.
সমুদ্র মেঘলা হোটেলের তিন তলায় যে ঘরে জয়ন্ত তনিমা দুরাত কাটিয়েছে, সেটা হোটেলের অন্যতম সেরা ঘর। সমুদ্রমুখী ঘর। সমুদ্রের দিকে সুন্দর ঝুলবারান্দা। আছে। বারান্দা ছোটো, কিন্তু চওড়া। তিনশো সাত নম্বর ঘরে এই বারান্দায় নোনা, গরম বাতাসের মওতায় ব্যতিব্যস্ত হতে হয় না। ঢেউয়ের গর্জনও ছন্দোময় জলস্রোতের মতো লাগে। আধ ঘন্টা হল বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছে তনিমা। সিগারেট কিনতে বেরিয়েছে জয়ন্ত। হোটেলের কোনও কর্মীকে পাঠাতে পারত। তা না করে নিজে বেরিয়েছে। তনিমাকে সঙ্গে যাবার জন্যে ডেকেছিল। তনিমা যায়নি। কেন গেল না? কাল ভোরে সমুদ্রের ধারে পাথরের ওপর আত্মঘাতী সেই ছেলেটিকে দেখার পর থেকে জয়ন্ত গুম। হয়ে গেছে। সারাদিন বিশেষ কথা বলেনি। সমুদ্রে স্নান করতে ছেলেমানুষের মতো যার উৎসাহ, সে সমুদ্রে নামেনি। হোটেলের ঘরে দুপুর পর্যন্ত বোবার মতো বসেছিল। সন্ধের পর বেড়াতে বেরিয়েও সমুদ্রের দিকে যায়নি। সাইকেল রিকশা ভাড়া করে তনিমাকে নিয়ে কপালকুণ্ডলার মন্দিরে গিয়েছিল। ঈশ্বর, দেবদেবীতে জয়ন্তর বিশ্বাস নেই। স্ত্রীকে খুশি রাখতে, হয়তো বা সময় কাটাতে, সে মন্দিরে যাচ্ছে, তনিমার বুঝতে অসুবিধে হয়নি। অল্পবয়সী, সুশ্রী মৃত তরুণটিকে দেখে তনিমাও প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়েছিল। তারও কথা বলার ইচ্ছে মরে গিয়েছিল। রিকশায় বসে জয়ন্ত প্রশ্ন করেছিল, ছেলেটা আত্মহত্যা করল কেন? আমার মতো কোনও অসুখ বোধহয় ওর হয়েছিল।
কী বলছো তুমি?
জন্মগ্রহণ, জন্মদানের ভয়জনিত অসুখ। আবছা অন্ধকার, নির্জন রাস্তায় জয়ন্তর কাঁধে মুখ রেখে তনিমা ডুকরে উঠেছিল, চুপ করো, তুমি চুপ করো। তোমরা কোন অসুখ। নেই। ফাঁকা রাস্তায় তনিমার কান্নাভেজা গলা শুনে রিকশাচালক নিমেষের জন্যে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিল। জয়ন্ত আর কথা বলেনি। হোটেলে ফিরেও জয়দ্র আচ্ছন্নতা কাটেনি। হয়ত ইচ্ছে করেই আচ্ছন্নতার মধ্যে সে থাকতে চেয়েছিল। আরও একটা রাত নিষ্ফল হয়ে যাচ্ছে, অনুমান করেও তনিমা চুপ করে থেকেছে। আসলে ভেতর থেকে সে-ও কোনও তাগিদ বোধ করছিল না। অন্ধকার ঘরে ধবধবে সাদা চাদর পাতা নরম বিছনায়া পাশাপাশি পুতুলের মতো দু-জন শুয়েছিল। কিছুক্ষণ উসখুস করে তনিমা ঘুমিয়ে পড়েছিল। জয়ন্তর আগেই ঘুমে ডুবে গিয়েছিল সে। জ্যোৎস্নায় তখন অসাড় হয়েছিল বুদ্ধপূর্ণিমার রাত।
