আহ, কতো টুকরো-টুকরো বিভক্ত হয়ে গেছি আমি। দিনের টুকরো, রাতের টুকরো, বাস্তবের টুকরো, স্বপ্নের টুকরো। টুকরো লাইন ছাড়া আমার দেবার আর কিছু নেই। এমন করে নিজেকে আত্মবিভক্ত আর কে করেছে? আমি তো ঈশ্বর নই, টুকরোগুলো জোড়া লাগাবো কী করে। নিজের জন্যে করুণার জল এসে যায় আমার
ওকে শাস্তি দাও— ওকে শাস্তি দাও ওকে শাস্তি দাও–
ওকে…
যে কাঁদে বিনিদ্র রাতে আমি ওকে করেছি আলাদা,
শিল্প রচা অন্য-আমি বিদেশী দূরত্বে আছি বাঁধা,
ওকে তুমি শাস্তি দাও, আমি ডুবে থাকি তীব্র শোকে।
অনন্তই হয়তো জীবনে–যদি একজনের কেন্দ্রে স্থিত হতো জীবন। নাকি এই আমাদের নিয়তি?
জানালা দিয়ে চোখে পড়ে, আকাশে চাঁদ উঠেছে একগুচ্ছ সাগরকলার মতো জ্বলজ্বলে সোনালি-হলুদ। তার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখে একফোঁটা পানি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি একসময়।
১২.
মাঝরাতে কি গভীর বৃষ্টি নেমেছিলো? হরিণেরা জলপান করতে এসেছিলো মানুষের তৈরি লেকে? মনের মধ্যে একটি মুখের মতন সেই বৃষ্টিতে ভেসে যায়। ছাদের ওপর ঝিমিয়ে আসে জীবনের গহন নর্তকী। যেন নিশি-পাওয়া মানুষের মতো এসে বসি টেবিলে—
কখন প্রহর যায়, চন্দ্ররাত্রি ঘুমে ঢলে আসে,
দুই আমি জেগে ঘুমোবার সাধ ভালোবাসে;
ঘুমে-জাগরণে তারপর পরস্পরের সকাশে
এসে মেশে দু’জন আলাদা আমি— দুই পরস্পর;
ঘুম-চোখে দ্যাখে : এক চুল-চোখ-মন-কণ্ঠস্বর।
আধেক আমার জন্ম হয়ে ওঠে আধেক ঈশ্বর।
১৩.
আম্মা বললেন, এই ক’টা টাকা? এই ক’টা টাকায় আমি মাস চালাবো কী করে?
দেখি, আমি বলি, পরে আর-কিছু দেবোখন।
পেয়ে আর দিয়েছো তুমি। সে তো সব মাসেই শুনি। পর আর আসে না তোমার। তোমাদের সংসার তোমরাই নাও, বাবা আমাকে এই আজাব দেওয়া কেন?
১৪.
বিবি একদিন, রাত্রিবেলা অতিমৃদু অতিমধুর কণ্ঠে আমাকে শোনার ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’। ফিরে-ফিরে অনেকক্ষণ ধরে এই একটি গান গায়। আমার মনে হয়, আমার শ্রবণে উদিত হলো এক অমূলক, যার ঝিরিঝিরি শিরিশিরি এ জীবনে থামবে না আর। আর, যতোক্ষণ গান চলতে লাগলো, আমি মনে-মনে ভাবলাম, এই গানের কথার মধ্যে বিবির আত্মতা মিশে গিয়েই কি একে এমন অপরূপ করে তোলে নি!
গান শেষ হতে বিবি আমার দিকে তাকালো। আমি স্পষ্ট বুঝলাম, আমার প্রিয় আরো কিছু গান গাইবার জন্যে সে আজ প্রস্তুত। বললাম, বিবি, এই গানের মাধুরী আমি নষ্ট হতে দেবো না। আজ আর কোনো গান না। কিন্তু, একটা কথা বলবে আমাকে বিবি? এই গানটা তুমি নির্বাচন করলে কেন?
বিবি মুখ নত করে রইলো। তারপর হঠাৎ মুখ তুলে বললো–আমি দেখলাম ওর চোখের হ্রদের চিকচিকে জলে সোনা রঙের চাঁদ উঠেছে–বললো স্যার!
মুহূর্তে আমি বুঝলাম, শব্দ কিছু নয়, এই যে কবিতার শব্দের জন্যে এতো প্রাণপাত শ্ৰম–সে কিছু নয়; বুঝলাম শব্দের লক্ষ্য হচ্ছে শব্দের অতীতে যাওয়া।
চোখ বুজে এলো বিবির, নত হয়ে এলো ওর আনন আমার মুখের দিকে, আমার ঠোঁটের ওপর ওর ঠোঁটের প্রথম কম্পন আমি যেন আত্মার ভিতর দিয়ে শুনতে পেলাম। বিহ্বল আমার ভিতর থেকে উচ্চারিত হলো, ডালিয়া!
