২.
একবার খুব মজা হয়েছিল। রকিবদের অফিসে বিদেশ থেকে এক প্রতিনিধি এসেছিল, অ্যালেক্সি। অ্যালেক্সি খুব ফুর্তিবাজ, তাদের বাসায় এসে হইচই করে একাকার। প্রায় রাত দুটো পর্যন্ত জমিয়ে আড্ডা। পরদিন অ্যালেক্সি চলে গেল ঢাকার বাইরে, রকিবও গেল। রকিবকে তো যেতেই হবে, অফিসের কাজে সে মাসের মধ্যে অনেক দিন ঢাকার বাইরে কাটায়। আর, শামীমা থাকে একা, একদম একা। থাক, এ প্রসঙ্গে সে এখন কিছু বলবে না। এখন অ্যালেক্সিকে নিয়ে কী মজাটা হয়েছিল, সেটা সে বলবে।
দিন ৪/৫ বাইরে কাটিয়ে অ্যালেক্সি আর রকিব ফিরে এল। আর একটা রাত তুমুল আড্ডা। এক সময় পরিশ্রান্ত তাদের আড্ডা ভেঙে গেল। অ্যালেক্সি বিদায় নিল আর তারাও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমোতে গেল। সে রাতে শামীমার স্বপ্নের মধ্যে ব্যাপারটা অ্যালেক্সির সঙ্গে ঘটে গেল। এটা সে লুকালো না। কারণ রকিবকে সে চেনে, এটা রকিবের কাছে লুকানোর কিছু নয়। সে নাস্তার টেবিলে বসে বলল, একটা মজার ব্যাপার হয়েছে জানো?
রকিব এক পলক তার দিকে তাকিয়ে খবরের কাগজে চোখ ফেরাল কী করে জানব, তুমি কি বলেছ?
আমার মনে হচ্ছে গত রাতে ও ওই কাজটা আমার অ্যালেক্সির সঙ্গে হয়েছে।
হুঁ। রকিব বলল। তারপর যেন খেয়াল হল তার, সে খবরের কাগজ সরাল–মানে!
মানে পরিষ্কার। মনে তো হলো—অ্যালেক্সিই।
রকিব হো হো করে হাসতে আরম্ভ করল-মনে হচ্ছে অ্যালেক্সিকে খুব পছন্দ হয়ে গেছে তোমার।
ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত না? কীভাবে যে একেকটা মুখ চলে আসে।
রকিব হাসি থামাল না—এখন কথা ঘুরাচ্ছ?
অ্যাই বাজে কথা বলো না। এমনিতেই আমি খুব লজ্জা পেয়েছি।
রকিবের মুখে সামান্য হাসি থেকে গেল ব্যাপারটা আসলেও অদ্ভুত।
তুমি দ্যাখো, তুমি জানোই—অ্যালেক্সির কথা আমি একবারও ভাবিনি।
উঁহু কথাটা ঠিক না। অ্যালেক্সির কথা তুমি ভেবেছ।
শামীমা বলল, কখনও না।
ভেবেছ। কিন্তু যে স্বপ্ন দেখেছ রেকম কিছু ভাবোনি। কিন্তু হয়েছে কী—স্বপ্নের মধ্যে ওই ব্যাপারটা যখন ঘটে তখন একটা না একটা পরিচিত মুখ এসে যায়। অ্যালেক্সি এতক্ষণ ছিল আমাদের সঙ্গে—ওর মুখটা চলে এসেছে।
তুমি কাল রাতে ভোস করে না ঘুমিয়ে, ঘুমানোর আগে ওটা সারলেও তো পারতে। অ্যালেক্সি তাহলে স্বপ্নের মধ্যে তোক আর যেভাবে হোক, ওই কাজে আসার সুযোগ পেত না। আসলেও লজ্জা লাগে বাপু।
রকিব আড়মোড়া ভাঙল কীভাবে হবে ওটা! ৩/৪ দিনের এক্সটেনসিভ টুর, ফিরে অত রাত পর্যন্ত আড্ডা। তারপর কি শরীরে আর কোন ইচ্ছা থাকে।
ইচ্ছা না থাকলেও হতে হবে। কী লজ্জা স্বামী পাশে থাকতে।
লজ্জার কিছু নেই। গত মাসে আমার কী হয়েছিল সেটা শোনো। ওই যে টানা পাঁচ দিন বাইরে থাকলাম না?
