শ্যামলীকে দেখেই মনটা কি রকম পাক দিতে শুরু করল। কি করে শুরু করি কথা, যদি কথা বলতে গিয়ে কোন অসংলগ্ন কথা বলে ফেলি, তাহলে তো আর রক্ষা নেই। এই বয়সে পাবলিকের হাতে মার খেয়ে আমাকে এই ধরাধাম ত্যাগ করতে হবে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি আমার পায়ের সামনে একটা সুন্দর রুমাল পড়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি তুলে শ্যামলীর দিকে হাসি হাসি মুখ করে বললাম, এটা কি আপনার?
শ্যামলীও হাসির বিনিময়ে হাসি দিয়ে বলল, হ্যাঁ আমার। তারপর আমার হাত থেকে রুমালটা নিল। রুমালটা নেওয়ার সময় শ্যামলীর নরম নরম হাতের ছোঁয়ায় আমার শরীরের রক্তে এক শিহরণ খেলে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে শ্যামলীর সাথে আলাপ জমাতে শুরু করলাম। আর মনে মনে আমার মধুমতীকে ধন্যবাদ দিলাম। মধুমতী যদি আমায় আজ এই গ্যাসদাদার কাছে না পাঠাত তাহলে শ্যামলীর সাথে আলাপ করার সুযোগই পেতাম না। কিছুক্ষণের মধ্যই আমাদের দুজনেরই গ্যাসদার সাথে কথা চুকে গেল। তারপর ঐ গ্যারেজ ঘর থেকে কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে এবং দিয়ে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়ালাম।
শ্যামলী আমায় জিজ্ঞাসা করল, আপনি কোথায় যাবেন?
—আমি ডালহাউসী।
—ভালই হলো আমিও ঐ পথেই যাব। চলুন একসাথে যাওয়া যাক। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়ালাম বাস স্ট্যাণ্ডে তখন লোকে লোকারণ্য। সবাই বাসে উঠবে। বাস আসছে, কিন্তু তাতে খুব কম লোকই উঠতে পারছে। বেশীর ভাগ বাসই বাদুড় ঝোলা।
তারপর অনেক কষ্টে একটা বাসের মধ্যে আমি আর মধুমতী দেহের কসরৎ দেখিয়ে উঠলাম। বাসে আর তিল ধারণের জায়গা নেই। শ্যামলীর শরীরটা আমার শরীরের উপর লেপটে আছে। আমার বুকের উপর পড়ে আছে ওর সুগন্ধী একরাশ কালো চুল। তার গন্ধে আমি মোহিত হয়ে উঠেছি। জীবনটা যেন মনে হচ্ছে কবিতা। হঠাৎ মনে হয় একি করছি আমি। এ পাপ। ঘরে আমার স্ত্রী আছে। শ্যামলীর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাই। কিন্তু নিরুপায়। বাসের ভীড়ে এপাশ থেকে ওপাশ হবার উপায় নেই। কি সুন্দর নরম তুলতুলে শরীর। মনে হয় যেন ভগবান মোম আর মাখন মিশিয়ে শ্যামলীর শরীর তৈরী করেছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে হাজির হলাম ডালহাউসী। সময় যেন হুহু করে চলে গেল। রোজ বাসে যেতে যেতে জ্যামে পড়তে হয়। কিন্তু আজ একদম জ্যাম নেই। বাস থেকে আগে নেমে রাস্তায় পা রেখেছি। শ্যামলী নামতে গিয়ে হঠাৎ দেখি পড়ে যাচ্ছে, আমি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে হাতটা এগিয়ে দিলাম। আমার হাতের উপর ভর দিয়ে টালটা সামলে নিল। এদিকে আমার হাতটাও ধন্য হলো।
