আবার বন্দুক তুললাম। আর কোনোরকমে ব্যারেল সই করেই ছুঁড়লাম গুলি। মুলিবাঁশের ওপর জ্ঞরার শব্দটা এসে আমার কানে লাগল। পাখিটা আমার চোখের সামনে উড়ে যাচ্ছে। প্রথম গুলির শব্দে হাত দুয়েক শূন্যে লাফিয়ে উঠে বিপদ কেটে গেলে অবলীলায় দুটি ডানা বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে খালের দিকে নেমে গেল। তারপর পাখা দুটি মৃদুভাবে কাঁপাতে কাঁপাতে প্রায় জল ছুঁইছুঁই অবস্থায় অনেকটা দূরত্ব পার হয়ে ঢেউয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর একবার পাখার ঝাঁপটে শরীরটাকে চাঙ্গা করে নিয়ে ইতস্তত দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখে নিল। আমার দিকেও মুখ যোরাল। দ্রুত। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে আমাকে দেখে নিয়ে ঢেউয়ের দিকে গলা লম্বা করে কাঁথার। ওপর ছুঁচ গাঁথার মতো শরীরটাকে পানির ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে ডুবে গেল। আমি স্তম্ভিত হয়ে খালের উঁচুপাড়ে বন্দুক হাতে বসে পড়লাম। আমি প্রকৃতিতে, ভেজা কালো পালকলা একা পানকৌড়ির নিজস্ব জগতে, তার সচ্ছলতা, সাহস, উড়াল, গ্রিবাভঙ্গি, দর্প, আত্মরক্ষা, আহারপদ্ধতি, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও সৌন্দর্য দেখে হিংসায় বন্দুকের গরম নলে গাল চেপে বসে রইলাম।
কল করতে করতে, হাত ধরাধরি করে মদিনা আর সখিনা খালপাড়ের ঢালু জমিতে বুজ লম্বা ঘাসের গালিচায় তাদের পায়ের কাদা সাফ করছে।আমি আঙুল দিয়ে বিলের হাঁটুসমান পানিতে উবু হয়ে ভেসে থাকা ধবগাটা দেখিয়ে দিলে তারা ছুটল সেদিকে। আমি মেয়ে দুটির আনন্দ আর ছোটাছুটি দেখে মনে মনে হাসলাম। উন্মুখ মাঠ, কোমর বাঁকানো নদী, ছোটো হ্রদের মতো বিল বা জলাশয় কিংবা সর্বগ্রাসী নিঃসীম বুজে ডুবে যাওয়ার সুযোগ এরা জীবনে কমই পেয়েছে। পৃথিবীর ম্যাপের মধ্যে এশিয়ার যোনির মতো দেখতে সুজগুল্মলতায় রো একটি বদ্বীপে, যেখানে জলোবাতাসে নিশ্বাস টানতে টানতে কিশোরীরা নানবছরেই শরীরের সমস্ত গিরো উন্মোচন করে বেড়ে ওঠে, পাটশ্বর্ণ গন্নিী হরিণীর লম্বা চোখের মতো চোখে কালো মোটারেখা টেনে কাজল আঁকে, দুই রেখার মাঝে কাঁচপোকার টিপ পরে, ঝাউয়ের ঝালরের মতো পিঠের ওপর উদ্দাম চুল খুলে দিয়ে বেড়ায়, তাদের পিতামাতার কেন যে স্থায়ী আবাস, পাথরের স্ত্রবাড়ি, কংক্রিটের নগরনির্মাণের প্রতিযোগিতায় সর্বস্ব ব্যয় করে দিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তা ভেবে আমি একাকি হাসলাম।
