কিন্তু দিন দিন আমি আরো অসুখি হয়ে উঠছি। ঘুম ভাঙবার পর সকালে মনে হয় প্রাণটা গলার কাছাকাছি এসে আটকে আছে। দুপুর হবার আগেই দিশেহারা লাগে। বিকেলে এমন অসুস্থ ও অপারগ ঠেকে সে শরীরের বাঁধন আলগা হয়ে আসে। ব্যক্তিগত দুর্দশার রূপটা যতো ভয়াবহই হোক না কেন তার জন্যে বন্ধুদের দায়ি করার কথা কখনো ভাবি নি। অপরিসীম দায়িত্ববোধের তাড়নায় তারা আমাকে যেসব খবরাখবর শুনিয়েছেন তাকে গুজব মনে করবার কোনো কারণ খুঁজে পাই নি। অবশ্য একথা ঠিক যে অন্য দশটা পাঁচটা ব্যাপারে বিচারবুদ্ধিকে যেরূপ স্বাধীন ও নিরাসক্তভাবে প্রয়োগ করা হয়, বন্ধুদের খবরখবরগুলোকে সেভাবে কখনো ধরা হয় নি। কাণ্ডজ্ঞানহীন গুজবরটনাকারী বন্ধুদের সম্পর্কে এসব ভাবা চলে তখনি যখন মনে সাহস থাকে, আর সাহস থাকলে অনেক কিছুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা যায়। কেন যে আমার মনে তেমন জোর নেই। সাহস নেই। থাকলে এই অসুবিধেয় পড়তে হতো না। না শরীরের দিক থেকে, না মনের দিক থেকে। হয়তো সরাসরি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছুনো যেতো। তাহলে কোথাও আর গোলমেলে কিছু থাকতো না।
গুজব ছড়ানোর জন্য দায়ি বন্ধুদের ঘৃণা করতে পারতাম, বিড়ম্বনার বোঝ হালকা করার জন্যে এসব বন্ধুদের বলা যেতো, এসব কাজ ভদ্রলোকের সাজে না, বুঝলে? আর তোমরা তো আমার বন্ধুজন।
গত তিন বছরের ভেতর এ ধরনের কোনো কাজ একবারের জন্যও পেরে উঠি নি। বন্ধুরা এসেছে, যেমনি তারা আসতো, দেখতে, কথা বলতে। তারা দেখেছে, আমি ভেতর থেকে নোনাধরা ইমারতের মতো ধ্বসে যাচ্ছি, এমনি বাইরের চুন, পলেস্তারাও আর আগের মতো নেই। খসে পড়ছে। লক্ষ করেছি, আমাকে নিয়ে তাদের যে উৎসাহ তা কিন্তু কমে নি।
একেক সময়, বিশেষ করে দুপুরের দিকে যখন আমার দিশেহারা লাগে, ভেবেছি, রাবেয়াকে ডেকে নিয়ে সব কথা খুলে বলি। সরাসরি জিজ্ঞাসা করি। এভাবে যে আর চলে না, আমি আর পারছিনে।
কিন্তু ওই পর্যন্তই।
রাবেয়াকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হয় না। নিজের এই অদ্ভুত দ্বন্দ্বের কথা মাথার ভেতর পাক খেতে থাকে যতক্ষণ না আমি একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমার সব উদ্যোগকে সম্ভাবনাহীন দেখায়। আমি লজ্জিতবোধ না করে পারিনে। এমন ভাবনার পর কিছু সময় পর্যন্ত রাবেয়ার কথা মনে পড়লেও আমি কেমন সংকুচিত হয়ে পড়ি। ভয় হয়, চোখমুখ দেখে রাবেয়া আমার মনোভাব বুঝে ফেলবে।
রাবেয়া বুদ্ধিমতী, তার চেয়েও বড় কথা সে আমার স্ত্রী। কারণে অকারণে বিচিত্রবর্ণ আলো আমার মনের মধ্যে কখন হাট বসায় রাবেয়া তা জানে। যে সব ছায়ার গরে জীবনের সব অমঙ্গল লুকিয়ে থাকে তাদের সাথে তার পরিচয় আরও নিবিড় বলে আশ্চর্য নিপুণতার সাথে সে তাদের শত্রু হিসেবে চিরদিনের জন্যে চিহ্নিত করে রেখেছে। তার সতর্ক চোখকে ফাঁকি দিয়ে অশুভ কোনো কিছু আমার ত্রিসীমানায় ঢুকে পড়বে এ আশংকা রাবেয়া করে না। এমন যার আত্মবিশ্বাস শেষকালে পা হড়কালো তার? কিন্তু চোখের সামনে এ কার ছায়া!
