তনিমা রাজি হয়েছিল। এমন একটা সাধারণ অনুরোধে রাজি না হবার কারণ ছিল। আনকোরা দাম্পত্যের মৌতাত জয়ন্তর মতো সে-ও উপভোগ করছিল। তার। উপভোগের তীব্রতা, আবেশ স্বামীর চেয়ে বেশি ছিল। তার ধারণা হয়েছিল, তৃতীয় এক অস্তিত্বকে সে সন্তান হলেও, এই মুহূর্তে যুগলজীবনের মাঝখানে জয়ন্ত আনতে চায় না। সাতাশ বছরে স্বামীর অতৃপ্ত বানার ইঙ্গিত বুঝতে তনিমার অসুবিধে হয়নি। আরও এক বছর যুগলে ঝাড়া হাত-পা থাকার জন্যে যা যা করা দরকার তনিমা করেছিল। কিন্তু দ্বতীয় বছর ফুরোবার আগেই তনিমা টের পেল, জয়জ্ঞ নিঃসন্তান থাকার ইচ্ছেটা, সে যা ভেবেছিল, ঠিক তত সহজ নয়। জয়ন্তকে বুঝতে তার ভুল হয়েছে। শুধু দায়হীন দাম্পত্য খ উপভোগ করার জন্যে জয়ন্ত নিঃসন্তান থাকতে চায় না। তার সন্তান না চাওয়ার কারণ আরও গভীর, জটিল। মুখে সেকথা না বললেও টুকরো টুকরো মন্তব্য, মতামতে, জয়ন্ত যা জানিয়েছে। তা হল, ছেলেপুলের দরকার কী? দুজনেই দিব্যি থাকা যায়!
হালকা চালে বলা জয়স্ত কথাগুলোকে তনিমা গোড়ায় গুরুত্ব দেয়নি। রসিকতা ভেবেছিল। স্বামীর কথায় সায় দিয়ে সে বলত, একদিক থেকে কথাটাই ঠিক। বাচ্চাকাচ্চার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লে এখন আমরা যেমন মেজাজে আছি, প্রেম আর থাকা যাবে না।
কথাটা সেই মুহূর্তের জন্য সত্যি হলেও অন্যসময়ে তনিমা অনুভব করত, সে যা বলেছে, সঠিক নয়। শব্দহীন, নির্জন কোনও দুপুরে, বর্ষার নিঃশব্দ সন্ধ্যায়, হঠাৎ ভীষণ একা, নিঃসম্বল মনে হত। নিজর অপরিপূর্ণতা টের পেত। খেলো লাগত নিজেকে। জয়জ্ঞ ওর অভিমানে ছটফট করতে। তার অস্থিরতা টের পেয়েও জয়ন্ত কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বরং সন্তানের প্রসঙ্গ উঠলেই ধামা চাপা দোর চেষ্টা করেছে। বিয়ের দ্বিতীয় বছর পেরোতেই ঠারেঠোরে না বলে ইচ্ছেটা তনিমা আবার সরাসরি জানিয়েছিল। মুহূর্তের জন্যে গম্ভীর হয়েছিল জয়ন্ত। থমথম করছিল তার মুখ। নিজেকে সামলে নিয়ে মুচকি হেসে বলছিল, চলো দীঘা যাই।
কবে?
সামনে মাসের মাঝামাঝি, বুদ্ধজয়ন্তীর সঙ্গে দুদিন ছুটি আছে। আরও দু-দিন ক্যাজুয়াল লিভ নিয়ে নেব।
তারপর?
