প্রশ্ন শুনে তনিমা চমকে গেল। মাঝরাতে সমুদ্রের গর্জন, বাতাসের নিবিড় আবেষ্টনের মধ্যে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন সে আশা করেনি। তার মা কাবেরী বছর খানেক শয্যাশায়ী। কাবেরী পঞ্চাশ পেরোয়নি। কিছুদিন আগেও অসামান্য সুন্দরী ছিল। বস্ত্র দুই তিনের মধ্যে শরীরটা ভেঙে গেল। মেয়েলি রোগে কোমরের তলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত পক্ষাঘাত ধরল। কুকুচে কালো পিঠছাপানো ঘন, লম্বা চুল শরে নুড়ির মতো সাদা হয়ে গেল। পঞ্চাশ বছর বয়সেই তাকে দেখে সত্তরে বুড়ি মনে হয়। শয্যাশায়ী কাব্বেীর দিকে তাকাতে জয়ন্তর ভয় করে। পারতপক্ষে শাশুড়ির ঘরে সে ঢোকে না। কাবেরীর দিকে তাকালে তার মনে হয় ভবিষ্যরে তনিমাকে দেখছে। তার অজ্ঞাত্মা পর্যন্ত কুঁকড়ে যায়। তবু তনিমার চাপে অসুস্থ কাব্বেীর সঙ্গে দেখা করতে বাধ্য হয়। তাছাড়া ভদ্রতাও আছে। কাস্ত্রেীর জন্যে তনিমার মনোকষ্ট জয়ন্ত জানে। মায়ের দিকে তাকালে কষ্টে টনটন করে তার বুক। চোখে জল এসে যায়। ফুলের মতো ফুটফুটে দুবেণী বাঁধা কাবেরীর কুমারী জীবনের কিছু ছবি অ্যালবামে আছে। কাবেরী তখন কলেজের ছাত্রী। কলেজে পড়া মেয়েটি ধীরে ধীরে যুবতী, নারী, স্ত্রী, মা হবার প্রতিটি পর্যায়ে অ্যালবামে আবদ্ধ। আছে। মাত্র ত্রিশ, পঁয়ত্রিশ বছরে শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল প্রাণোচ্ছল, তাজা একটা জীবন। ভাবলে নৈরাশ্যে তনিমার মাথা ঝিমঝিম করে। জীবনটা অর্থহীন মনে হয়। তবে মনের এই অবস্থা বেশিক্ষণ থাকে না। বিষাদ, দুঃখ, হতাশার চেয়ে বাস্তব জীবনের দাবি বড়ো হয়ে ওঠে। সেখানে শোক, সুখ, হতাশা, উদ্দীপনা পাশপাশি থাকে। শোক, দুঃখ ছিন্ন করে জেগে ওঠে সখ, সাধ, তৃপ্তি। পঙ্গু, অসুস্থ মাকে ছেড়ে তাই স্বামীর সঙ্গ সুখ উপভোগ করতে তনিমার অস্বস্তি হয় না। অনায়াসে সমুদ্রের ধারে প্রমোদভ্রমণে যেতে পারে।
জীবনের সুখী, অপ্রিয়, অন্ধকার দিকটা মাঝরাতে জয়ন্ত কেন স্মরণ করাচ্ছে তনিমা বুঝতে পারলো না, শব্দহীন তনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত বলল, শুধু তোমার মা কেন, আমার বাবার দিকে তাকিয়েও ভয়ে আমার সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। মনে মনে তার মৃত্য কামনা করলেও মুখে বলতে পারি না।
কথাটা শুনে শিউরে উঠল তনিমা। অপ্রকৃতিস্থ জীবনলালের মুখটা মনে পড়ল। জয় বাবা জীবনলাল ছিল নামকরা মুষ্টিযোদ্ধা। বউবাজার ক্লাবের পক্ষ থেকে পর দুবছর রাজ্যসেরা মুষ্টিযোদ্ধা হয়েছিল। দশাসই স্বাস্থ্য ছিল। সেতার বাজাত চমৎকার। বছর পাঁচ আগে অফিসের মধ্যে মাথার রক্তক্ষরণে বেহুশ হয়ে গেল। জ্ঞান যখন ফিরল, তখন উন্মাদ। পাগলামি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মাঝে মাঝে জীবনলালকে ঘরে তালা দিয়ে রাখতে হয়। তখন সে পোশাক পর্যন্ত পরে না। সংসারের ওপর অবাঞ্ছিত, গুরুভার পাহাড়ের মতো চেপে থাকা জীবনলালের হাত থেকে বাড়ির প্রায় সবাই মুক্তি পেতে চায়। ননীবালা একমাত্র জীবনলালের মৃত্যু কামনা করে না। নিজে যতোদিন বেঁচে আছে, রুগ্ন, পাগল সন্তানকে আগলে রাখতে চায়। জয়ন্ত জানে, মা-বেঁচে থাকলে স্বামীকে আগলে রাখত। জীবনলাল অসুস্থ হবার বছরখানেক আগেই মারা গিয়েছিল দ্বাণী। জীবনলালের স্ত্রী, জয়ন্ত, পুতুলের মা, দ্বাণীর মরার বয়স হয়নি। মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে তিদিনের জ্বরে পৃথিবী ছেড়ে বাণী চলে গেল। চাপা গলায় জয়ন্ত বলল, আমি জন্মাতে চাইনি। যারা আমাকে পৃথিবীতে এনেছে, তাদের দশা দেখে আমি ভয় পেয়ে গেছি। আমারও তাই দশা হবে। এত কষ্টের মধ্যে আরও একজনকে কেন টেনে আব্ব? আমার মতো আর একজন হতভাগ্যের জন্মের জন্যে দায়ী হতে চাই না।
