কী বলছো?
দু-চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তনিমা আঁতকে উঠতে জয়ন্ত বলল, গত বছরে, দর্জিপাড়ায়, অন্তঃসত্ত্বা, অবিবাহিতা এক তরুণীকে খুনের ঘটনায় সানু জড়িত। স্বভাবে সে অপরাধী হয়ে গেছে।
জয়ন্তর কথা তনিমা অবিশ্বাস করতে পারছে না। অবিশ্বাসের কারণও নেই। জয়ন্ত আবার প্রশ্ন করল, মাধববাবুর মেয়ে কিঙ্কিণীকে চেন?
চিনি।
কতটা চেন?
ঠাণ্ডা, শান্ত স্বভাবের মেয়ে। দারুণ সুন্দরী, মহামায়া কলেজে পড়ে। খুব ভালো মেয়ে।
কীরকম?
অসুস্থ মায়ের যে শুশ্রূষা কিঙ্গিণী করে, তার তুলনা নেই।
কিঙ্গিণী যে দুপুরে ভাড়া খাটে, সে খবর কী জানো? মুখে অস্ফুট আওয়াজ করল তনিমা।
আমার বন্ধু ডাক্তার প্রবীর বোস, দুবার তার পেট সাফাই করেছে।
সমুদ্রের গর্জন, বাতাসের হাঁকডাক তনিমার মগজের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ছে। গলা শুকিয়ে গেছে তার। জয়ন্ত বলল, চারপাশে যত তরুণ, তরুণী দেখছো, সবাই দাগি হয়ে গেছে। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও বিষে দগদগ করছে তাদের শরীর। আঁস্তাকুড়ে, নর্দমায় ঘেয়ো কুকুরের মতো তার চরে বেড়াচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী বিলাস্বাবুর ছেলে ছিনতাই করার সময় ধরা পডে গণধোলাই-এ আধমরা হয়ে গিয়েছিল। এখন জেল খাটছে। মোহনবাবুর উনিশ বছরের মেয়ে, ভোজপুরের শ্রীধর গোয়ালার সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল। লজ্জায় গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলেন মোহনবাবুর স্ত্রী।
মুহূর্তের জন্যে থেমে স্থির চোখে তনিমার দিকে জয়ন্ত তাকিয়ে থাকল। পিঠের ওপর জ্যোৎস্না পড়ে তাকে ফঁপিয়ে তুলেছে। চলচ্চিত্রে আঁকা দশাসই পটের মতো দেখাচ্ছে তাকে। জয়ন্ত প্রশ্ন করল, আমাদের ছেলে অথবা মেয়ে হলে, সে কী করবে? কোন্ অন্ধকার, চোরা পথে সে হেঁটে যাবে?
প্রশ্ন শুনে গুড় গুড় করছে তনিমার বুক। কোনওমতে সে বলল, সুস্থ সুন্দর জীবনও সে যাপন করতে পারে।
সম্ভব নয়। সে ভাবে বাঁচার একটা পথও খোলা নেই। জঘন্যতম অপরাধীরা এই মুহূর্তে পৃথিবীতে জন্ম নিচ্ছে। তাদের একজনকে কেন ঘরে আনতে চাও?
আতঙ্কে, কষ্টে ফেটে যাচ্ছে তনিমার বুক। সে নিশ্চপ। জয়ন্ত আবার বলল, একদিকে তোমার মা, আমার বাবার মতো অসুস্থ, পঙ্গু, অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মর্মন্তুদ দিনযাপন, অন্যদিকে বিষধর সাপের বাচ্চার মতো তরুণ প্রজন্ম। আমরা কোনদিকে যাব?
নিস্তব্ধ হোটেল। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তনিমা হঠাৎ ডুকরে উঠল, আমার ভয় করছে। ভীষণ ভয়!
ভয় করারই কথা।
তুমি আমার পাশে এস।
তনিমার আর্ত ডাকে বিছানায় তার পাশে গিয়ে জয়ন্ত বসল। তনিমা ঠকঠক করে কাঁপছে। তার পিঠে জয়ন্ত হাত রাখলো। তনিমা প্রশ্ন করল, কেন আমাদের জন্ম, বেঁচে থাকা?
