস থেকে আজকে একটু সকালে আসতে পারবে?
কেন জানিনে একথা শুনে হঠাৎ বুকের ভেতর ধরাস করে উঠেছিলো, বুঝিবা এক ঝলক রক্ত মুখে ভিড় জমিয়ে থাকবে। চায়ে চুমুক দিয়ে কোনোরকমে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করতে করতে বল্লাম, কেন বলোতো?
রাবেয়া বল্লো, তোমার সাথে গুটিকতক জরুরি কথা আছে।
আমি একটু বিরক্ত বোধ করি, তার জন্যে আপিস থেকে আগে চলে আসার দরকার কী? আমার জবাব দেবার ধরনটা তেমন ভালো ছিলো না, কথায় ঝাঁঝ ছিলো, বক্রতা ছিলো। রাবেয়া মনে করতে পারতো এ আচরণ অন্যায়, অপ্রত্যাশিত এবং নিষ্ঠুর। কেন যে সে চটে গেলো না তা অবশ্য এখন অবধিও আমার কাছে দুর্বোধ্য হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কী আমার আচরণ যতোই অসমতল হোক না কেন, লক্ষ করেছি, রাবেয়া তাতে কখনো বিরক্ত বোধ করে না।
স্বাভাবিক স্বরে রাবেয়া বল্লো, বিকেলে, পাঁচটার দিকে, আমার স্কুল কমিটির একটা মিটিং রয়েছে। ওখানে যাবার আগে তোমার পরামর্শ নেবার ইচ্ছে। জানোইতো তোমার সাথে আলোচনা না করলে আমি কিছুই ঠিকমতো করে উঠতে পারিনে। সেজন্যে বলছিলাম যদি একটু আগে আসতে পারতে।
প্রায় দপ করে জলে উঠেছিলাম। সামলে নিলাম। এখন এই কথার সূত্র ধরে অনায়াসে রাবেয়াকে জব্দ করা যায়। একবার মনে হয়েছিলো এ সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। আবার ভাবি, মেজাজ করলে রাবেয়া ধরে নেবে এ আমার অক্লান্তির বিকার। বুঝবে না আমার মনে একটা পুরনো আক্রোশ আছে। ধারালো, শানানো কিছু কথা, কিছু চিৎকার জিবের ডগায় চলে এসেছিলো। গণ্ডগোল বাঁধালো বুড়ো বাবুর্চি, প্যাসেজে দাঁড়িয়ে রাবেয়াকে ডাকলো, চিংড়ি দিয়ে কী করবো মা?
ক্ষিপ্র পায়ে বেরিয়ে যাবার সময় রাবেয়া আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো, এক সেকেন্ড। বাবুর্চিকে বুঝিয়ে দিয়ে আসি।
বাবুর্চির সাথে রাবেয়া রান্নাঘরে ঢোকে। শুনতে পাই, বাবুর্চি মাঝে মাঝে হুঁ হুঁ। করছে। এভাবেই সে তার করণীয় কাজ রাবেয়ার কাছ থেকে বুঝে নেয়। বাবুর্চির গলাটা অদ্ভুত, স্বর জোরালো, খুব গভীর কোনো জায়গা থেকে উঠলে অন্যের কানে খুব খারাপ শোনায়। এটা কি তার কথা বলার বিশেষ ধরনের জন্যে, না অন্য কোনো কারণে তা নিয়ে মনে মনে বিস্তর গবেষণা করেছি। সদুত্তর পাওয়া যায় নি। রাবেয়ার ধারণা স্বরে আঁটসাট বাঁধুনি জিভের কাছে এসে হাসি ছেড়ে দেওয়ার ফলে বাবুর্চির কথা শ্রুতিমধুর ঠেকে না।
হচ্ছে কী!
এক সেকেন্ড, ওটা আসলে কথা বলার ভঙ্গি। রাবেয়া ফিরে এসে নিজের কাপে চা ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞাসা করেছিলো আমি আরও একটু চা নেব কিনা। উত্তর দেবার সময় পাওয়া যায় নি। সে ধরে নিয়েছিলো আমার দিক থেকে আরেক কাপ বাড়তি চায়ের ব্যাপারে আপত্তি থাকবে না। রাবেয়া হেসে ওঠে।
বাবুর্চি আজকাল বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছে। এখন ওকে আগের চেয়ে অনেক বেশি বোঝাতে হয় বোধহয় বুড়িয়ে যাচ্ছে।
ছাড়িয়ে দাও না হয়! বাবুর্চিকেও যদি রান্নাবান্নার বুদ্ধি ধার দিতে হয় তোমার তাহলে বিশ্ব সংসারের জন্যে কী রাখছো?
