ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে রাক্ষুসী সূর্য মাথায় নিয়ে, অফিস থেকে রুটিন মতোই বাড়ি ফিরছিলো। সূর্যের গনগনে আঁচে ঝিমঝিম করছিলো মাথা। শহরের ওপর আছড়ে পড়া উজ্জ্বল আলো যখন কখনো নীল, কখনো সবুজ কখনো বেগুনি, হলুদ, বেগুনি নীল, কমলা….বিভিন্ন আকৃতি নিয়ে ঘোর লাগিয়ে দিচ্ছিলো চোখে, তখনই সেই ভিবজিওরের মাঝখান থেকে চিৎকার করে উঠেছিলো একটি মার্সিডিজ গাড়ি-হেই মইন-হেই
নিজের নামটা টং করে মস্তিষ্কের মধ্যে ধাক্কা খায়। ঘোর লাগা চোখে মইন উত্তপ্ত শহরের চলমান যন্ত্রগুলোর ওপর দৃষ্টি বোলায়। সাত রঙের মাঝখানে একটি মার্সিডিজ। হাত নাড়ছে পুতুল। এক গাদা রিকশা, গাড়ি, রাস্তার পাশে স্তুপাকার দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা, কাঁচা মাংসের গাড়িসহ কসাইয়ের গাড়ি, একঝাক কুঁজো বিকলাঙ্গ ভিক্ষুকের মাঝখানে পুতুল স্বপ্নের মতো হাত নাড়ছে। রিকশা থেকে লাফিয়ে নামে মইন।
ক্লাসমেট ছিলো, মইন একতরফা দুর্বল ছিলো, বহুদিন পর দেখা। ওর শীতল গাড়িতে বসে, সেন্টের ভুর ভুর গন্ধে মইন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এরপর লে হালুয়া! দুপুরে হোটেলে রুটি-মাংস, বিকেলটা অনেকদিন পর ক্রিসেন্ট লেকে, সন্ধ্যার পর ওর নির্জন ফ্ল্যাটে, এক পেগ, দুই পেগ, তিন পেগ-। মইনের পা গর্তের মধ্যে হড়কে পড়ে।
৩.
আমি ঘর নিয়ে ভাবছিলাম। গলির মোড়ে একটি লোক রিকশা থেকে নামছে। আমি গলা বাড়িয়ে দেই, মইন এসে গেছে তাহলে। অন্ধকার পথ দিয়ে হেঁটে আসছে মানুষটি। নিমগাছ আর ঘিঞ্জি বাড়িগুলি রাস্তাটিকে আড়াল করে রেখেছে। ফাঁকে দেখা যাচ্ছে ছায়া মন মানুষটিকে। জানালা থেকে সরে আসি, না, মইন অত লম্বা নয়। নিজেকে শিথিল বিছানায় শুয়ে আমি পুনরায় ভাবনার ভেতর নিমজ্জিত হই। আমার ভাবনা আবারও ঘরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে থাকে। আমার এই ঘরকেই আমি ভালোবাসা সত্ত্বেও আমি আরেকটি নির্জন ঘরের স্বপ্ন দেখি।
যে ঘরে কোন আসবাবই নেই। সেই শূণ্য নির্জন ঘরে থাকবে শুধু থোকা থোকা বাতাস। আমি ভীষণ বিচিত্র মনের মেয়ে। বেশিক্ষণ এক বিষয় আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। মুশকিল হয় মইনকে নিয়ে। সেতো আর আসবাব নয়, যখন তখন নিজের মতো করে সাজিয়ে নিলাম। রীতিমতো শিক্ষিত একজন রক্ত মাংসে গড়া মানুষ, যে দিব্যি আমাকে বাঁ ঠ্যাং দেখিয়ে খুঁটিনাটি আমার অনেক অপছন্দের কাজ নাকের ডগায় সেরে ফেলে। বিয়ের পর এতটা বছর কেটে যাওয়ার পরও প্রথম দিন তাকে যেমন দেখেছিলাম এ থেকে ওর খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। মাঝে মাঝে দাঁড়ি রাখতে বলে, মিলিটারী ছাঁটের চুল ঝাকড়া করে রেখে অথবা এক দুটো লাল শার্ট, ঠোঙ্গা প্যান্ট বানাতে বলে…. ওর একটু পরিবর্তিত রূপ দেখার তীব্র ইচ্ছে হয়েছে আমার। কিন্তু ওই যে রক্ত মাংসে গড়া মানুষ, হাত আছে, পা আছে, মুখ আছে অনুভূতি আছে। বাধা দিতে জানে, পাশ কাটিয়ে চলে যেতে জানে, মোট কথা সে নিজের অনুভত্বকেই সর্বাগ্রে মূল্য দিতে জানে।
মইনের কারণেই আসলে ধীরে ধীরে আমার ভেল্প আলাদা ঘরের স্বপ্ন আসন গেড়ে বসেছে। দুটোর সময় অফিস থেকে ফিরে সে ঘরের মধ্যে শেকড় ছড়ানো গাছ হয়ে। যায়। পই পই করে বলে দেখেছি, বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসো, ফ্রেশ লাগবে, যাবে না।
যাবে না, ভালো কথা, কিন্তু সময় কাটানোর জন্য অথবা ড্রেসিং টেবিল হাতড়ে পুরোনো টাই ক্লিপ খোঁজাখুঁজি করা কেন? নির্দিষ্ট ম্যাগাজিনের খোঁজে তোষক উল্টে পাল্টে একাকার করা কেন? ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার ছাড়া, তোষকের নিচ ছাড়া আমি আমার এই ছোট্ট দুই রুমের কোথায় আমার গোপন জিনিসগুলো রাখি? ওগুলোর একটি কণাও যদি মইনের চোখে পড়ে আমি কি ওর ক্রোধকে কম চিনি? প্রথমেই তার বিশ্রী ভয়াবহরূপ প্রদর্শন করার পর খুব ঠাণ্ডা অথচ স্পষ্ট গলায় বলে উঠবে না—এর পরে আর আমাদের এক সাথে থাকা চলে না!
