আদিনা আমার পড়ার ঘরেও মাঝে মাঝে আসত। অকারণে নয়, সিগ্রেট ধরাবার আগুন চাইলে, মা রান্নাঘর থেকে দেশলাই অথবা শোলার ডগায় আগুন দিয়ে আদিনাকে কখনো-সখনো আমার ঘরে পাঠাতেন। আদিনা আগুন হস্তান্তর করে তার ফ্রকের সামনের দিকটা দিয়ে ঘামে-ভেজা মুখটা মুছতে গেলেই আমি তার নাভিও দেখেছি। তার নাভি দেখলে মনে হত তার জেগে ওঠা তলপেটের পেশিকে ভারসাম্যে আনার জন্যে এধরনের জবা ফুলের মতো গভীর নাভিমণ্ডলের একান্ত প্রয়োজন ছিল।
আদিনার সাথে কালো সিক্তডানা পানকৌড়িটার ভাবভঙ্গির খানিকটা মিল খুঁজে পেয়েই কিনা জানিনা, আমি আর চোখ ফেরাতে পারছি না। অথচ গুলি করতে হলে আমাকে অতি সাবধানে অন্তত খালপাড় অবধি হেঁটে যেতে হবে।
পানকৌড়িটা এখন তার ঠোঁট দিয়ে ভেজাপালক খেলাল করছে। আমি এ অবসরে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে নামলাম। সাবধান থাকা সত্ত্বেও এবার আমার পা বেশ খানিকটা কাদার ভেতরে ডেবে গেল। আমি কাদাভরা পা টেনে খালপাড়ে পৌঁছে একটু দাঁড়ালাম। এখানে দাঁড়িয়ে বন্দুকে নতুন কার্তুজ ভরে নিতে হবে। আগে আমি ঘাসের ওপর পা ঘষে চামড়ার মতো পুরো কালো আঁঠালো কাদাটা সাপ করে নিলাম। কাদা উঠে গেলে পাটা বেশ হালকা বোধ হল। আমি কার্তুজ ভরার আগে শেষবারের মতো আবার আমার শ্বশুরবাড়ির সামনের আমগাছটার দিকে তাকালাম। আদিনা এখনও গাছটার নিচে গোলাপি রঙের কালোপেড়ে শাড়িটা পরে দাঁড়িয়ে আছে। আর তার ছোট দুবোন, আমার শালী মদিনা আর সখিনা মাঠে নেমে আমার দিকে সোজা দৌড়ে আসছে। সম্ভবত বন্দুকের আওয়াজ পেয়ে এরা শিকারটা নিতে আসছে। আমি একবার ভাবলাম মেয়ে দুটি কাছে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। ততক্ষণে পাখিটা যদি উড়ে যায় ভয় থাকায় আমি বন্দুকে কার্তুজ ভরে নিয়ে হাতের ইঙ্গিতে মেয়ে দুটিতে দৌড়াতে মানা করতেই তারা বিলের কাছাকাছি একজায়গায় থেমে গেল। সম্ভবত তারা বুঝতে পেরেছে আমি আরেকটা গুলি করতে যাচ্ছি।
আমি আর দেরি না করে সোজা খালের পাড়ে উঠে গেলাম। পানকৌড়িটা এখনও চক্ষু দিয়ে শরীর আর ডানা খোঁচাচ্ছে। আমি যেদিক দিয়ে উঠেছি এটা হল পাখিটার পেছনদিক। লেজের পালকগুলো ভিজে ভারি হয়ে থাকায় পাখিটা লেজ ফুলিয়ে পালকগুলোকে সাধ্যমতো ছড়িয়ে দিয়েছে। আর ছড়ানো লেজের জন্য পাখিটা আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। আমি বন্দুক তুলে তাক ঠিক করলাম। আমার ডানচোখের মণিতে বন্দুকের মাছি আর পাখিটার প্রসাধনরত কালো শরীর এক বিন্দুতে এসে মিলতেই আমি শরীরটাকে বিশেষত আমার কোমর আর হাতকে স্থির রাখতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কোনোদিনই কি আর লক্ষ্যস্থলের দিকে পাথরে অথবা ধাতুদণ্ডের মতো অনড় ও অবিকল থাকতে পারে? পারে না। আমার হাত ধরা একমুখি বন্দুকের ভারি ব্যারেলটাও একটু এদিকওদিক হেলে যাচ্ছিল। পাখিটা কিন্তু পালক পাকসাফ করা বন্ধ করে দুটি ডানা দুইদিকে ছড়িয়ে