পৃথিবীকে নোংরা, দূষিত, নরক, করার জন্যে আমরা জন্মাই। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ তাই করছে, পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত করে যাবে।
দু-হাতে মুখ ঢেকে তনিমা ফুলে ফুলে কাঁদছে। পাথরে মূর্তির মতো জয়ন্ত বসে আছে। কয়েক মিনিট করে কান্নাভেজা গলায় তনিমা বলল, আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না।
আমারও।
কথাটা বলে জয়ন্ত যোগ করল, অনেকদিন আগেই আমার বাঁচার ইচ্ছে শেষ হয়ে গেছে। একমুহূর্ত তনিমার দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে জয়ন্ত একটা কৌটা বার করল। তনিমার নাকের কাছে কৌটোটা ধরে প্রশ্ন করল, চিনতে পার? আবছা আলোয় নিমেষহীন চোখে তিন, চার সেকেণ্ড কৌটাটা দেখে তনিমা শিউরে উঠল। কাল ভোরে সমুদ্রের ধারে, জলমগ্ন কালো পাথরের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ছেলেটার মাথার কাছে এই কৌটো সে দেখেছিল। ফিসফিস করে জয়ন্ত বলল, সিগারেট কিনতে গিয়ে পোকামারা বিষের এই কৌটোটাও কিনে ফেললাম। বিষ যা আছে, নির্ভেজাল হলে, আমাদের প্রয়োজন মিটে যাবে।
সাদা চাদর পাতা শ্রম বিছানা ঘিরে ঘন হয়েছে চাঁদের আলা। পরস্পরকে অনেকটা স্পষ্ট তারা দেখতে পাচ্ছে।
খাবে?
জয়ন্তর প্রশ্নে চমকে উঠে তারই শরীর ঘেঁসে নিবিড় হয়ে তনিমা বসল। জয়ন্তর হাতে বিষের কৌটো। সে বলল, অর্ধেক খেয়ে বাকিটা তোমাকে দিচ্ছি।
তার শরীরে সঙ্গে তনিমা লেপ্টে গেল। কৌটোর ঢাকা খুলে জয়ন্ত দেখল দ্বিতীয় একটা আবরণ রয়েছে। ছুরি দিয়ে সেটা কাটতে হবে। ট্রাউজার্সের পকেটে ছুরি আছে। ছুরিটা আনতে যাবার ইচ্ছে থাকলেও উঠতে পারল না। সে টের পেল তার সান্নিধ্যের তাপ তনিমার কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ছে। বিষ খেতে তনিমা রাজি হবে না। বাস্তবিক তাই। জয়ন্তকে আঁকড়ে ধরতেই তনিমার দুঃস্বপ্ন কেটে গেল। সমুদ্র গর্জনের ভেতরে সে শুনতে পেল, ছোটো বোন উমার দু-মাসের বাচ্চার হাসির আওয়াজ, সাতাত্তর বছরের ননীবালার স্নেহার কণ্ঠস্বর। জয়ন্তর হাত থেকে বিষের কৌটোটো নিয়ে সে বারান্দায় চলে গেল। শরীরের সব শক্তি জড়ো করে অন্ধকার ঝাউবনের দিকে কৌটোটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঘরে ফিরে জয়জ্ঞ গলা দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল, দীঘায় মাত্র আর দুরাত থাকছি। শস্যশালিনী হবার জন্যে পৃথিবী আর কত প্রতীক্ষা করবে!
প্রতিষেধক – আবু ইসহাক
কিতাব্বে কথা বলতে বলতে নানি লক্ষ্য করেন–নাতনি অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘কিরে আতিয়া’ তুই কিছু শুনছিস না?
হ্যাঁ শুনছি, তুমি বলে যাও। চমক ভেঙে আতিয়া বেগম বলেন।
হ্যাঁ, মন দিয়ে শোন। শুনলি তো? ঐ মেয়েলোকগুলোও তোর মতো প্রশ্ন করেছিল।