যাতে ও এই ঘরের সমস্ত আসবাব পত্রের মতোই নিরাপদ শান্তটি হয়ে থাকে, সেই জন্যেই আমার একটি আলাদা ঘর দরকার। সেই শূণ্য ঘরে থাকবে একটিই মাত্র চেষ্টঅবড্রয়ার, যেখানে আমি আমার পুরোনো প্রেমিকদের দেয়া চিঠি, ডাইরী, চমৎকার ভাষায় প্রেজেন্ট করা বই, ওদের সাথে ভোলা আমার কিছু ছবি, এখনকার লেখা প্রাণপনে লুকিয়ে রাখা ডাইরীটি সব সযত্নে রাখতে পারি। এই জিনিসগুলিই আমি আমার এক ব্যাচেলার বান্ধবীর কাছে রেখেছি, যদিও সে বলেছিলো, এগুলো পুড়িয়ে ফেলতে, সংসারের জন্য এইসব বিষয় অত্যন্ত বিপদজনক! কিন্তু আশ্চর্য স্মৃতিকাতর মেয়ে আমি কিছুতেই এসব বিষয় ধ্বংস করার কথা ভাবতে পারি না। সেদিন মইনের ছেলেবেলার বন্ধু মহেন্দ্র একটি বড় এ্যালবাম প্রেজেন্ট করেছে। আমাকে। এত চমৎকার সেটা, দেখেই ভালোলাগায় উছলে উঠেছিলাম। কিন্তু খুলেই কি বিব্রতকর অবস্থা! একদম কোণায় লেখা পরকীয়া প্রেমে পাপ নেই। কৈশোর। পেরোবার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমি আমার প্রেমিকদের প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল, সে যদি রাস্তার পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা উদাস ভিখিরিটিও হয় আমার কাছে তার প্রেমই বড়। কেননা সেই প্রেম আমাকে কেন্দ্র করে। আমি সবচাইতে আমাকেই যে ভালোবাসি।
আমি কলেজে পড়বার সময় থেকেই হেমিংওয়ে, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এসব লেখকের পাঠক হিসেবে ক্লাসমেটদের অমিতাভ, মিঠুন চক্রবর্তীর আড্ডা থেকে নিজেকে আলাদা ভাবতাম। যখন কোন স্ত্রী অন্যের হাত ধরে পালিয়ে গেছে শুনে সমস্ত পাড়ায় ছিঃ ছিঃ চলছে তখন আমি এ থেকে খুঁজে খুঁজে বের করতাম এর পক্ষের কোন যুক্তি। এক সময় স্থির হতাম এই ভেবে—যদি হাসব্যান্ডের সাথে আন্ডারস্ট্যান্ডিং না-ই হবে, তবে আর সমস্ত জীবন ধরে তার সংসার টেনে লাভ কী? গেছে, ভালোই করেছে। যাহোক, কথা হচ্ছিলো এ্যালবাম নিয়ে। এ্যালবামের কোণার লেখাঁটি বিব্রতকর হলেও মইনের ভয়ে কেটে ফেলতে এক কষ্ট হলো আমার, মনে হলো, আমার কোন ব্যক্তিস্বত্ত্বা নেই। আমার নিজস্ব কোন জিনিস থাকতে নেই। এইসব বিষয় থেকেই সেই হাওয়া ঘর আমাকে আঁকড়ে ধরেছে। সেই ঘরে শুধু একটিই চেস্টঅবড্রয়ার থাকবে এবং তার শুধু একটিই চাবি থাকবে…..।
