দুবার ডাকতেই রকিব উঠে পড়ল। ঘুমটা তার গভীর ছিল না। সে বিছানায় উঠে বসলে শামীমা চলে গেল রান্নাঘরে। এখন এক কাপ চা লাগবে রকিবের। চা খেয়ে সে বাথরুমে যাবে, তারপর কাজ করতে বসবে। কাজ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য হয় তবে তাকে আরও এক কাপ চা দিতে হবে। রকিবের এই অভ্যাসটা খুব বাজে। চায়ের নেশা তার অতিরিক্ত। এর কিছু ছোঁয়া শামীমারও লেগেছে। বিয়ের আগে সে। চা খেত দিনে দুকাপ, কদাচিৎ সেটা তিন কাপ হয়েছে। এখন দিনে ৫/৬ কাপ হয়ে যাওয়াটা কোন ব্যাপার নয়। এর বেশিও হয়। তবে এতে দেখুন অসুবিধা হয় না। আগে যেমন বিকালের পর চা খেলে সে জানত রাতের গুমটা নির্ঘাত হারাম। এখন। রাতে যদি নি কাপ চাও সে খায়, ঘুমের সমস্যা হয় না। রাতে চা খাওয়ার অভ্যাস অবশ্য একা থাকতে থাকতে। মাসের মধ্যে অনেক দিন রকিব ঢাকার বাইরেই থাকে। ওই দিনগুলোতে, দিনগুলোতে মানে রাতে, শামীমার কিছুই করার নেই। তার শ্বশুর থাকে তাদের সঙ্গে। খুব নিরিবিলি নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ একা থাকতেই পছন্দ করেন। শ্বশুরের বইপত্রর অনেক, তার ব্যস্ততা ও বইপত্রের সঙ্গেই। শামীমা মাঝে মাঝে তার সঙ্গে গিয়ে গল্প করে। বিশেষ করে রকিব ঢাকায় না থাকলে, সন্ধ্যায় কিংবা তার কিছু পর পর শামীমার খুব একা একা লাগে। সে তখন শ্বশুরের সঙ্গে গল্প করে কিছু সময় পার করতে চায়। কিন্তু ওর খুব কম কথা বলেন, খুবই ভাল মানুষ তিনি, শামীমাকে তিনি পছন্দও করেন খুব, কিন্তু বেশি কথা বলায় তিনি অভ্যস্ত নন। শামীমাও একা একা কত আর চালিয়ে যায়, সে এক সময় উঠে আসে। তারপর সময় অবশ্য কোন না কোনভাবে কেটেই যাবে। সে এটা-ওটা করে, বারান্দায় বসে থাকে, টেলিফোনে এর-ওর সঙ্গে কথা বলে, রান্নার লোক আছে, কাল ন’টার দিকে এসে বিকাল পাঁচটায় যায়, সুতরাং খাওয়ার সময় একটু গরম করে নেয়া ছাড়া ওই দায়িত্বও পালন করতে হয় না। রান্না করতে হলে সময় পার করায় কিছু সুবিধাই হতো বইকী, সে যাক, নানাভাবে সময় কেটেই যায়। বিয়ের পর থেকেই এ রকম, সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আর একেবারেই কিছু করার না থাকলে সে ছোট ছোট চুমুক দিয়ে অনেক সময় নিয়ে চা খায়, চা খায় আর টেলিভিশনের চ্যানেল বদলায়। ঘুমের সমস্যা তার হয় বইকী। মাঝে মাঝে হয়, সে এক বিছানায় ছটফট করে। তবে সেটা বেশি বেশি চা খাওয়ার জন্য নয়, সেটা অন্য কারণে।
ঘণ্টা দুয়েক পর কাজ শেষ করে উঠল রকিব। বিকট একটা শব্দ করল। কতক্ষণ হাত-পা ছুড়ল, তারপর বলল, নাস্তা দাও।
নাস্তা রেডিই আছে, রান্নার মেয়েটাকে বললে সে টেবিলে নাস্তা এনে দিল পাঁচ মিনিটের মধ্যে। এখন তারা দু’জনই বসবে। শ্বশুর খেয়ে নেন বেশ আগেই। তারপর বেরিয়ে পড়েন, শামীমা জিজ্ঞেস করে জেনেছে তিনি একেক দিন একেক বন্ধুর বাসায় বা অফিসে যান। শামীমা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল বাবা, বন্ধুর বাসায় গিয়ে আপনি কী করেন?
