পানকৌড়িটা এরি মধ্যে কয়েকবার ভেসে উঠে, এখন আবার পাতাল নিয়েছে। পাখিটা ডুব দেওয়ার, ঢেউয়ের ওর যে ঢেউ ওঠে আমি সেই জলের লেখালেখি দেখতে লাগলাম। ততক্ষণে মদিনা আর সখিনা ডানার দুদিক থেকে পালক ধরে শাদা পাখিটাকে আমার সামনে নিয়ে এল। তাদের পা আবার কাদায় কালো হয়ে বৃষ্টির জুতোর মতো লাগছে। পাখিটা যে এত বড় তা বসা অবস্থায় বোঝা যায়নি। শাদা বগার ঝাক যখন আকাশে মালার মতো ভাসছে তখন এ ধরনের এক একটা পাখিই সামনে থেকে ঝাকটাকে বিল থেকে বিলাস্তরে চালিয়ে নিয়ে যায়। দিনা আর সখিনা পাখিটার ডানা ছড়িয়ে আমার সামনে টান-টানভাব উবুড় করে শুইয়ে দিল। পাখিটার গাঢ় সুজ পা বর্ষাকালের ঝরাধানের লকলকে উঁটার মতো পেছন দিকে বিছিয়ে থাকল। পাখিটার চঞ্চুতে আর গলার একটু নিচে রক্তের লালছোপ। মদিনা বললঃ
দুলাভাই, জবাই করেননি যে, হালাল না হলে আমরা খাব কী করে?
আমি হাসলাম, শিকারে গোশত আর দরিয়ার পানি মুসলমানদের কাছে বচেয়ে হালাল। তোমাদের কোনো অসুবিধে হবে না।
তা বলে জবাই করতে হবে না?
ঘাড় কাত করে সখিনা বলল। আমি মেয়ে দুটিকে আশ্বস্ত করার জন্যে বললাম, আমি তো বিসমিল্লা বলেই গুলি করেছি। আল্লার নাম না নিয়ে মারিনি। এখন তোমরা ভেবে দেখ, খাবে কী খাবে না!
আপনি খেলে আমরাও খাব।
এইতো মুসলমানদের মতো কথা হল। মদিনার কথার জবাবে আমি হেসে বললাম।
পানকৌড়িটা আমাদের দিকে অনেকদূর এগিয়ে এসে ঢেউয়ের ওপর ভেসে উঠছে। আমি মদিনাদের আঙুল দিয়ে আমার দ্বিতীয় শিকারটা দেখিয়ে দিলে তারা চুপ মেরে আমার পেছনে এসে পিঠে হাত রেখে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। ফিস ফিস করে তারা পরস্পরকে চুপ থাকতে বলছে। তাদের ন’দশ বছরের কচি সুপারির মতো ছোট বুক আর চিবুকের চার রয়েছে আমার পিঠে। আমার গলায় তাদের গরম নিশ্বাস পড়ছে আমার যদিও অস্বস্তি লাগছে, ও মেয়ে দুটির কিশোরীসুলভ বিস্মিত অপেক্ষা ও আনন্দকে আমি উপলব্ধি করলাম। তারা আমার কাঁধের কাছে চিবুক ঠেকিয়ে কালো পাখিটাকে দেখছে। তাদের চুলের মিষ্টি গন্ধ আমার নাকে লাগছে। অবশ্য এখন কয়েক মুহূর্ত আমার আর পানকৌড়িটার একটু একা থাকা দরকার। আমি পাখিটার চালচলন, বিচরণ, বিহার, আহারও আলোড়ন নয়ন ভরে দেখতে চাই। পাখিটা মনে হয় আমাকে বেশিক্ষণ সে সুযোগ দিতে চায় না আবার ঢেউয়ের নিচে নিঃশব্দে ডুবে গেল। আমি মদিনাদের আমরা গা ছেড়ে বসতে বলে পকেট থেকে কার্তুজ বের করলাম। মেয়ে দুটি ছোখ বড় বড় করে খুশিমনে আমার লোড করা দেখতে লাগল। আর মাঝে মাঝে আগ্রহভরে খালের ভিতর তাকিয়ে দেখতে লাগলো ঢেউয়ের ওপর পাখিটা আবার ভেসে ওঠে কিনা।
সূর্য বেশ ওপরে উঠে এসেছে। সেই শিশির ভেজা সকাল-সকাল ভাবটা আর নেই। অনেকক্ষণ রোদে থাকায় আমারও গরম লাগছে। যদিও পৌষমাস ও কপাল আর গাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। আমি রুমাল বের করে ঘাম মুছলাম। অকারণ বন্দুকের নলটাও একবার রুমালে মুছে নিলাম। একটু যত্ন পেয়েই নলটা চকচক করে উঠল। আমি কার্তুজ ঠেসে দিয়ে সেফটিপিন আর লাগালাম না। পাখিটা এরমধ্যেই আবার ভেসে উঠেছে।
অই, ভেসেছে।
আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল মদিনা। আমি বললাম, দেখেছ। কথা বলো না পালাবে। কিন্তু কার কথা কে শোনে। আমার ছোটো শালী সখিনার বুদ্ধিসুদ্ধি একটু কম। সে তর্জনী তুলে জোরে বলে উঠল, এই যে পাখিটা দুলাভাই, মাছ খাচ্ছে।
পানকৌড়িটা গলা নাড়িয়ে সম্ভবত ছোট গুগলি-শামুক গিলছিল। সখিনার শব্দে আবার তলিয়ে গেল। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম দিলে তো ডুবিয়ে। দুবোনই লজ্জিত হয়ে নখ খুটতে লাগল। শেষে আমি হেসে বললাম, যাক এখন থেকে এখানে চুপ করে বসে থাকবে। একদম কথা বলবে না। আমি আর একটু এগিয়ে গিয়ে গুলি করব। তারা বাধ্যের মতো ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়ে শাদা বগাটার পাশে হাঁটু নামিয়ে বসল।
আমি উঁচুপাড় থেকে দক্ষিণপাশে নিচে জমির মধ্যে নেমে গেলাম। আমার মাথায় একটা দুষ্টবুদ্ধি এসেছে। অবশ্য আমার মতলবটাকে দুষ্টবুদ্ধি না বলে শিকারির সহজাত চাতুরিই বলা উচিত। আমি ভাবলাম, পাখিটা এখন পানির নিচে আছে। এই অবসরে আমি পাড়ের আড়াল ধরে সোজাসুজি পাখিটা যেখানে ডুবেছে, সেখানে তীরের উঁচু জায়গায় উঠে বন্দুক বাগিয়ে বসে থাকব। আর পাখিটা ভাসামাত্রই গুলি করব।
আমি আমার মতলব মতো পাখিটা যেখানে ডুব-সাঁতার করছিল ঠিক সেখানে ঢালু বেয়ে উঠে এলাম। আর একটা হাঁটু মাটিতে ঠেকিয়ে পেশাদার শিকারিদের কায়দায় অন্য হাঁটুর ওপর বন্দুক রেখে পানকৌড়িটা আবার যেদিক ভেসে উঠতে পারে আন্দাজে সে দিকটায় তাক ঠিক করলাম। নিশানা সোজা করা মাত্রই, আমাকে আর অপেক্ষা করতে হল না, কিছু ঘোলাটে বুদসহ পাখিটা লাফিয়ে ওঠা কালবাউসের মতো পানির ওপর ভেসে উঠল। আমি মুহূর্তমাত্র দেরি না করে ট্রিগার টানলাম। এবার আমার দক্ষতার মধ্যে উত্তেজনা কম থাকায়, বন্দুকের আওয়াজটা তীব্রভাবে আমার কানে বাজল। বন্দুকের ধাক্কাটা মোটা লাঠির আকস্মিক গুতোর মতো আমার কণ্ঠাস্থি ও বাহুসন্ধির ওপর এসে পড়ায় আমি মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে, পড়লাম। ব্যারেলের হালকা ধোঁয়া নেমে গেল পানির সীমা পর্যন্ত।
প্রথমে গুলি-খাওয়া ভোঁদড়ের মতো একটা বৃত্তাকার ঢেউ তুলে পাখিটা পানির ওপর চক্র মারল। তারপর গলাটা ঢেউয়ের ওপর লম্বাভাবে সমান করে ডানা দিয়ে পানিতে ক্রমাগত বাড়ি মারতে মারতে ঘুরতে লাগল। আর মনে হল, পাখিটা যেখানে গুলি খেয়ে তড়পাচ্চে সেখানে কেউ একবালতি টাটকা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। খালের মধ্যভাগে বেশখানিকটা পানি রক্তে এমন রঙিন হয়ে গেল যে আমি ভেবে পেলাম না, একটা পানকৌড়ির শরীরে এত রক্ত কিভাবে থাকতে পারে। পাখিটা লালরক্ত, সবুজ জল ও তার গাঢ় কালো পালকের আড়ালে যন্ত্রণাদায়ক এক বর্ণের সমারোহ সৃষ্টি করে আমাকে স্তম্ভিত করে দিল। আমার হঠাৎ বোধ হল, আমার মাথাটা ভয়ানক ব্যথা করছে। আমি বন্দুকটা মাটিকে রেখে, এ দৃশ্য থেকে আমার জ্বালা-ধরা চোখ দুটিকে রেহাই দেবার জন্য দুহাতের পাতায় চোখ ঢেকে বসে রইলাম। আমার আরও হাত থাকলে আমি কানেও আঙুল দিতাম। আমার অতিরিক্ত কোনো হাত বা আঙুল না থাকায় আমি অসহায়ের মতো প্রাণপূর্ণ একটা বিপুল কালোপাখির দীর্ণ মণিরগের রক্ত-মোক্ষণের নিঃশব্দ গর্জন কর্ণপটাহে ধারণ করে আচ্ছন্ন ও আবিষ্ট হয়ে গেলাম।