মুহূর্তে সোজা হয়ে বসলো বিবি, এক মুহূর্তে নিজেকে ঠিক করে নিলো, কঠিন অবোধ্য পরিষ্কার গলায় বললো, আমি বাড়ি যাবো।
আমি কিছু বলতে পারলাম না, একবার জিজ্ঞেস করতে পারলাম না কী হলো, আমার অপরাধের জন্যে মুখ ফুটে একবার ক্ষমা চাইতে পারলাম না।
অনেকক্ষণ পরে শুধু বললাম, তোমার কাছে একটাই দাবি আমার। এতো রাতে তোমার একা বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো।
বিবি শুধু বললো, ঠিক আছে। আর কোনদিন আপনি আমাদের বাড়িতে আসবেন না।
আমি কোনো জবাব দিতে পারলাম না। সারা রাস্তা নীরব থাকলো বিবি। রিকশা থেকে নেমে নীরবে সোজা বাড়ির ভিতরে চলে গেলো।
১৫.
আমার শুধু টুকরো পঙক্তি আসে। আমি আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ একটি কবিতা লিখে উঠতে পারি নি। সমস্ত টুকরোগুলো জুড়তে গেলে আমরা আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যায়। জীবনটাকেও বড়ো বেশি এলোমেলা করে ফেলেছি। বড়ো সাধ হয়, একটি সম্পূর্ণ শান্তিময় জীবন সৃষ্টি করবো নিজের জন্যে। আ, স্বপ্নই রয়ে যায়। আমার জীবন, আমার কবিতা সবই এলোমেলো হয়ে রইলো। সবই এক সন্ধ্যার ঘোরের মতো যে সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত গেছে, কিন্তু চাঁদ তখনো ওঠে নি। সময় ছুটেছে দুরন্ত এক ঘোড়ার মতো। তার পায়ের নিচে আমার জীবনের শতশত টুকরো স্পন্দিত হল, শুধু গ্রথিত হয় নি একটি মালায়। মালা ছিঁড়ে পুঁতিগুলো ঝরে পড়েছে স্বপ্নে, বাস্তবে, খাটের নিচে, আলমারির তলায়, কাদায়, নক্ষত্রে। কিন্তু কেন্দ্রীয় পরিধি নেই কি কোথাও? কোনো এক জায়গায় আমিও কি নই টান করে বাঁধা? সবই কি শেকড় ছেঁড়া? সবই কি ভেসে যাওয়া? নাকি আমাদের জন্মের আগেই সব সুগোল-নিটোল চিরতরে চূর্ণ হয়ে গেছে?
১৬.
বিবি, মাফ করো আমাকে। মিনা, মাফ করো আমাকে। কাজের মেয়ে, মাফ করো আমাকে। কবিতা, আমাকে মাফ করো। রাত্রি, আমাকে মাফ করো। তোমাদের সবার মধ্যে অন্য-এক কেন্দ্রীয় ধ্যানের প্রতিরূপ খুঁজে ফিরেছি আমি। তোমাদের সবার প্রতি অন্যায় করেছি।
১৭.
সন্ধ্যার মতো বিষণ্ণ, উন্মাতাল আর স্মৃতিসঞ্চারী আর কে আছে? সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে নেই কোনো দিন। হয় ফিরতে হয় অনেক বেলা থাকতে, না-হয় সন্ধ্যা পার করে দিয়ে। সেদিন সেই ভুলই করলাম। যানে যন্ত্রে উন্মথিত এক রাস্তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে সরু একটা গলিপথ, দেখে থমকে উঠলাম। এই-তো সাঁই পাড়ায় যাবার সেই বাঁকা রাস্তাখানি। মসজিদের পাশ দিয়ে, পুকুরের পাশ ঘেঁষে, ধুলো ওড়ানো এই পথটাই তো চলে গেছে আমাদের দেশগাঁয়ের বাড়িতে। সেই আটচালার সামনে দহলিজ-ঘর, দাদা হুঁকো হাতে, লোকজন সব বসে। ভেতরে ধানের গোলা। ঢেকির পাড় পড়ছে। সামনে বিশাল গোলাপখাশ আমগাছ। সেই গাছে এক পাগল কোকিল ডেকে চলেছে তো চলেছেই যতোবার সে ডাকছে ততোবার আনন্দের ঝলমলে মখমলের গা বেয়ে এক একটা হিরের আংটি গড়িয়ে পড়ছে শাদা বেদনার পাথরে। রিকশা থেকে লাফিয়ে নামছিলাম প্রায়, এমনিভাবে জায়গাটা পেরিয়ে গেলাম।
