৪.
ফোমের শয্যায় গোলাপি শাড়ির পুতুল আলতো ভঙ্গিতে শুয়েছিলো। পুতুলকে ওই অবস্থায় দেখে মুহূর্তেই নিজের ঘরের মলিন, দরিদ্র ছাতলা পড়া ঘরে কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো মইনের। নিজের ঘরে এতদিন কড়কড়ে সুতির শাড়ি পরিহিতা খুকিকে বেশ টিপটপ লাগতো। গোলাপি শয্যার গোলাপি পুতুলকে দেখে মনে হয় কী শিশু ছিলাম এতদিন! এতদিন কি সে শুধু খুকীর রক্তমাংস স্পর্শ করার বদলে একদলা ফোম ঘেটেছে? তার সহপাঠিনী পুতুল দশ বছর আগের চেয়েও স্বপ্নময়। বিছানায় গা এলিয়ে ঝকঝকে গ্লাসে রঙিন তরল ঢেলে একটু একটু খাচ্ছে আর অদ্ভুত চোখে মইনকে দেখছে তোমাকে দেখে বেশ হেপী মনে হয় মইন, আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছে তুমি—গুল মারতেও শিখে গেছে দেখছি, প্রিন্টের সোফায় মইনের শরীর এলিয়ে পড়ে, ভূঁড়িটা বেড়ে গেছে চোখে পড়ছে না?
আগে তো টিং টিঙে কলাগাছটি ছিলে, ওই ভূড়িটায় তোমাকে মানাচ্ছে বেশ।
ভূঁড়িতে মানাচ্ছে। মইন কি হাসবে? কি আজব পুতুল! ওর শরীর থেকে কামিনী ফুলের গন্ধ আসছে। মইনের ঘোর লাগতে থাকে ওর সমস্ত শরীর কি নূপুর দিয়ে মোড়ানো? একটু নড়লেই অমন ঝুনঝুন শব্দ হচ্ছে যে! ঘাড়ের কাছে পড়ে থাকা ছোট্ট চুল ঝাঁকায় সে, মনে আছে, আমি যখন প্রথম গাড়ি থেকে নেমেছিলাম তুমি হ্যাংলার মতো বার্সিটির গেটে?
মনে আছে, সব….সব। একদিন কাতুকুতু দেয়ার ছলে তোমার বুকে….।
স্টপ! স্টপ! জোর প্রতিবাদে থামিয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু হাসির দমকে পুতুলের গোলাপি শাড়ি, গোলাপি ঠোঁট, গোলাপি ব্লাউজ, গোলাপি মাংস…সমস্ত গোলাপি থর থর করে কেঁপে ওঠে।
ছাদের দিকে তাকায় মইন, ঝাড়বাতি নয়, মহানাগরিক সূর্যকিরণ পুতুলের ঝলমলে গোলাপিতে আছড়ে পড়েছে। অনেকদিন প্র জিপেগ গিলেই এক মহাচত্রের মধ্যে পড়ে যায় সে। পুতুল হঠাৎ দাঁড়ায়, জানো, অনেক বড় হয়েও আমি বাবার সাথে লুকোচুরি খেলেছি, বাবা লুকিয়ে থাকতো আমি খুঁজে বের করতাম, অথবা আমি লুকিয়ে….। দাঁড়াতে গিয়ে পুতুল টাল সামলে পড়ে যেতে নেয়। সোফা থেকে মইনও দাঁড়ায়—আজ খেলবে? আচ্ছা তুমি লুকোও, আমি খুঁজে ব্বে করি।
বিচিত্র ভঙ্গিতে ভূমণ্ডলের চারপাশে তর্জনী ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে পুতুল। তুমি খেলবে! ওহ গড! ফেনটাসটিক! কি যে একটা হোপলেসকে বিয়ে করেছিলাম। যাক শালা! চুকিয়ে বুকিয়ে ফেলেছি…..এই এই আমি লুকোচ্ছি, তুমি চোখ বোঁজো।
মইন চোখ বুজতেই রংচঙে আলোর শাঁসালো অন্ধকার ওর চোখ বিদ্ধ করে।
কুউউ…. কোকিলের মোন ডেকে ওঠে পুতুল।
সন্তর্পণে চোখ মেলে সমস্ত ঘরে দপদপ পা ফেলে মইন হাঁটে। খাটের পেছনে পুতুলের গোলাপি শাড়ি দেখা যাচ্ছে! কি শিশু মেয়েটা! ভাবতে ভাবতে খপ করে সে ওকে ধরতে যায়। হি হি করে দৌড় দিয়ে গিয়ে পুতুল হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
মইন দেখে লাল আলো, নীল আলো, হলুদ আলো…ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ওপর, পেয়েছি, পেয়েছি বলে। কি আশ্চর্য ভিবজিওর। পুতুল ক্রমশ অপ্সরা, ক্রমশ পৃথিবীর প্রথম নারী, যে পোশাককে অশ্লীল করে তোলে…..।
একটা গর্তের মধ্যে পা হড়কে পড়ে যায় মইন। চারপাশে তাকিয়ে কাপড় ঝেড়ে দাঁড়ায়। কিছুটা চোট লেগেছে পায়ে। মুশকিল হলো! দরজা খুলে খুকি হা হা। করে উঠবে না তো! একেবারে বিনা নোটিশে দুপুর থেকে হাওয়া সে।
হায় মইন! তুমি গিলে এসেছে! কোথায়….কার সাথে? নাহ এই মুহূর্তে খুকীকে ভাবতে ভালো লাগছে না।
৫.