চাপরাশি সুবিদালী। ইতস্তত করছে। বিরক্ত হয়ে বল্লাম, কী চাও?
বেগম সাহেবা বলেছিলেন এয়ার ফ্রেসনার নিয়ে যেতে।
কেনা হয়েছে?
না।
কেন?
আমেরিকান ফ্রেসনার এখন বাজারে নেই। জার্মানির তৈরি ওটা নেয়া কি ঠিক হবে?
হ্যাঁ হবে।
সুবিদালী নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
এই মুহূর্তে রাবেয়ার ওপর ভয়ানক রাগ হয়। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তিনটে বেজে দশ মিনিট।
যদি সে আর আমাকে ভালো না বাসে তবে সে কথা জানালেই পারে। আমার জন্যে তা যতোই মর্মান্তিক হোক না কেন, নতুন পরিস্থিতিতে আমার পৌরুষ যতই হেয় তোক না কেন, রাবেয়ার উচিত সেসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে খোলাখুলি আমাকে জানো যা তার জীবনসঙ্গী হিসেবে আমি বাতিল হয়ে গেছি। এবং সে আমার চেয়ে যোগ্যর একজনকে খুঁজে পেয়েছে।
কিন্তু রাবেয়া মুখ ফুটে আজ অবধি কিছু বলে নি। আমার পক্ষেও জিজ্ঞাসা করা হয়ে উঠলো না।
রাবেয়া এবং আমার ভেত্র ব্যবধান বাড়ছে। অবশ্য এতে তার কোনো হাত আছে। বলে মনে হয় না। এ অনেকটা স্বেচ্ছা নির্বাসনের মতো। আমার একার কাজ। যেমনি ছিলো তেমনি আছে সে। তার ব্যবহারে কোথাও কোনো জড়তা নেই, দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই।
কখনো কখনো আমার ব্যবহারে অদ্ভুত কোনো কিছু ধরা পড়লে, রাবেয়া অনায়াসে আমার খুব কাছাকাছি চলে আসে। হাসিখুশি মুখে পলকের জন্যে ছায়া পড়ে। কিন্তু আমার মতো আতংকে সে ব্যব্যিস্ত হয় না। কিছু একটা যে ভাববার চেষ্টা করে না তা নয়। তবে সে কয়েক মুহূর্তের জন্যে—মনে হয় অবলম্বনহীন হয়ে ওর ভাবনা দাঁড়াতে পারে না। একটু ছটফট করে, একটু চঞ্চল হয়, তারপর সে নিজের স্বভাবে এবং উচ্ছলতায় মুক্তি পায়।
সেই হাসিখুশি মুখ।
অনর্গল কথার ঠাস বুনুনি।
সবচেয়ে উঁচু আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে সে আমার মুখোমুখি দাঁড়ায়, স্বচ্ছ, সুন্দর এবং জীবন্ত।
আমার মন যে কুটিল সন্দেহে বেঁকেচুরে কদাকার হয়ে আছে, সারাক্ষণ ধরে বিষিয়ে আছে, রাবেয়া সে কথা বুঝতে পারে না। মরিয়া হয়ে ভাবি, হয়তোবা না বোঝার ভান করে।
আর তো দেরি করা যায় না। ইতিমধ্যে টেলিফোন তিনবার বেজেছে। রিসিভার তুলে নিই, হ্যালো।
ওধারে স্টানলি মুরার। শুরু করেছিলো গিল্ট সিকিউরিটি দিয়ে। আসল কথা অবশ্য তা নয়। ডিবেচারের প্রস্তাবনা নিয়ে সে হিমশিম খাচ্ছে। এ ব্যাপারে মুরার বিশেষজ্ঞ। তার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না কোনোদিন।