এ আর ফলাও করে বলার কী! তুমি তো বাইরেই থাকো।
আহ্, শোননই না। ঢাকা ফেরার আগের রাতে স্বপ্ন আমাকে নিস্তেজ করে দিল। কিন্তু মেয়েটাকে আমি আর চিনতে পারি না। পারি না….।
একদম অচেনা?
ও রকমই। শেষে বুঝতে পারলাম—বিকালে যখন হোটেলে ফিরছি তখন রিসেপশনে মেয়েটাকে এক পলক দেখেছিলাম। বোর্ডার। স্বামীর সঙ্গে রিসেপশন
থেকে রুমের চাবি ফেরত নিচ্ছিল।
শামীমা আন্তরিক গলায় বলল, ওই একবার দেখেই মেয়েটাকে বুঝি তোমার খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল?
রকিবও খুব সহজ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল হ্যাঁ, ততটা অবশ্যই, যতটা তোমার অ্যালেক্সিকে পছন্দ হয়েছিল।
তারপর তারা দুজন মিলে খুব হাসল।
রকিব বলল, ওই মেয়েটা আমাকে খুব ভুগিয়েছিল।
শামীমা বুঝতে পারল না। সে জিজ্ঞেশ করল–কোন্ মেয়েটা?
ওই যে, বললাম না, ঢাকা ফেরার আগের রাতে হোটেলে…। ওই মেয়েটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। কখন পারলাম, জানো?
শামীমা মুচকি হাসল—ফিরে এসে আমার সঙ্গে হওয়ার পর?
রকিব অবাক চোখে তাকাল—তুমি বুঝলে কী করে?
শামীমাও অবাক হয়ে গেল—ওমা, সত্যি নাকি! আমি তো এমনি বললাম।
না, সত্যি। সে রাতে আমাদের হওয়ার পর সিগারেট ধরালাম না? দুটো টান দিতেই মনে পড়ে গেল-আরে, এটা তো ওই মেয়ে!
শামীমা গম্ভীর মুখে জানতে চাইল নিজেকে তখন তোমার আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল মনে হলো কিংবা মার্কোনি?
অ্যালেক্সি কিংবা ওই মেয়েটার এক ধরনের অস্তিত্ব থেকে গেছে তাদের মধ্যে। ট্যুরে রওনা দেওয়ার আগে রকিব গম্ভীর মুখে বলে, তোমার জন্য অ্যালেক্সিকে রেখে যাচ্ছি।
শামীমাও হাসতে হাসতে জানায় হ্যাঁ, আর তোমার জন্য ওই মেয়েটা তো থাকছেই।
কিংবা টুর থেকে ফিরে এসে রবি জিজ্ঞেস করে—অ্যালেক্সি এসেছিল?
শামীমা জানতে চায়—ওই মেয়েটাকে কোথায় রেখে এলে!
রকিব হাসিমুখে বলে, লুঙ্গির সঙ্গে।
৩.
চা শেষ করে কাপটা পায়ের কাছে নামিয়ে রাখল শামীমা। শরীরে ক্লান্তি নেই কোন, সে লু আড়মোড়া ভাঙল। সে দেখেছে—এটা একটা চমৎকার ব্যাপার, এই আড়মোড়া ভাঙা, এ অভ্যাসটা রকিবেরও আছে। প্রায়ই সে বিকট শব্দ করতে করতে আড়মোড়া ভাঙে।
কখনও টানটান করে দ্যায় শরীর, বলে—ধরো শামীমা, এই যে টানটান করে দিলাম শরীর, শরীর টানটানই থাকল, আর স্বাভাবিক হলো না, তখন? শামীমা বলে, মন্দ কী! অমন জবুথবু স্বাভাবিক হওয়ার চেয়ে টানটান হয়ে থাকাই ভাল। সে কথা মনে হলে শামীমা নিজে নিজে একটু হাসল। আরও একটা আড়মোড়া ভাঙল সে। তারপর উঠে দাঁড়াল। রকিবকে ওঠাতে হবে। সে কাল রাতে শোয়ার আগে বলে রেখেছে তাকে একটু সকাল সকাল উঠিয়ে দেয়ার জন্য। অফিরে কিছু কাজ সে গত রাতে বাসায় নিয়ে এসেছে। রাতে শেষ করতে পারেনি। বাকিটুকু সকালে অফিসে রনা হওয়ার আগে শেষ করতেই হবে। কারণ কাল এগারোটায় তার রিপোর্ট নিয়েই অফিসে জরুরী মিটিং।
