ও ইতস্তত করে আবার বলে, শোনো।
পৃথিবী শস্যশালিনী – শৈবাল মিত্র
বিয়ের দুবছর পরেও তনিমার ছেলেপুলে না হতে বাড়ির মেয়েমহলে কানাকানি শুরু হল। আড়ালে আবডালে নানা কথা, আলোচনা চলতে থাকল। টুকরো কিছু কথা তনিমার কানেও এল। সন্তান না হবার জন্যে তনিমা জয়ন্তর মধ্যে কে দায়ী, এই হল আলোচনার বিষয়। বিরক্ত হলেও তনিমা মুখে কিছু বলল না। না শোনার ভান করে চুপ করে থাকল। কিন্তু চুপ থাকলেও যে রেহাই পাওয়া যায়, এমন কথা নেই। তনিমাও পেল না। প্রথমে, জয়ন্তর ঠাকুমা, সাতাত্তর বছরের ননীবালার প্রশ্নের মুখোমুখি হল তনিমা। ননীবালা প্রশ্ন করল, হারে দিদি, তোদের বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছে না কেন? তোর পরে উমার বিয়ে হল, তার কোলে এখন দু-মাসের ছেলে।
দীঘায় যাবার জন্যে তনিমা সুটকেস গোছাচ্ছিল। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছে জয়ন্ত। একটু আগে সে অফিস থেকে ফিরেছে রাত প্রায় আটটা। কাল সকাল সাতটায় দীঘার বাস। হেমন্তকালের সকাল সাতটা, ভোররাতের প্রায় গা ঘেঁসে থাকে। যেমন ফুস করে আসে, সেভাবে চোখের নিমেষে মিলিয়ে যায়। সকালে করার জন্যে কোনও কাজ ফেলে রাখা যায় না। দ্রুত হাতে নিমা তাই গোছগাছ সেরে নিচ্ছে। ননীবালার সঙ্গে সম্পর্কটা অঙ্গ হলেও প্রশ্ন শুনে লাল হল তনিমার মুখ। হতেই পারে। তনিমার বয়স চব্বিশ। কোন্ প্রশ্নে লজ্জা পেতে হয়, সে জানে। তার ছোটো বোন উমা, পরে বিয়ে হলেও যে মা হয়ে গেছে, একথা মিথ্যে নয়। আড়চোখে জয়ন্তকে একবার দেখে, দিদিশাশুড়ির পিঠে ছোট এক কিল মেরে তনিমা বলল, তোমার নাতিকে জিজ্ঞেস করো।
ননীবালা পুরনো আমলের মানুষ। তনিমার জবাবে খুশি হলো না। ননীবালা বলল, ওসব বললে তো চলবে না। সন্তানধারণ করবে তুমি। স্বামীকে দিয়ে কাজটা তোমাকেই হাসিল করে নিতে হবে। করতে না পারলে তোমারই দুর্নাম রটবে। পাঁচজনে ভাববে তুমি বাঁজা।
ননীবালার মন্তব্যে ক্ষুণ্ণ হলেও মুচকি হেসে তনিমা বলল, বংশ বাঁচাতে নাত্রি জন্যে পাত্রী দেখা শুরু করো।
তনিমার চিবুক ধরে ননীবালা ফিসফিস করে বলল, আমার নাতিটা বাঁজা হলে কি করবো?
শব্দ করে তনিমা হেসে উঠতে খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে জয়ন্ত বলল, হাসিঠাট্টার ভাগ কি আমি পেতে পারি?
তনিমা কিছু বলার আগে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ননীবালা বলল, স্বামী-স্ত্রী বেড়াতে যাচ্ছো, খুব ভালো কথা। যাও। বিয়ের পর থেকে গত দুবছরে এই নিয়ে তিন, চার বার হনিমুন হল। সমুদ্রে, পাহাড়ে, ভালো ভালো জায়গায় তোমরা হনিমুন করেছ, অথচ কোনও ফল নেই। পরেরবার যেন তিনজনকে বেড়াতে যেতে দেখি। ছদ্ম রাগে ঘর ছেড়ে গটগট করে ননীবালা বেরিয়ে যেতে লজ্জায় লাল হল তনিমার মুখ। ছোটো ননদ পুতুল কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তনিমা দেখেনি। চোখ তুলতে পুতুলকে নজর করল। মুখ টিপে পুতুল হাসছে। পুতুলের বয়স সতেরো, আঠারো। হাসার অধিকার তার আছে। এক লহমা তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে তনিমা সুটকেস ভরতে থাকল।
আমি কোনও সাহায্য করতে পারি?