শশুর প্রথমে বুঝতে পারেননি কী করি মানে?
সেটাই আমি জানতে চাচ্ছি কী করেন?
কেন, গল্প করি!
আপনি গল্প করেন! আমার মনে হয় না।
শ্বশুর শামীমার কথার অর্থ বুঝতে পেরে হাসতে আরম্ভ করেছিলেন।
কাজের মেয়েটির টেবিলে নাস্তা সাজানো শেষ হলে শামীমা ডাকল রকিবকে—এসো।
রকিব এসে বসল, একবার তাকাল শামীমার দিকে মুচকি হাসল—তোমাকে এই সকালবেলা বেশ সেক্সি দ্যাখাচ্ছে!
শুনে খুশিতে আটখানা হয়ে গেলাম।…আবার কবে যাচ্ছ ট্যুরে?
কবে যাচ্ছি মানে? এই তো মাত্র ফিরলাম।
সে জন্যই তো জানতে চাচ্ছি। আগে থেকে এবার তবে একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকবে। রকিব হাসতে আরম্ভ করল।
হাসবে না। শামীমা গম্ভীর গলায় বলল। তোমার এ ধরনের হাসি দেখলে আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়।
তাও ভালো শরীর গরম হয় না।
তা বটে, রকিব মাথা ঝাঁকাল। এটা আমি স্বীকার করছি। কিন্তু কী করব বলো? আমার চাকরিটাই যে এ ধরনের। আমার নিজেরও কি খারাপ লাগে না, অসুবিধা হয় না!
কে জানে তোমার কি হয়।…আমার মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে।
কী রকম অসহ্য বলো তো? রকিব নিপাট ভদ্রলোকের মতো জানতে চাইল।
শামীমা মুখে কিছু বলল না, সে ভাবলকী রকিব অসহ্য তুমি কি সেটা জানো রকিব? তুমি যতই ইয়ার্কির ঢঙে কথা বলো না কেন, কী রকম অসহ্য সেটা তুমি জানো। আর বিয়ের দু’বছরের অধিকাংশ দিন যার একা কেটেছে, তার মাঝে মাঝে অসহ্য লাগবে না তো কী লাগবে! এ কথা অবশ্য তোমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ রকম ভাবতে ভাবতে শামীমা রকিবের দিকে তাকাল।
রকিব বলল, তোমার তাকানোটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তোমার দু’চোখে রাগ না ভালবাসা?
দূরে থাকতে থাকতে তোমার এমনই অবস্থা, আমার দুচোখে রাগ না ভালবাসা, এটাও তুমি আর বুঝতে পার না।
আচ্ছা আচ্ছা, তোমার দু’চোখে তা হলে রাগ কিংবা ভালোবাসা কিছুই নেই। তুমি বোধ হয় কিছু বলবে আমাকে। কী বলবে?
শামীমার একবার ইচ্ছা হলো, হত রাতের স্বপ্নের কথা বলবে সে। বলবে কাল রাতে স্বপ্নের ভিতর ওটা হয়ে গেছে। শুনে রকিব হয়তো অবাক হবে না, কিন্তু সে
অবাক হওয়ার ভান করবে—আবার?
শামীমা ভাবল, রকিব অবাক হলে সে তখন বলবে—অবাক হচ্ছে কেন! তুমিই তো বলেছ—এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
তা বটে। খুব স্বাভাবিক।…কিন্তু তুমি মনে হচ্ছে একটু লজ্জা পাচ্ছ।
