‘হ্যাঁ, তাইতো’ বলে চোখগুলো বড় বড় করে বলল, আমার কথা শুনবে কি করে, আমি গগাব্যাচারার মতো বললাম কেন কেন কি হয়েছে?
—কি আর হবে, ভাগ্যিস আমি দেখলাম। আরো পরে দেখলে কি সর্বনাশই না হয়ে যেত।
-কেন কি সর্বনাশ?
—দেখো অত ন্যাকামো কোর না তো। সকাল বেলা ঐ জানলা দিয়ে ঐ ছুঁড়িটার নাচ দেখছিলে না? ভাবো আমি কিছু বুঝি না? ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না।
সব বৌ-এরই এই একই রোগ, নিজের শাড়ীর মতো নিজের স্বামীটিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে অন্য কেউ তা গায়ে জড়াক তা তারা মোটেই পছন্দ করেন না।
থাক্ স্ত্রীর ধাতানী খেয়ে লুঙ্গির উপর পাঞ্জাবীটা গলিয়ে বাজারের থলিটা নিয়ে বাজারের দিকে রওনা দিচ্ছি। ঠিক এমন সময় রান্না ঘর থেকে সাতবাড়ী শুনিয়ে মধুমতী বলল রুই মাছের মাথা এনো কিন্তু।
মাসের শেষ, রুই মাছের মাথা, মনে মনে গালাগাল দিয়ে বললাম, রুই মাছের মাথা না এনে তোমার মাথা আনবে। বলে বেরিয়ে এলাম।
রাস্তায় নেমেই আবার চোখটা চলে গেল সেই হরিহরবাবুর দোতলার বারান্দায়। তাকিয়ে দেখি শ্যামলী বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। পিঠে ছড়িয়ে আছে একরাশ কালো চুল। যেন কোন তেল কোম্পানীর বিজ্ঞাপনের মডেল। আমার দিকেই চোখ পড়তেই শ্যামলীর ঠোঁটে একটু হাসি খেলে গেল। হঠাৎ আবার মধুমতীর কথা মনে পড়তেই, পেছনের দিকে আমার বাড়ীর বারান্দায় তাকিয়ে দেখলাম মধুমতী দাঁড়িয়ে আছে কিনা। না নেই। তাই আমিও শ্যামলীর দিকে একটু মুচকী হেসে বাজারের দিকে রওনা হলাম।
প্রতি রবিবারই বাজার সেরে আবার সময় শম্ভুর দোকানে কাঁচাপাকা দাড়িগুলো একটু কমিয়ে আসি। সেদিনও শম্ভুর দোকানে গিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে বসলাম। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে কিরকম বুড়ো বুড়ো বলে মনে হলো। সারা। মাথায় কাঁচাপাকা চুলে ভর্তি। গালে এক গাল পাকা দাড়ি। পাকা চুল নিয়ে আর যা কিছু করা যায় কোন সুন্দরী যুবতীর হৃদয় কখনই জয় করা যায় না। স্বামীর চুল পেকে গেল, বৌরাই ম্যানম্যান করে আর প্রেমিকা! ওরা তো পাত্তাই দেবে না। যাই হোক শম্ভুকে বাকীতে চুলটা ভালো করে কলপ করিয়ে নিয়ে, মুখের দাড়ি কেটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজকে দেখে নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। বয়স যেন অনেক কমে গেছে। যাই হোক খোশ মেজাজ নিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা দিলাম।
বাড়ীতে গিয়ে পৌঁছলাম বেলা এগারোটা। আমার পায়ের শব্দ শুনেই মধুমতী মধু বর্জন করে চীৎকার করে বলল, কি হলো বাজারে গিয়ে কি ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?
—তোমার মাথা আনতে গিয়ে সরি; রুই মাছের মাথা আনতে গিয়ে দেরী হয়ে গেল।
মধুমতী কথা বলতে বলতে আমার দিকে তাকিয়ে একবারে ‘থ’। তারপর বলল একি পাকা চুল কালো, হলো কি করে? কলপ করেছ নাকি?
আমি তাড়াতাড়ি খুশি হয়ে বললাম, আমায় বেশ যুবক যুবক মনে হচ্ছে না?