চারপাসে শুধু চোখ দেখি। কি যে বিচিত্র সেসব চোখের আকৃতি। যেমন,
(ক) কাঙাল চোখ বাথরুমে, শাওয়ারের নিচে ডুবে যখন উদোম স্নানে ব্যস্ত থাকি, তখন চারপাশের দেয়ালে অনেকগুলো চোখকে কাঙালের মতো চেয়ে থাকতে দেখি। যাদের অনেকেই আমার পুরনো প্রেমিক অথবা একতরফা ভালোবেসেছে। আমাকে। তাদের প্রতি আমার সহানুভূতি ছিলো কিন্তু প্রশ্রয় ছিলো না।
(খ) কঠিন চোখ— মহেন্দ্র অথবা ইরফান অথবা আবদুল্লাহ ওদের একজন, ধরলাম মহেন্দ্ৰই, সোফায় বসে আমার সাথে বিভিন্ন আলাপে ব্যস্ত নানা এটা ঠিক না খুকি, রিকশা ভাড়ার ভয়ে তোমরা হলিডেগুলোতেও অন্তত কোথাও তেমন বেড়াতে যাওনা, এরকম একঘেয়ে জীবনে কেউ বাঁচতে পারে? তুমি রীতিমতো অনার্স গ্র্যাজুয়েট মেয়ে, শশুর শাশুড়ী চায় না বলেই চাকুরি করবে না, মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে, মইন এটা খুব অন্যায় করছে….তারপর ক্রমে ক্রমে নিজের হতাশার অতলান্তে তলিয়ে যেতে যেতে, তোমাকেই বা কী বলবো খুকি, জীবনের এতগুলো বছর চলে গেলো, কোন চাকুরিতে স্থির হতে পারলাম না, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমিই পলিটিক্সের শিরা হয়ে যাই। ভেরেন্ডা বাজানো ছাড়া আমার দ্বারা আর কিছুই হবে ….কিছুই হবে না….এরকম একটা হতাশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আমার হাতটিকে টেনে নেয় নিজের কম্পিত হাতের মুঠোয়, একমাত্র তোমরা এখানে এলে তোমার এখানে এলে…বলতে বলতে মহেন্দ্র যখন আমার নির্জন বাড়িটিতে আরও কিছুটা এগোতে চায়, তখনই মইনের দুটি কঠিন চোখ দরজা ফাঁক করে আমার দিকে চেয়ে থাকে। আমি এত্ত ভঙ্গিতে সরে যাইছি, ছি, ও আমাকে একদিনের জন্যও ফাঁকি দেয় না, অথচ আমি…।
(গ) নিষ্পাপ চোখ-—এই চোখ দুটোই আমাকে বেশি বিপন্ন করে তোলে। সেই চোখ আমার পরম আকাঙ্খিত শিশুটির। কি অদ্ভুত মায়াময় চাউনি। স্তন মুখে নিয়ে, ক্রন্দনরত অবস্থায়..কত বিচিত্র ভাবেইনা সেই চোখ আমাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। জানালা গলিয়ে যখন ইউক্যালিপ্টাস গাছে বাতাস শরীরে আছড়ে পড়ে, তখনই বুকের কাছে সেই চোখ নড়ে চড়ে ওঠে। ড্রয়িং রুমে হয়তো মইন পত্রিকার প্রতিটি অক্ষর খুঁটে খুঁটে পড়ছে। আমি উনুনে হালুয়া চড়িয়েছি: তিন নম্বর ছোট প্লেটটি শূন্য চোখে আমার দিকে তাকাতেই জল আসে আমার চোখে। এরকম ছোট ছোট অনেক জিনিস কিনেছি আশ্চর্য এক শূন্য অনুভব থেকে।