আদিনা কি এখন আছে? আমি আমগাছটার দিকে চোখ ফেরালাম। আদিনা এখনও গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের বিয়ে হয়েছে আজ সাতদিন। দৈহিক বা মানসিক কোনো সম্পর্কই আমার স্ত্রীর সাথে আমার এখনও গড়ে ওঠেনি। কলেজে ভর্তি হওয়ার দিন আদিনা এসেছিল আমার মাকে কদমবুসি করতে। আমি অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্চিলাম। আমি বি.এ পাশ করে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল অফিসে চারশো টাকা মাইনের একটা কাজ বাগিয়েছি। লোকাল লোক বলে, এছাড়া আমার আব্বাও করে গত হয়েছেন, সেজন্য পৌর-পিতার সন্তান হিসেবে আমার প্রতি স্বাভাবিক সহানুভুতি থাকায় আমাকে চাকরিটার জন্য বেশি সাধ্য-সাধনা করতে হয়নি। আমি স্নানাহার করে অপিসে বেরুবার আগে জুতা বুরুশ করছিলাম। মা মেয়েটিকে নিয়ে আমার ঘরে এসে দাঁড়ালেন।
আদিনা আজ থেকে কলেজ যাচ্ছে আনোয়ার।
আমি মার কথায় মাথা তুললাম। আদিনা হালকা আকাশিরঙের শাড়ি পরেছে। পাড়টা চওড়া, শাদা। সে নত হয়ে আমাকে কদমবুসি করল। তার পিঠের ওপর দীর্ঘবেণী বিছানো। বেণীর ফণায় দুটি শাদা গোলাপ গোঁজা। গলায় সোনার সরু হার।
আমি অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বললাম, বাহ্ আদিনা তো বেশ বড় হয়ে গেছে মা।
মা হাসলেন, মেয়েরা শাড়ি পরলেই বুঝি বড় হয়ে যায় আনু? আদিনা তো এই সেদিনও ফ্রক পরত, তোর মনে নেই?
বাহ্, মনে থাকবে না কেন! কিন্তু এখন কতবড় লাগছে, ভালো করে দেখো!
আমি হাসলাম। মা আমার কথায় থতমত খেয়ে আদিনার দিকে ফিরল। আর আদিনা আমাদের দেখাদেখিতে লজ্জা পেয়ে মুখে রুমাল গুঁজে দৌড়ে পালাল।
মা আর আমি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলাম। আদিনা চলে গেলে মা বললেন, বড় সুশ্রী মেয়ে, বড় ভালো।
আমার মার ঐ এক মুদ্রাদোষ। যা কিছু ভালো আর তার মনোমতো তাকেই তিনি সুশ্রী বলেন। ‘শ্ৰী’ বলতে তিনি বর্ণকে বোঝান না, বোঝান রূপকে সৌন্দর্যকে। আমার অত সাহস ছিল না আদিনার গায়ের রঙ যে কালো একথা মাকে বলি। অবশ্য একথা বলার কোনো যুক্তিও ছিল ন। কারণ আদিনাকে আমারও ভালো লাগত। মেয়েটি মায়ের কাছে এলে আমিও সর্বক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখতাম। এক তৃপ্তিহীন আকর্ষণ মেয়েটি তার ধ্বাঙ্গে বহন করত।
আমি মাকে বললাম, সুশ্রী না হলে তোমার কাছে পাত্তা পায় আবার।
আমার কথায় মা খুশি হয়েছেন বলে মনে হল। আমার দিকে ফিরে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলেন, আদিনাকে তোর কেমন লাগে আনু, পছন্দ হয়?
আমি মার কথায় চমকে উঠলাম। মা কিরে পছন্দের কথা বলছে? আমি বললাম, কেমন পছন্দ মা? আদিনা তো দেখতে শুনতে খারাপ মেয়ে নয়। এছাড়া তোমার কাছে আসে তুমি ভালোবাস?
আদিনাকে বিয়ে করবি আনু?
এবার মা খুশি আর মিনতি মেশানো গলায় কথা বলছে। আমি ব্যাপারটা বুঝলাম হেসে বললাম, এতে তোমার খুব উপকার হবে মা, আমি জানি। আমার সাহায্য হবে।
আমার কথায় মা আবেগ চাপতে না পেরে তার গরম হাত দুটি দিয়ে আমার ঠাণ্ডা হাত মুঠো করে চেপে ধরলেন। আমি বললাম, ঠিক আছে। তুমি আকিল সাহেবের সাথে কথা বললো মা।