পৃথিবী শস্যসালিনী হবে।
আনন্দে ঝলমলিয়ে উঠেছিল তনিমার মুখ। এক মুহূর্ত একটা হিসেব করে, জয় গলা জড়িয়ে ফিসফিশ করে বলেছিল, খুব ভালো সময়ে আমরা দীঘা যাব।
জয়ন্ত কথা বাড়ায়নি। এক বুক রোমাঞ্চ নিয়ে দীঘা ভ্রমণের দিন গুনেছে তনিমা। নিস্তব্ধ দুপুরে, জানালার বাইরে মেঘে ডাকা বর্ষার আকাশ, বৃষ্টি ভেজা কৃষ্ণচূড়া গাছের চিকন বুজ পাতার দিকে, খাটের ওপর বুকের নিচে বালিশ রেখে তাকিয়ে কতরকম পরিকল্পনা যে করেছে, তার হিসেব নেই। দীঘায় আসার পরে, গত দু-দিনে কিন্তু তার ব পরিকল্পনা ওলোটপালোট হয়ে গেছে। আজ তৃতীয় রাত। সমুদ্রমেখলা হোটেলের বারান্দায় তনিমা একা দাঁড়িয়ে আছে। যে আশা নিয়ে দীঘায় এসেছিল, তা প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছে। সারাদিন হাসি, আনন্দ,বেড়ানো, সমুদ্রমানে মেতে থাকলেও নিভৃত রাতে কলকাতার মতোই বিধিবদ্ধ দাম্পত্যজীবনে জয়ন্ত নিজেকে বেঁধে রেখেছে। প্রথমরাতে তনিমা বুঝতে পারেনি। জয়ন্ত যে প্রতিশ্রুতি ভাঙবে, কল্পনা করেনি। ঘটনাটা সে টের পেল শেষ মুহূর্তে। তখন তার কিছু করার ছিল না। ক্ষোভে, দুঃখে দু-চোখে জল এসে গিয়েছিল। অভিমানে সে মুখ ঘুরিয়ে শুতে জয়ন্ত বলেছিল, এত তাড়া কীসের? আরও তিন রাত তো থাকছি।
জয়ন্তর আচরণে, কথায় কোনও ত্রুটি ছিল না। ক্লান্তিতে বুজে আসছিল তনিমার চোখ। জয়র কণ্ঠস্বরের আন্তরিকতায় খানিকটা স্বাভাবিক হল সে। দেওয়ালের দিকে ফিরেই ভেজা গলায় প্রশ্ন করল, কেন তুমি এরকম করছ?
বাইরে সমুদ্রর অবিরাম গর্জন। খোলা জানলা দিয়ে হু হু করে ছুটে আসছে নোনা বাতাস। পরের দিন বুদ্ধ পূর্ণিমা প্রাকপূর্ণিমার রাতেও আকাশে প্রায় থালার মতো গোল চাদ। জ্যোৎস্নায় ফিনিক ফুটছে। মিহি হলুদ ধোঁয়ার মতো চাদের আলো বিছানার ওপর লুটিয়ে ছিল। অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল জয়ন্তকে। হলদেটে মোমের মূর্ত্তি মতো জয়র মুখ। কয়েক মুহূর্ত জয়জ্ঞ মুখের দিতে তনিমা তাকিয়ে থাকল। প্রশ্নের জবাব না পেয়ে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটা করল, তা সাংঘাতিক।
তোমার কী কোন রোগ আছে?
প্রশ্ন শুনে আতশব্দ করে বিছানার প্রান্তে ছিটকে সরে গেল জয়ন্ত। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল। বেঁকের মাথায় বোস প্রশ্নটা করেই তনিমা ভুল বুঝতে পেরেছিল। আফশোস হচ্ছিল তার। বিছানায় সে-ও উঠে বসল। জয়র কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, ভুল হয়ে গেছে, রাগ করো না।
চুপচাপ কয়েক মুহূর্ত বসে থেকে জয়ন্ত বলেছিল, খুব একটা ভুল তুমি বলোনি। বোধহয় সত্যিই আমার কোন কঠিন অসুখ করেছে।
কথাটা শুনে ধড়াস করে উঠলো তনিমার বুক। অসুখটা কী?
প্রশ্ন করে জয় দিকে সে তাকিয়ে থাকলো। জয়ন্ত নিস্তব্ধ। ঘরের ভেতরে চাঁদের আলো ঈষৎ ঘন হয়েছে মোমের ঢাকনা সরিয়ে স্পষ্ট হয়েছে জয়ন্দ্র তীক্ষ্ণ নাক, ছুঁচোলো চিবুক, মুখ। লম্বা, ঘন চুল এলোমেলো হয়ে মাথায় ছড়িয়ে আছে, মারাত্মক অসুখটার নাম, ভয়।
কীসের ভয়?
জন্ম দেওয়া, জন্মগ্রহণের ভয়।
কথাটা বুঝতে না পারলেও জয়ন্ত ভঙ্গিতে তনিমার গা ছমছম করছিল। বিছানায় জয়স্তর সামনে সরে বসলো সে। তার কাঁধে হাত রেখে জয়ন্ত প্রশ্ন করল, তোমার মা কেমন আছেন?
