কাবেরীর এমন প্রশ্নে আহত হয়ে তুলিকা বলল, এ বাড়িতে আসতে হলে আমাকে যে তোর কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে, আমার জানা ছিল না। তুই বলে ভালোই করেছিস। এবার থেকে…
আমি তোকে অনুমতি নিতে বলিনি। না জানিয়ে এলে আমার সঙ্গে তোর দেখা হবার সম্ভাবনা কম।
জানি। তুই আজকাল রাত এগারোটার আগে বাড়ি ফিরিস না। অবশ্য তুই কোথায় যাস, কি করিস, আমি বলতে পারছি না। তবে আমার মনে হয় তুই বোধহয় একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলছিস। যে সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাকে তুই আবার বাঁচিয়ে তুলেছিস কোন আশা নিয়ে? তুই সুশান্তদার…
কাবেরী তুলিকার এই ভূমিকাকে মেনে নিতে না পেরে বলল, আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে তুই নাক গলাতে চাইছিস কেন? তুই যদি এই কথা বলতে আজ এখানে এসে থাকিস, তবে আমি তোকে বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুই আমাকে না জানিয়ে আর কোনওদিন আসিস না।
আমি আসবো না। কিন্তু তুই কি ভুলে গেছিস, একদিন আমাদের বলেছিলি তোর এই গোপন সম্পর্কের কথা সুশান্তদার কাছে ফাস না করে দিতে? সেদিন আমরা তোর ভবিষ্যতের কথা ভেবে সবকিছু গোপন করে রেখেছিলাম। আজ সুশান্তদা আমাদের অভিযুক্ত করতে চাইছেন। আমরা কি জবাব দেব বলতে পারিস?
তুলিকা এভাবে গোপনীয়তার আড়াল ভেঙে সুশাস্ত্র কাছে আসল সত্যকে উন্মোচিত করে দেবে ভাবতে পারেনি কাবেরী। কিন্তু শ্যামলমামার উষ্ণ স্পর্শ ছড়িয়ে আছে সারা শরীরে তাকেই বা অস্বীকার করবে কিভাবে? সুমিত্রামাসিকেই দায়ী করতে চায় কাবেরী। তিনি কেন ঘনিষ্ঠতা বাড়াবার সুযোগ করে দিয়েছে? কাবেরীকে নির্বাক দেখে তুলিকা উত্তরের প্রত্যাশা না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সুশান্ত এই মুহূর্তে কাবেরীকে একজন বেশ্যা ছাড়া অন্য কোনও বিশেষণে ভূষিত করতে পারলো না। সুশান্ত ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, কাল থেকে তুমি বাড়িতে ফিরো না। ওই পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে থেকো। ওখানে থাকলে তুমি তোমার ইচ্ছেমতো শয্যাসঙ্গী বদলাতে পারবে।
কাবেরীর সামাজিক অস্তিত্বে আঘাত করে একেবারে নিঃস্ব করে দিতে চাইলে সুশান্ত। তবু প্রবািদের ভাষা খুঁজে পেল না কাবেরী। শ্যামলমামা কাছে এসে দাঁড়ালে শরীর যে সঙ্গ পিপসায় ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে। এই সংসার, এই পরিবেশ, যার সান্নিধ্যে এতদিন ধরে প্রতিটি মুহূর্তে কাটিয়েছে, তাকে অস্বীকার করে বেরিয়ে যেতেও দ্বিধাবোধ করে না। শুধুমাত্র শরীরী আকর্ষণ! নাকি একদিন যাকে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে, সেদিনের শূন্যতা আজ অত্যন্ত প্রবল হয়ে উঠে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। ফিরে পাওয়া হারানো পুরুষকে।
রাতে কাবেরী সুশান্তর পাশে এসে শুতেই সুশান্ত বিছানা ছেড়ে উঠে গেল। সাফায় শুয়ে সুশান্ত বলল, আমার পাশে শোবার অধিকার নেই।
কাবেরী হঠাৎ একা হয়ে গেল। জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ও কি কোনও পুরুষের জন্য প্রতীক্ষা করছে? সুশান্ত তাকিয়ে দেখলো, অন্ধকারে কাবেরীকে সত্যিই একজন বেশ্যার মতো মনে হচ্ছে। এখন ওর চাই একজন পুরুষ-সঙ্গী।
পরকীয়া প্রেম – উজ্জ্বল কুমার দাস
অনেক অভিধান ঘেঁটে, আমার স্ত্রী-এর নাম রেখেছিল, আমার শ্বশুরমশাই ‘মধুমতী’। তখন অবশ্য সবই জড়পিণ্ড। অয়েল ক্লথের উপর এক টুকরো ছোট কথা আর তার উপর আমার প্রাণের বউ। কিন্তু তিনি যেই ধেড়ে হলেন, ব্যস্!
যখন আমি বিয়ে করবার জন্য আমার স্ত্রীকে প্রথম দেখতে গেলাম তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি নাম আপনার? তখন লাজুক লাজুক মুখে বেশ মিহি সুর টেনে বলল মধুমতী সাহা।
আমার কানে তখন এমন সুর বেজে উঠল, যে মনে মনে বললাম আহা আহা..। কিন্তু বিয়ের তেরাত্তির পেরোতে না পেরোতেই মধুমতীর খোলস ছেড়ে সংসারের সার্কাসে ভানুমতীর খেলা দেখাতে শুরু করে দিল। তখন মধুমতীর কোথায় সেই মধু, আর কোথায় সেই মতি। সব গুবলেট।
তারপর তো কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার স্ত্রী-এর শরীরে যাবতীয় রোগের আড্ডা বাসা বাধতে শুরু করল। দিনে দিনে গায়ে গতরে ফুলতে শুরু করল যেন ঠিক বম্বের টুনটুনের দ্বিতীয় সংস্করণ। তারপর এসে উপস্থিত হলো বাত, দন্তশূল, অম্বল ইত্যাদি। সব যেন হাত ধরাধরি করে লাইন ধরে আসছ আর যাচ্ছে। এ যেন এক নিরন্তর গতি। জীবনটা একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে ভাবি বিয়ে করে কিই না ভুল করেছি। কিন্তু এ ভুল সংশোধন করবার কোন উপায় নেই। ভুল সংশোধন কেবলমাত্র পরীক্ষার খাতায় চলে, কিন্তু জীবন খাতায় একদম চলে না।
কিছুদিন হলো আমাদের পাশের দোতালায় হরিহর বাবুর একখানা ঘরে একজন আটাশ-তিরিশ বছরের অবিবাহিতা মহিলা ভাড়া এসেছেন, একলাই থাকেন। ঘরটা আবার আমার শোবার ঘর থেকে বেশ পরিষ্কার দেখা যায়। দেখতে খুব একটা মন্দ নয়। ছুটির দিনে প্রায়ই আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি। একদিন আমার শ্যামলী ও ঘরের মধ্যে হাল্কা সুরে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটা গেয়ে চলেছে। আর আমি ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছি। হঠাৎ দেখি আমার পিছনে আমার স্ত্রী মধুমতী কর্কশ সুরে চেঁচিয়ে বলল, কি গো কখন থেকে যে ডাকছি বাজারে কখন যাবে, তা কানে কোন কথাই ঢুকছে না, ঐ দিকে কি অতো মন দিয়ে দেখছ দেখি, বলে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে শ্যামলী নেচে সেই গানটা গাইছে, ব্যাস–
