কেন ভালোবাসার অভিনয় করে প্রতারণার খেলায় মেতে উঠেছিল কাবেরী? শ্যামলকে বিয়ে করা সম্ভব ছিল না। অবৈধ সম্পর্ককে সামাজিক স্বীকৃতি দিতে চাইলে কাবেরী কারোরই সমর্থন পেত না। শ্যামলের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছিল। শ্যামল প্রত্যাশা না মেটায় অভিমানে আহত হয়ে নিজেকেই দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সারাজীবন উপবাসী থেকে জীবনপিপাসা না মেটানোর পথও বেছে নেওয়ার পক্ষপাতী ছিল না কাবেরী। সেই নিঃসঙ্গ মুহূর্তে কাবেরী কাছে পেতে চেয়েছিল একজন পুরুষকে। তখনই ওর জীবনে আসে সুশান্ত। এক অনিশ্চিত জীবন ছেড়ে নিরাপত্তা খুঁজে পাবার আকাঙ্ক্ষায় কাবেরী আঁকড়ে ধরেছিল সুশান্তকে। তাকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছিল সুশান্ত, কোথাও ছলনার আভাস খুঁজে পায়নি। বিশ্বাস করেছিল কাবেরীকে। এমন আত্মনিবেদনের মধ্যে বিরাট ফাঁকি লুকিয়েছিল, কি করে বুঝবে সুশান্ত?
সুশান্তর মনে অশান্ত ঝড় বয়ে চলেছে। কাকে শোনাবে প্রতারিত হবার কাহিনী? কিন্তু সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেলে নীরবতার কাছে আশ্রয় কি সুশান্তকে স্বস্তি দিতে পারবে?
তুলিকা এসেছিল কাবেরীকে গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্ন করতে। কাবেরী কোথায় গেছে জানতে চাইলে সুশান্ত বলল, তোমার দিদির খবর আমি রাখি না। ওর সঙ্গে দেখা করতে হলে রাত এগারোটার পর তোমাকে আসতে হবে। এত রাত পর্যন্ত ও বাড়ির বাইরে থাকে, অথচ আপনি কিছু বলেন না?
সুশান্ত আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। এতদিনের জমানো ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো বুক থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলো। সুশান্ত বলল, তোমরা আমাকে ঠকিয়েছ। আমার বিশ্বাসকে নিয়ে প্রতারণা করেছ। আজ এসেছ আমাকে…
তুলিকা এমন আক্রমণাত্মক ভঙ্গীতে সুশান্তকে দেখে খুবই অবাক হয়ে বলল, কি হয়েছে সুশান্তদা! আমি কি কোনও অপরাধ করেছি?
অপরাধী তুমি একা নও, তোমরা সবাই। তোমার দিদি যে অন্য কারোর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল, সে ঘটনা চাপা দিতেই তোমরা আমাকে বেছে নিয়েছিলে। আমি তোমাদের কাছে খেলার পুতুল ছিলাম, তাই না? তোমরা সবকিছু গোপন করে রেখে আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছ। তোমরা পারবে আমার হারানো দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে? আমি এখন প্রতি মুহূর্তে যন্ত্রণার আগুনে পুড়ছি। আমি কি করবো জানি না। পরিস্থিতি অসহ্য হয়ে উঠলে আমাকে হয়ত শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে হবে।
তুলিকা বুঝতে পেরেছে কে এই পরিণতির জন্য দায়ী। শ্যামলমামা কেন এত বস্ত্র পর কলকাতায় ফিরে এসে আবার দিদির দিকে হাত বাড়াতে চাইছে? নিজেরও
তো সংসার রয়েছে। এ বাড়ির ঠিকানাই বা ওকে কে দিয়েছে?
তুলিকা জিজ্ঞেস করলো, এখানে শ্যামলমামাকে কে নিয়ে এসেছিল?
সুমিত্রা মাসি। তারপর থেকেই এ বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করলো। সপ্তাহে পাঁচ দিন। অফিস থেকে চলে আসে প্রতিদিন দুপুর দেড়টা-দুটো নাগাদ। বাড়িতে তখন একা কাবেরী। ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর কোনও বাধা থাকে না। দু’জনে নিশ্চিন্তে দৈহিক সান্নিধ্য উপভোগ করে। আমার নজরেও পড়েছিল। আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি। এই ব্যাপার নিয়ে চেঁচামেচি করলে বাড়ির অন্য ভাড়াটে বিদ্রুপের খোরাক পেয়ে যাবে। এমন কেচ্ছা নিয়ে রসালো আলোচনায় সকলে মেতে উঠবে।
কিন্তু প্রতিদিন দুপুরে দিদির কাছে যে পুরুষ আসে, তাকে নিয়ে কৌতূহল জাগবে না, এ কথা কি আপনি বিশ্বাস করেন? অস্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে না উঠলে কেউ কি প্রতিদিন আসে? আপনি বৃথাই গোপন করে রাখার চেষ্টা করছে। আমার ধারণা, শুধু এই বাড়ির সকলে নয়, পাড়া প্রতিবেশীরাও জেনে ফেলেছে। আপনার কানে কি কখনও কোনও কটুক্তি গিয়ে পৌঁছয়নি।
তুলিকা ঠিকই অনুমান করেছে। কয়েকদিন আগে অফিস থেকে ফেরার পথে সুশান্ত দেখেছিল ওর দিকে লক্ষ্য করে পাড়ার একটি যুবক বন্ধুদের বলছে, উনি চরতে বেরিয়েছে সেই দুপুরে। বেশ ফুর্তিতে আছেন।
কাবেরীই যে ওদের উপহাসের পাত্রী, বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি সুশান্তর। ওদের কোনও দোষ নেই। ওদের উৎসাহিত করার জন্য প্ররোচনা যুগিয়েছে কাবেরী নিজেই।
সেদিনই সুশান্ত কাবেরীকে সংযত করার প্রয়াসী হয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। কাবেরী বলেছিল, তুমি যদি আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করো আমি আত্মহত্যা করব।
স্ত্রীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে, পুলিস-আইন-আদালত জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। সেই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে করতে নিজেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। কাবেরী শেখানো অস্ত্র প্রয়োগ করে সুশান্তকে পুরোপুরি বশে আনতে পেরেছিল। কাবেরীর গর্ভে যদি শ্যামলের ঔরসজাত সন্তান আসে, তাতে একটুও অবাক হবে না সুশান্ত। কিন্তু অবৈধ সন্তানের পিতৃত্বের দায় ওকেই বহন করতে হবে লোকলজ্জার ভয়ে। ওই নির্মম ও নিষ্ঠুর পরিহাসের শিকার হয়েও কাবেরীর সঙ্গে ওর সব বন্ধন ছিন্ন করার কথা এখনও ভাবতে পারেনি সুশান্ত।
তুলিকা চলে যাবে। ন’টা বাজে। বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে। দিনকাল ভালো নয়। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে সংঘর্ষ ক্রমশই বাড়ছে। রাতের অন্ধকারে ও যেন ওদের প্রতিদিনের উৎসব। ঘর থেকে বেরোতে যাবার মুখে তুলিকা আচমকা মুখোমুখি হয়ে গেল কাবেরীর। তুলিকাকে দেখেই কাবেরী একটু থতমত হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, তুই আমাকে না জানিয়ে হঠাৎ এসেছিস কেন?