তারপর দুজনে নেমে কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেলাম। আমি আমার অফিসে ঢুকে গেলাম, আর আমার অফিসের পাশের বিল্ডিং-এ একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে শ্যামলী। সত্যি একথা ভাবা যায় না। যাক আসবার সময় আবার আমরা দুজনে। ফিরি। শ্যামলীর অফিসে রোজ নটায় হাজিরা। কিন্তু আমার সরকারী অফিস যখন হোক গেলেই হয়। বডিটাকে একসময় অফিসের মধ্যে শো করতে পারলেই ব্য। মাঝে মাঝে অবশ্য অফিসের হেডক্লার্ক যাকে আমরা সম্মান দিয়ে বড়বাবু বলি তিনি আমায় অনেকদিন বলেছেন যে একটু তাড়াতাড়ি আসবেন। কিন্তু আমি ওসব কথা কোনদিনই কর্ণপাত করিনি। এ পৃথিবীতে বাঁচতে গেল সব কথা কানে শুনতে নেই। যদিও তা ঢোকাই তা অপর কান দিয়ে আবার বাতাসে ছেড়ে দি। আমার দেরীতে আসার সুবাদে অনেকই আমায় মাঝে মাঝে রঙ্গ রসিকতা করে (অর্থাৎ যার অপর কথা টিপ্পনী কেটে) আমার নাম দিয়েছিল ‘লেটুবাবু’। কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি যেমন চলছি তেমন চলব। চাকরীতে যাওয়ার কোন ভয় নেই। এতো আর প্রাইভেট ফার্ম না। যে একটু দেরী হলেই মাইনে কাটা। তার পরেও যদি বেয়াদপি করি, চাকরী নট। এ হচ্ছে সরকারী অফিস। একদিনের কাজ দশদিনে করবো, মাঝে মাঝে ওভারটাইম করবো। আর মাঝে মাঝে অফিস থেকে মাইনে বাড়ানোর দাবীতে বিরাট মিছিল করে সারা কলকাতার বুকে ট্রাফিক জাম করে অবশেষে এসপ্ল্যানেড ইষ্টে বিরাট জনসমাবেশে যোগ। বড় বড় নেতাদের বড় বড় বুলি। আমি অবশ্য বড় বড় নেতা না হলেও ন্যাতা তো বটে। অফিসে রাজনীতি করি। তাই রাজনীতি নেতাদের আজকাল খুব একটা কেউ খাটতে চায় না। একটা প্রচলিত কথা আছে যে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, আর আজকাল রাজনীতির দাদারা ছুঁলে একশ ঘা।
যাক্ আপনাদের সামনে আমার উপর বৈপ্লবিক চরিত্রের পরিচয়টা দিতে চাই না।
এবার আমার ফুলটুসি, আমার প্রাণকুমারী শ্যামলির কথা বলি। এখন রোজই সকাল আটটার মধ্যে বাস-স্ট্যাণ্ডে পৌঁছে যাই। ঐসময় শ্যামলীও বাসে ওঠে। একই সাথে দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কখনো বা ভাগ্যে কুলোলে পাশাপাশি বসে দুজনে সুখ দুঃখের কথা বলতে বলতে অফিসে যাই। এ যে কি থ্রিলিং তা ঠিক মুখে বলা যায় না।
আমাকে এত সকাল সকাল দেখে অফিসের লোকেরা তো একেবারে ‘থ’। কি হলো! আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলো এর রহস্য। কিন্তু সত্যি কথাটা বলতে পারলাম না।
অফিসে থেকে ফেরার সময়ও প্রায়ই আমরা একটুখানি হেঁটে আউটট্রাম ঘাটে গিয়ে পাশাপাশি বসতাম। নানারকম কথা বলতাম। সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে ওর দিকে হাত বাড়ালাম। শ্যামলী অবশ্য এসব কিছু আপত্তি করত না। মনে হত শ্যামলীও বোধ হয় আমাকে ভালবাসতে চাইছে। কেউ কি কোনদিন একা বাঁচতে পারে। সবাই সঙ্গ চায়, সঙ্গী সঙ্গীনী চায়। প্রায়ই লক্ষ্য করতাম, শ্যামলীর মধ্যে একটা পাপের প্রবল আকর্ষণ আছে।