জয় দেরিতে উতলা হলেও বারান্দা ছেড়ে তনিমা নড়ল না। গতকালের বিষণ্ণতা, অবসাদ আজ কেটে গেছে। পরমাত্মীয়র বিয়োগে যেখানে শোক সন্তাপের আয়ু সাত, দশদিনের বেশি হয় না, সেখানে অচেনা একাট ছেলের মৃত্যুতে বিশ, বাইশ ঘণ্টা শোকার্ত থাকা কম কথা নয়। তনিমাও কাল গোটা দিন শোকাচ্ছন্ন ছিল আজ সকাল থেকে সে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। অস্থির প্রত্যাশায় ছটফট করছে। দীঘার মাত্র দুরাত অবশিষ্ট আছে। হিসেব মতো এ দুটো রাত নিদারুণ ফলপ্রসু। এই দুরাতের মধ্যে ফয়সালা না করলে মাতৃত্বের জন্যে তার আকাঙক্ষা হয়তো এ জীবনের মতো খারিজ হয়ে যাবে। সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে সে তাই রাতের জন্যে প্রতীক্ষা করছে। সরাসরি, গোপনে বারবার জয়ন্তকে দেখে তার মনের হদিশ পেতে চেয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টায় জয়ন্তও অনেক স্বাভাবিক হয়েছে। বিবর্ণ মুখে শুরু হয়েছে রক্ত চলাচল। অল্পস্বল্প ঠাট্টাইয়ার্কিও করেছে। সবচেয়ে বড়োকথা দুপুরে দেড়, দু-ঘণ্টা সমুদ্রে থেকেছে। মাতামাতি করে স্নান করেছে।
বারান্দায় রেলিং-এ ভর দিয়ে তনিমা আকাশের দিকে তাকালো। সন্ধের শুরুতেই প্রায় মাঝসমুদ্র থেকে ভেসে উঠেছিল বিশাল উঁদ। চাঁদ এখন আকাশের চুড়োয়। সমুদ্রের জলে, ছোটো বড়ো ঢেউয়ের মাথায় গুঁড়োগুড়ো হয়ে যাচ্ছে চাঁদের আলো। নির্জন বালিয়াড়ি। ঝাউবনে বাতাস বইছে। ঝাউবনের গা ঘেঁসে শহরের রাস্তা। রাস্তার ধারে অনেক নতুন বাড়ি হয়েছে একাধিক হোটেলও আছে। সিগারেটের দোকান দুরে নয়। এতক্ষণে জয়ন্ত্র ফিরে আসা উচিত ছিল। তনিমার অশান্তি হচ্ছে। আরও পাঁচ, সাত মিনিট পরে বাজারের দিক থেকে জয়ন্তকে আসতে দেখল তনিমা। সিগারেট টানতে টানতে দুলকি চালে হেঁটে আসছে। কোনও ব্যস্ততা নেই। হোটেলে আধ ঘণ্টার বেশি তনিমা একা রয়েছে, সে যেন ভুলে গেছে। তনিমা একটু ক্ষুণ্ণ হল। হোটেলে ঢোকার আগে। বারান্দার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়ল জয়ন্ত। হাতছানি দিয়ে তাকে আসতে বলল তনিমা।
ডাক্তার পরিতোষ গুপ্তের ছেলে সায়ন্তনের ডাক নাম সানু। বাইশ তেইশ বছর বয়স। সুঠাম শরীর, ফর্সা রঙ, কাটাকাটা তীক্ষ্ণ নাক, চোখ সত্যিকার রূপবান যুবক। পরিতোষ ডাক্তার তনিমাদের প্রতিবেশী। জয়ন্তদের গৃহ-চিকিৎসক। অসুস্থ জীবনলালের চিকিৎসা পরিতোষই করে। পরিতোষের একমাত্র ছেলে সানু। বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়ে। তনিমাকে বৌদি বলে ডাকে। রাস্তায় দোকানে বাজারে দেখা হলে খাতির করে। দীঘার সমুদ্রতীরে হোটলের নিভৃত ঘরে এইরাতে হঠাৎ সানুর নাম জয়ন্ত কেন তুলল, তনিমা বুঝতে পারল না। জবাব শুনতে জয়ন্ত তাকিয়ে আছে দেখে তনিমা বলল, সানু খুব ভালো ছেলে। লেখাপড়ায় ভালো, বিনয়ী। সানুর প্রশংসা করার জন্যে যথাযথ শব্দের জন্যে তনিমাকে হাতড়াতে দেখে জয়ন্ত বলল, সানু স্মাগলার। বিদেশের সঙ্গে চোরাই লেনদেনের কারবারে সে আড়কাঠি। ব্যারাকপুর, চন্দননগর, ডায়মণ্ডহারবারে কয়েকদিনের জন্যে বেড়াতে যাবার কথা বাড়িতে বলে প্রায়ই সিঙ্গাপুর, হংকং যায়। দুর্ধর্ষ কিছু ক্রিমিনালের সঙ্গে তার যোগাযোগ।