জয়ন্তর কথা শুনে তনিমা পাথর হয়ে গেছে। জয়ন্ত বলল, অনেক রাত হয়েছে শুয়ে পড়ো।
তনিমার ঘুম ছুটে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে জানলার বাইরে সে তাকাল। ফুটফুটে চাঁদের আলোয় পৃথিবী গলে গলে পড়ছে। সমুদ্র গর্জনের কামাই নেই। নোনা বাতাসে চটচটে, ভারী লাগছে শরীর। ক্লান্তি, অবসাদে তনিমা এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙলো জজয়স্তর ডাকে। চোখ কচলে তাকিয়ে দেখল তখনও সকাল হয়নি। পৃথিবীকে জড়িয়ে আছে আবছা অন্ধকার। জয়ন্ত বলল, চলো, সূর্যোদয় দেখি। দু-চোখে ঘুম লেপ্টে থাকলেও তনিমা উঠে বসলো। পাষাক বদলে দুজনে যখন হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়ালো, তখনও দীঘা ঘুমোচ্ছে। রাস্তায় সামান্য কিছু মানুষ। সূর্যোদয় দেখতে তারাও সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তাদের মুখ-চোখে ৱিক্তির ছাপ, সূর্যোদয়। দেখে তাদের বিরক্তি কেটে গেলে সূর্যের সম্মান বাঁচবে। রাস্তা ছেড়ে জয়ন্ত, তনিমা। ঝাউবনের দিকে এগিয়ে গেল। ঝাউবন টপকে সমুদ্রের নির্জন তীর ধরে দক্ষিণ দিকে তারা হেঁটে যাচ্ছে। বালির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে কয়েকটা জেলে ডিঙি। দুটো ডিঙিতে আলকারা মাখানো হয়েছে। সমুদ্রের গর্জন বাতাসের বেগ ঈষৎ কমতে আঁশটে গন্ধ পেল তনিমা। বালিয়াড়ি ছেড়ে পিচের সরু পথ বাজারের দিকে চলে গেছে। পথের তলায়, সমুদ্র ঘেঁসে পাথরের বড়ো বড়ো বোল্ডার। কুচকুচে কালো রঙ। ঢেউয়ের ধাক্কায় কিছু পাথরের প্রান্ত যেমন ধারালো হয়েছে, তেমনি কিছু চৌকোনা পাথর মৃসণ, সমতল শয্যার মতো পড়ে আছে। মৃদু আলো ফুটলেও মেঘলা আকাশ। পুব আকাশ সামান্য লালচে হয়েছে। লালের আভার পাশেই দলা পাকিয়ে আছে ঘন কালো মেঘ। আকাশ এরকম থাকলে আজ হয়তো ভালো করে সূর্যোদয় দেখা হবে না। কয়েক পা এগোতে পাথরটার ওপরে প্রথমে জয়ন্তর চোখ পড়ল। সিঙ্গল বিছানার সাইজের একটা কালো পাথরের মাঝখানে উবুড় হয়ে আধশোয়া এক তরুণ। ভঁজ করা দু-হাতে মুখ গুঁজে আছে। কুণ্ডলী পাকানো শোয়ার ভঙ্গি। কালো পাথর ঘিরে ভেঙে পড়েছে ঢেউ। পাথরটার কোমর পর্যন্ত জলে, ফেনায় ভিজে যাচ্ছে। জল সরে যাবা পরও সাদা ফেনা জড়িয়ে থাকছে পাথরের কোমর। হালকা নীল প্যান্ট তিন রঙা চেক শার্ট পরা তরুণটির বয়স পঁচিশ, ছাব্বিশের বেশি নয়। দু-এক বছর বেশি হতে পারে। জয়জ্ঞ মনে হল ছেলেটা তার সমবয়সী। কিন্তু এই পাথরের ওর ছেলেটা কেন ঘুমোচ্ছে? এমন বিদঘুঁটে, বিপদজ্জনক খেয়াল কেন হল? ঘুমের মধ্যে পাথর থেকে পড়ে গেলে দিকচিহ্নহীন সমুদ্রে ভেসে যাবে। কাল রাতে এই পাথরের ওপর বসে পূর্ণ চাঁদ জ্যোৎস্নার মায়াতে ছেলেটা হয়তো বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। তারপর কখন ঘুমে ডুবে গেছে, খেয়াল নেই। এখনও অসাড়ে ঘুমোচ্ছে। ছেলেটাকে জাগিয়ে দিতে পাথরটার দিকে এক পা এগিয়ে জয়ন্ত নিজেইপাথর হয়ে গেল। ছেলেটা স্থির, নিস্পন্দ। তারমাথার পাশে একটা কৌটো। কৌটটা ভোলা। কৌটোর ঢাকনা পাশে রয়েছে। ছেলেটা যে বিষ খেয়েছে, মুহূর্তে জয়ন্ত জেনে গেল। কালো পাথরটার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়েছিল তনিমা। ব্যাপারটা সে-ও বুঝতে পেরে জয় হাত চেপে ধরেছিল।