–যুবক! তোমায় ঠিক দাঁড়কাকের মতো দেখাচ্ছে। ময়ূরের পুচ্ছ লাগালে যেমন দাঁড়কাক ময়ূর হয় না, তেমন আধবুড়ো পাকা চুলে কলপ দিলে যুবক হয় না।
শুনলেন তো, আমার স্ত্রীর কথা। সব সময়ই বাঁকা বাঁকা কথা। কোথায় একটু আমায় যুবক বলে প্রেরণা দেবে, তা না, শুধু ব সময় খোঁচা মেরে কথা।
আজকাল একটু স্মার্ট হয়ে চলতে চেষ্টা করি। মেয়েরা আবার একেবারে ল্যালাক্যাবলা ছেলে একেবারেই পছন্দ করে না। তাই ধুতির বদলে একটু প্যান্ট সার্ট সঙ্গে বুট পরে অফিসে বেরই। এই দেখেও স্ত্রী-এর মনে জ্বালা। হঠাৎ একদিন বলল, কি হয়েছে বলতো। তোমায় আজকাল প্রায়ই লক্ষ্য করি বুড়ো বয়সে ছোঁড়া সাজবার সখ হয়েছে। প্রেমে টেমে পড়লে নাকি।
আমি একগাল হেসে বললাম, ঘরে এমন সুন্দরী থাকতে, অন্যদিকে কি করে তাকাই। আর তাছাড়া এখন কি আর প্রেমের বয়স আছে। অমনি গিন্নী মুখ বেঁকিয়ে উত্তর দেয়, ছ্যা প্রেমের আবার বয়স। তোমাদের পুরুষ জাতটাকে একদম বিশ্বাস করি না। যত বুড়ো হয় তত বেশী বজ্জাত হয়।
অমনি আমার মাথাটা টগবগিয়ে ফুটে উঠল। দেখ জাতটাত তুলে কথা বলবে না। আর তাছাড়া তোমার মতো এরকম খিটির-মিটির করা বউ ঘরে থাকলে, স্বামীরা তো বিগড়ে যাবেই।
আমার কথা শেষ হতে না হতেই আমার মধুমতী গর্জে উঠে এমন বলল, কি আমি তোমার সাথে খিটির মিটির করি। এই আওয়াজে পাড়ায় যেন একটা ছোটখাটো ভূমিকম্প হয়ে গেল।
থাক পরদিন অফিসে বেরোচ্ছি, ঠিক এই সময় আমার গিন্নী আবার গ্যাসের চোতাটা ধরিয়ে দিল, যাওয়ার সময় একটু বুক করে যেতে। ব্যাস্! অফিসের বারোটা, ভাগ্যিস সরকারী অফিরে কেরানী।
তারপর নাচতে নাচতে গিয়ে হাজির হলাম গ্যাস দাদার কাছে। পাড়ার কাছে একটা বাড়ির গ্যারেজ ঘরে গ্যাস ঘর। ঐ ঘরে একটা টেবিল চেয়ারে নিয়ে বসে আছেন। আমাদের গ্যাস দাদা, আর তার সামনে এক বিশাল লাইন। গ্যাসের লাইনে বাই প্রশ্ন কর্তা আর সব প্রশ্নেরই উত্তর দিয়ে চলেছে গ্যাস দাদা। সব প্রশ্ন কর্তারই একই প্রশ্ন দাদা কবে পাঠাচ্ছেন? বাচ্চারা কাদলে যেমন বড়রা টফি নিয়ে বলে আর কেঁদো না সোনা! আর কেঁদো না।চ ঠিক তেমনি গ্যাস দাদা বাইকে বলে চলেছেন এই দু-চার দিনের মধ্যেই পেয়ে যাবেন। ছেলেদের লাইনের সাথে ফুরফুরে সব সুন্দরী মহিলাদের লাইন। সব নতুন সংসার করছে। স্বামীরা সব অফিসে বেরিয়েছে। আর গিন্নীরা সুন্দর পারফিউম মেখে গ্যাসের দোকানে লাইন। হঠাৎ দেখি লাইনে সেই আমার পাশের বাড়ির শ্যামলী।
