১৮.
দুটো পঙক্তি মনের মধ্যে বেজে উঠছে বারবার :
ভালোবাসা, বেজেছে ঘণ্টার মতো, সন্ধ্যার মন্দিরে।
তোমার যাবার পথ গিয়েছে আমাকে চিরে-চিরে।
১৯.
এক কবিতা-পাঠ ও আলোচনা সভায় প্রায় জবরদস্তি করে ধরে নিয়ে গেলো আমাকে। সেখানে ‘জটিল’, ‘দুর্বোধ্য’, ‘শূন্যসাধক’, ‘অর্থহীন’, ‘অভিব্যাক্তিক’ প্রভৃতি শব্দ-ছড়ানো যে রচনাটি পাঠ করা হলো বোঝা গেলো তার উদ্দিষ্ট আমি বা আমার কবিতা। আমাকে একটা ভাষণ দিতেও বলা হলো। নিজের সম্বন্ধে আমি একটা কথাও বলতে পারলাম না। আমি যুক্তি জানি না।
২০.
ফেরার সময় একটা ছুটন্ত প্রাইভেটকারের পিছনে উড়ন্ত অসম্ভব সুন্দর আমার চেনা যে-মেয়েটিকে দেখে আমি প্রায় চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম— এক মুহূর্ত পরেই খেয়াল হলো : আমি যাকে পনেরো বছর আগে হারিয়ে ফেলেছিলাম একদিন, তার বয়স এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকবে না। এই মেয়ে সেই মেয়ে না। অথচ কী বলবো, মনে হলো একদম এক, অবিকল এক। আমি যুক্তি জানি না।
২১.
রাতে কবিতার একটা শব্দের জন্যে ক্রমাগত মাথা খুঁড়ছি— খুঁজে বেড়াচ্ছি আকাশের নীলিমা থেকে পাতালের কালি অবধি। কিন্তু ঠিক শব্দটি কিছুতেই খুঁজে পাই না। সেই শব্দ, যা দিয়ে সেই শব্দের অতীত এক ক্ষমাহীন স্বর্গে পৌঁছানো যায়। মাথা গরম হয়ে ওঠে।
তখন দরোজায় টোকা পড়ে। তাকিয়ে দেখি, মিনা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি আলো জ্বেলে রেখে, দরোজা খুলে, বেরিয়ে আসি।
সিঁড়িতেই বসে আছে কাজের মেয়েটি। কিন্তু, একী সাজ-গোজ! চমকে উঠি আমি। গভীর করে কাজল-মাখা, আঁট করে শাড়ি পরা। হায়, অবোধ মেয়ে! প্রেম আর কামের তফাত জানে না। তফাত সত্যিই আছে কি? স্বজ্ঞার দৌলতে আমার চেয়ে প্রকৃত জেনেছে ও কি? কিন্তু আমাকে আবার ভালোবেসে ফেলে নি তো? অদ্ভুত মায়া লাগে। বুকের ভেতরে ছিঁড়ে যায় আমার। সমস্ত কাম মরে যায়। লু কীরকম অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ওকে আলিঙ্গন করি। শরীর প্রবেশের সময় আমার কণ্ঠ থেকে আমার অজ্ঞাতে যেন বেরিয়ে আসে ‘ডালিয়া। ডা-লিয়া! ডা-লি-য়া!’
বাতাসে কোনো দূরের ঘ্রাণ, দোতলায় শাসিঁকাচে ক্রমাগত ডাল ঘষটানির শব্দ, ক্রমাগত চৈত্রের পাতা পড়ার শব্দ।
অস্পষ্ট মুখ – মঈনুল আহসান সাবের
একটা অবৈধ স্বপ্ন দেখে শেষরাতে তার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমের মধ্যে এক জনের সঙ্গে ওটা তার হয়ে গেছে।
সে কিছুক্ষণ নিথর পড়ে থাকল বিছানায়। শরীরে কিছুটা অবসাদ, হয়ে যাওয়ার পর এমন হয়। সে ওটুকু অবসাদকে গুরুত্ব দিতে চাইল না। তার মাথার ভিতর তখন অন্য চিন্তা। কিছুটা আশ্চৰ্য্যও সে বোধ করছে। আচ্ছা, লোকটা কে? শামীমা একটু হাসল। সে ওই চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমোতে চাইল। কিছুক্ষণ সে চেষ্টা করল। তার ঘুম এলো না। শেষে সে উঠে বসল বিছানায়। কিছুক্ষণ বসে থাকল। তারপর এভাবে বসে থাকারও কোন মানে হয় না, এই ভেবে সে আবার শুয়ে পড়ল। কিন্তু এই শুয়ে থাকাটা তার অসহ্য লাগল। কী তাহলে সে করবে! শুয়ে থাকাটা অসহ্য, উঠে বসলেও কিছু