দিয়ে গলা লম্বা করে খালের পানির মধ্যে ছোটমাছের ফুটমারা দেখছে। এখন সে অনেকটা উড়ালের ভঙ্গিতে বসে আছে। আদিনা আমাকে দুবাহু মেলে দিয়ে এভাবেই একবার গলা জড়িয়ে ধরেছিল। শুধু একবার। মাত্র ছ’দিন আগে। বাসর রাত শেষ হয়ে গেলে। আমি যখন খুব ভোরে, আমার মায়ের ফজরের নামাজের আগে পুকুরে যাওয়ার জন্য দুয়ার খুলতে খাট থেকে নামলাম, আদিনাও বিছানা ছেড়ে আমার পেছনে এসে পিঠের দিক থেকে দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, এসো আরও কতক্ষণ শুয়ে থাকি। আমি জানি তুমি রাগ করেছ। এই আমার প্রথম রক্ত। তুমি নোংরা হয়ে যেতে, তোমার গা ঘিনঘিন করত।
আমি তার হাত ধরে পেছন ফিরে হাত দুটি উঁচু করে ধরলে যেমন লেগেছিল, পানকৌড়ির ডানা ছড়ানো শরীরটাকে এখন আমার বন্দুকের মাছির ওপর দিয়ে তেমনি লাগছে।
আমি বন্দুকটা নামিয়ে নিলাম। না, কোনো দয়ামায়া, স্মৃতি বা কবিত্বের তাড়নায় নয়। আমি ভুল করে পাখিটার পেছন দিক থেকে লক্ষ্য স্থির করেছি। অথচ পাখি শিকারিরা কোনোদিন পেছনদিক থেকে গুলি করে না। আগে আমি কোনোদিন করেছি বলে মনে পড়ল না। কেন করে না? সম্ভবত শিকারের মুখোমুখি না হলে বারুদবর্ষণকারীরা কোনও আনন্দ পায় না। বীর্যবর্ষণকারীদেরও যেমন রমণলিপ্তা নারীর মুখমণ্ডল, বাহুমুল, স্তনযুগলের প্রত্যক্ষ অবলোকন ও পেষণের প্রয়োজন অবধারিত হয়ে ওঠে, কারণ এসব উপাচারের স্বতঃস্ফূর্তি রক্তকে মথিত করলে পুরুষের শরীর একা নিক্ষেপনীতিতে ঋজু হতে হতে এক অন্তরালবর্তী পুলকময় সত্তাকে নির্গলনে বাধ্য করে। যদিও বেগবান বারি জরায়ুকে বিদ্ধ করবে কি করবে না, এ নিয়ে বর্ষণকারীদের কোনো মাথাব্যথা থাকে না বারুদবর্ষণকারী শিকারির নীতিও তেমনি। তারাও মুখ, বুক, ডানার বাম ও দক্ষিণ পাশ্ব, গ্রিবার বাঁকটা একটু দেখে নিয়ে তাক ঠিক করে। এছাড়া পানকৌড়িটা সম্বন্ধে একটু বেশি সতর্কতা আমার মানসিকতাকে অভিভূত করে ফেলেছিল। পাখিটা সুন্দর। পাখিটা আমার চাই। আমার ভয় ছিল, পেছনদিকে থেকে গুলি করলে প্ররা পালকে পিছনে যাবে, মাংসে পৌঁছবে না। আমি বন্দুকটা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পাখিটা আবার পাখা গুটিয়েছে। এখন চক্ষু দিয়ে ডানার দুপাশে আলতোভাবে ঘষছে।
আমি পেছন ফিরে দেখলাম, মদিনা আর সখিনা আবার হাঁটা শুরু করেছে। হয়তো তারা আমাকে বন্দুক নামিয়ে ফেলতে দেখে তাক ফসকেছে ভেবে দ্রুত ছুটে আসছে। এখন হাতের ইঙ্গিতে থামতে বললে পাখিটা সচকিত হয়ে উড়ে যাবে। আর যদি এভাবেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি তাহলেও দুই সহোদরার অসাবধান উপস্তিতিতে পাখিটাও পালাবে। আমি মুহূর্তচিন্তা করে স্থির করলাম, না গুলিই করব। আমি আরও দুপা এগিয়ে পা ফাঁক করে দাঁড়ালাম। এখান থেকে পাখিটা মাত্র পঁচিশ গজ দূরে শুকনো মুলিবাঁশের ওপর বসে আছে। যদিও আমি এখনও পাখিটার পেছনদিকেই আছি আমি বু দক্ষিণ পার্শ্বের খানিকটা অংশ আবছা মন দেখতে পাচ্ছি।