কথায় হয়তো প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ ছিলো। রাবেয়া আমার মুখের দিকে সোজাসুজি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলে, এ বাবুর্চি থাকবে। যতদিন তার খুশি।
পোর্টিকো পর্যন্ত এগিয়ে দেয় রাবেয়া। গাড়িতে ওঠার সময় আমাকে চমকে দিয়ে বলেছিলো, একটু আগে সময় করে চলে এসো। হ্যাঁ?
আচ্ছা।
আপিসের দিকে যেতে যেতে ভাবছিলাম। রাবেয়ার ইচ্ছাই জয়ী হলো।
.
আপিসে বসেও নিজেকে কেমন প্রতারিত মনে হতে থাকে। সারাদিন ধরে ভেতরে ভেতরে তীব্র তুখোড় বাদানুবাদ চলছে। আর এই অস্থিরতার সাথে পাল্লা দিতে হয় বলে আপিসের কাজকর্ম দিন দিন আরও যেন বেশি করে ভালো লাগছে।
।আবার টেলিফোন!
এবারে ক্রিস্টোফার হেনিংস। স্বভাবসুলভ মিষ্টি গলায় বুড়ো বলেন, তোমার সাথে একটু কথা ছিলো তারেক। কামরায় আসবে একটু?
এক্ষুণি পৌঁছে যাব।
হেনিংস-এর ঘর একতলা নিচে।
বেরুবার সময় স্টেনোগ্রাফার গোমেজকে বলে গেলাম ব্যাগ গাড়িতে তুলে দেয়ার জন্য।
রাবেয়াকে কথা দিয়েছি। বুড়োর ওখান হয়ে সোজা বাড়ি চলে যাবো।
সিঁড়ির দিকে এগুবার সময় মাঝবয়েসি গোমেজের করুণ মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বেশ কিছুদিন থেকে কাজে কর্মে সে আর তেমন উৎসাহ বোধ করে না। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে বলে আজকাল খুব মনমরা হয়ে থাকে। আমাকে সে প্রাণভরে ভালোবাসে। সমীহ করে সেও মোটামুটি বলতে গেলে প্রাণের মনে। হয়তো একারণেই সে বোঝে আমি দীর্ঘদিন ধরে বিপদাপন্ন হয়ে রয়েছি। আপিসের কাজ নিয়ে আতিশয্য গোমেজের চোখ এড়ায়নি।
বুড়ো হেনিংস-এর অভ্যর্থনার ধরনটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও আন্তরিক। কেবলমাত্র ভালোভাবে রপ্ত করা কায়দা কেতা নয়। ফলে তার সঙ্গ ভালো লাগে।
বুড়ো তার একমাত্র ছেলের কথা দিয়ে শুরু করেন। আজকে সকালের ডাকে একটি চিঠি পেয়েছেন। আর্নেস্ট যোহানেস হেনিস কঙ্গোতে চলে যায় মাত্র বাইশ বছর বয়সে। পুরোহিতের জোব্বা গায়ে চড়িয়ে। সাপ খোপ, হিংস্র জানোয়ার, দুঃসহ গরম বা সভ্যতার নিচুস্তরে লোকদের বর্বর আচার আচরণ কোনোকিছুই তাকে দমাতে পারে নি। ওদেশের পাহাড়ে জঙ্গলে বা অনাব্য নদীর তীরে সুদীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে যিশুরও তার ইয়ত্তা মঙ্গলময় ঈশ্বরের বাণী প্রচার করছে। তার একান্ত চেষ্টার ফলে মানুষখেকোরা পর্যন্ত ঈশ্বর-অনুসারী ও যিশু-ভক্ত হয়ে উঠছে। কঙ্গোর নানা জায়গায় ঈশ্বরের নামে তারা সঙঘবদ্ধ হচ্ছে।