করার নেই। সে একবার ভাবল বিছানা ছেড়ে নেমে টেলিভিশনটা অন করবে। তাদের টেলিভিশনে প্রায় ৩০/৩৫ টা চ্যানেল আসে। আসে, তবে কটা আর। দ্যাখা হয়। ৩/৪টা চ্যানেল মোটামুটি দ্যাখা হয়, বাকিগুলো হচ্ছে সময় কাটানোর জন্য তাকিয়ে থাকা। যখন হাতে কোনই কাজ থাকে না, যে ৩/৪ টি চ্যানেল মোটামুটি দ্যাখা হয়, সেগুলোতেও যখন দ্যাখার থাকে না কিছু, সে তখন শুয়ে বসে রিমোটের বোতাম টিপে চ্যানেল বদলায় শুধু। তবে কোন চ্যানেলই ২/৩ মিনিটের বেশি দ্যাখে না। আকর্ষণ বোধ করলে কোনটা হয়ত পাঁচ মিনিট। এভাবে অনেক সময় পার হয়ে যায়।
এখন এই ভোররাতে, যখন সে বুঝতে পারছে আর তার ঘুম আসবে না, তখন ওই কাজটি করা যায়—রিমোটের বাটন টিপেটিপে চ্যানেল বদলানো। কিন্তু এখন সম্ভবত ওই কাজটিও ভালো লাগবে না। ভিতরে ভিতরে সে অসম্ভব অস্থির বোধ করছে। আচ্ছা, লোকটা কে? ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর থেকে এই প্রশ্নটা ক্রমশই তার ভিতর তীব্র হয়ে উঠছে। হ্যাঁ সেই লোকটা। যে লোকটার সঙ্গে ব্যাপারটা ঘটে গেল, সে কে? শামীমা আবার একটু হাসল। লোকটা কে—এই প্রশ্নটা তীব্র হয়ে ওঠার কোন কারণ নেই। তবে সে আশ্চর্য হচ্ছে। হঠাৎ করে এতদিন পর কোন কারণ ছাড়া ওই মুখ!
তার অস্থির ওঠাবসায় রকিবের ঘুম হালকা হয়ে গেল। সে জড়ানো গলায় বলল, শামীমা? সে প্রথমবার জবাব দিল না কোন। সে ভাবল ঘুমের মধ্যে কথা বলেছে রকিব। সুতরাং সাড়া না দিলেও চলবে।
রকিব হাত তুলে একটা, চোখ খুলে তার দিকে তাকাল—ঘুম ভেঙে গেছে?
হুঁ। ছোট করে বলল শামীমা। সে একটা হাত রাখল রকিবের চুলে।
হ্যাঁ, মাথায় একটু হাত দিয়ে দাও তো….কখন ঘুম ভাঙল?
শামীমা রকিবের চুলে হাত বুলাতে আরম্ভ করল—এই তো একটু আগে আমারও সারা রাত ভাল ঘুম হয়নি। এপাশ-ওপাশ করলাম।
কাল সারা দিন জার্নি করে এসেছ। ঘুম তো ভাল হওয়া উচিত ছিল।
না। তুমি তো জানোই বেশি ধকল গেলে আমার ঘুমটা ভাল হয় না। আসলে রাতে একটা ঘুমের ওষুধ খাওয়া উচিত ছিল।
ঘুমোও, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
শামীমা রকিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল এবং রকিব সত্যিই এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। তখন হাত সরিয়ে নিল শামীমা। মৃদু ভঙ্গিতে সে বিছানা ছেড়ে নামল। বাথরুমে গেল, বেরিয়ে রান্নাঘরে। চা বানাল এক কাপ। তারপর বারান্দায় এসে বসল। তাদের বাসার সামনে বেশ কিছুটা ভোলা জায়গা। এটা যে একটা কত বড় সুবিধা। সময়ে-অসময়ে তার যখন ভাল লাগে না, সে এই বারান্দায় এসে বসে। তাকিয়ে থাকে বহু দূরে। সে খেয়াল করে দেখেছে তখন তার মন ভাল হয়ে যায়। অবশ্য তার মন তেমন করে খারাপই বা হয় কখন! না, সে মনে করতে পারে না এমন কোন দিনের কথা যেদিন তার মন খুব খারাপ হয়েছিল। তার যেটুকু হয়, সেটুকুকে বলা যায়—মন ভারি হওয়া। সে তেমন কিছু নয়, অল্পতেই ঝেড়ে ফেলা যায়। আর মন আবার খারাপই বা হবে কেন, সে চায়ে ছোট একটা চুমুক দিয়ে দূরে তাকাল, মন খারাপ হওয়ার মতো কিছু তো ঘটে না। আচ্ছা, থাক ওসব মন খারাপ কিংবা ভাল হওয়ার কথা কথা হচ্ছে এতদিন পর ওই মুখ কেন?