পুতুলের প্রশ্নে স্মিত হেসে তনিমা বলল, বসো। দরকার হলেই বলব।
কারুকার্য করা মোজেকের মেঝেতে তনিমার পাশে পুতুল বসল।
এসব তিনদিন আগের ঘটনা। ইতিমধ্যে তনিমা, জয়ন্তর দুরাত দীঘা কেটে গেছে। আরও দুরাত তারা দীঘায় থাকবে। বিয়ের পর জয়ন্তর সঙ্গে তনিমা দ্বিতীয়বার দীঘায় এল। প্রথমবার ছিল দু-দিন। এবারে থাকছে চারদিন। পরশু রাতের বাসে কলকাতায় ফিরবে। কলকাতায় বাস পোঁছোবে পরের দিন ভোরে। দীঘা বেড়াতে চার দিন কম নয়। কিন্তু যে কারণে দীঘা এসেছিল, সেটা ঘটেনি, কারণটা এত গোপন, কাউকে বলা যায় না। বললেও সেটা হাস্যকর শোনাবে। হয়তো খানিকটা অশ্লীলও মনে হতে পারে। বিষয়টা স্বামী, স্ত্রীর একান্ত নিজেদের। তনিমা, জয়ন্তও তা জানে। আসার কারণটা তারা তাই কাউকে বলেনি। অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে একমাত্র বৃদ্ধা ননীবালা কারণটা ছুঁয়েছিল। ননীবালার কথায় লজ্জায় আরক্তিম হলেও তনিমা চমকে উঠেছিল। সাতাত্তর বছরের দিদিশাশুড়িকে তার মনে হয়েছিল অন্তর্যামী। তার সঙ্গে জয়ন্তর গোপন চুক্তি কিভাবে ননীবালা জানল, হদিশ করতে পারেনি।
ননীবালা আসলে আন্দাজেই কথাটা বলেছিল। জীবনের অন্তিম পর্বে নাতিপুতিতে অপুর সংসারটাকে নিজের চোখে দেখে যাবার আকাঙক্ষা সাতাত্তর বছরের বৃদ্ধার সম্ভবত প্রবল হয়েছিল। ননীবালার আকাঙক্ষার সঙ্গে গোপনে, অজ্ঞাতে তনিমার প্রত্যাশা কীভাবে মিশে গেল, কে বলতে পারে। ননীবালার কথা শুনে অবাক তনিমা স্মৃতিমগ্ন হয়েছিল।
বিয়ের পর বছর ঘুরতেই জয়ন্তর কাছে তনিমা আভাসে মা হবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল। জয়ন্ত প্রথমে বুঝতে পারেনি। মুহূর্তের মধ্যে তনিমার প্রত্যাশা হৃদয়ঙ্গম করে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল তার মুখ। স্থির চোখে জয়জ্ঞ দিকে তনিমা তাকিয়েছিল। স্বামীর মুখের অভিব্যক্তি দেখে অবাক হয়েছিল। প্রাণবস্তু, স্বাস্থ্যবান মানুষটি হঠাৎ কেন উদাসীন হয়ে গেল, অনুমান করতে চেয়েছিল। জয়ন্ত কী অসুস্থ বোধ করছে? তাকে আহত করার মতো কোনও শব্দ কি সে উচ্চারণ করে ফেলেছে? কিছুটা বিহ্বল হয়ে তনিমা প্রশ্ন করল, কি হল তোমার?
তনিমার প্রশ্নে জয়ন্ত বলেছিল, আরও বছরখানেক যেতে দাও।
