তিস্তা উন্মাদের মত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তার শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে।
তেজেন্দ্র বজ্ৰাহরে মত চেয়ারের সঙ্গে আটকে আছে। নড়াচড়ার ক্ষমতাটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে।
সে কি বুঝতে পেরেছিল, এত বড় একটা ফণা লুকিয়ে রয়েছে অতিসুন্দর প্রিয় এই মানবীটির মাথায়! নাগিনী সব বিষ উদগীরণ করে দিয়ে চলে গেল।
.
৪.
অনেক-অনেকদিন আগের কথা।
তখন দেশে এত মানুষ ছিল না। তোক অনুপাতে বন জঙ্গল বেশী ছিল। অরণ্যেও ছিল বাঘ ভালুক হাতি হরিণ শূয়োর সাপ কীট পতঙ্গ আরও যা যা থাকার কথা সব ছিল।
এমন দুই অরণ্য, মাঝে এক নদী। খরস্রোতা তেমন না। ছোট ছোট ঢেউ। জোয়ারের সময় দুই কুল প্লাবিত হয়, ভাটায় জল অনেক দূরে সরে যায়। ডাঙায় ঘুরিয়া বেড়ায় কাদাখোঁচা ছোট বড় কাঁকড়া বক এবং আরও নানা ধরনের পাখি। সবাই খুব নিশ্চিন্ত আরামে দিন যাপন করে যেহেতু এই নদীতে মানুষের সমাগম বড় একটা হয় না।
দুই তীরে দুইটি গ্রাম। গুটিকয়েক গৃহস্থের বাস। কিছু সংখ্যক মানুষ নদীতে স্নান করিতে আসে। অনেকেই আসে না। কারণ অরণ্য ভেদ করিয়া নদীতে স্নান করিবার সাহস বা বাসনা তাহাদের থাকে না প্রধান কারণ নদীতে কুমীরের উপদ্রব। বনে বাঘের। অনেক মুনিঋষির বাস ছিল অরণ্যে। তাঁহারা কেউ সাধন ভজন করিতেন কেহ বা আশ্রম বানাইয়া শিষ্যদের লইয়া পঠন পাঠন চালাইনে। শিষ্যরা গুরুর নিকট পাঠাভ্যাস করিত। নদী হইতে জল আনিয়া রান্না বান্না করিত। তাহারা বাঘ ভালুক হাতি কুমীরকে ভয় করিত না।
তখন বন্য প্রাণীরাও এত হিংস্র হইয়া উঠে নাই। মানুষকে তাহারা সমাদর করিত। পরম হিতৈষী বন্ধু বলিয়া ভাবিত। মানুষও তাহাদের সেইভাবে মিত্র বলিয়া ভাবিতে শিখিয়াছিল।
নদীতে ছিল বিরাট এক কুমীর। এতদিন পর্যন্ত সে খুব শান্ত ছিল। কোনদিন স্নানরত মানুষের পা ধরিয়া টানাটানি করে নাই। গভীর জলে নিয়া তাহাকে ভক্ষণ করিবার প্রয়াস তাহার ছিল না।
একদিন অতর্কিতে উত্তরের পারে দেখা দিল এক বাঘিনী। বাঘিনীর মত রূপ অন্য কোন বাঘ বাঘিনীর ছিল না। তাহার যৌবনদীপ্ত চেহারা হইতে রূপ চুইয়া চুইয়া পড়িতেছে। ঋষিবালকেরা মুগ্ধ নয়নে বাঘিনীর সেই ভুবনভোলানো রূপ দেখিতে থাকিত। বাঘিনী কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ করিত না।
একদিন, তখন ছিল শীত ঋতু, কুমীর পাড়ে শুইয়া রোদ পোহাইতেছিল। সহসা বাঘিনী আসিয়া উপস্থিত। কুমীরকে দেখিয়া তাহার ঘাড়ের লোম ফুলিয়া উঠিল। দশদিক কাঁপাইয়া সে হুঙ্কার ছাড়িল। কুমীর চট করিয়া জলে ঝাপাইয়া পড়িল। তারপর মুখ ব্যাজার করিয়া বিরাট লেজ জলের উপর ক্রমাগত আছড়াইতে লাগিল।
তখন নদীর জলে ভাটা লাগিয়াছে। বাঘিনী ডাঙার উপর ছুটাছুটি করিতে করিতে তর্জন গর্জন শুরু করিয়া দিল। কুমীরও প্রকাণ্ড হা করিয়া তাহার করাতের মত দাঁত প্রদর্শন পূর্বক লেজ আছড়াইতে লাগিল। কেহই স্ব স্ব স্থান পরিত্যাগ করিল না।
জলের কুমীর জলে রহিল ডাঙার বাঘ ডাঙায়।
দিন কাটে। সূর্য ওঠে। অস্ত যায়। বছর আসে বছর যায়।
কালক্রমে দুই জনেরই বয়স হইল। যৌবন চলিয়া গেল। উভয়ের তেজ বিক্রম কমিয়া আসিতে লাগিল। কিন্তু কেহই নিজ নিজ স্থান পরিবর্তন করিল না।
আরও দিন কাটিয়া গেল।
দুই শরীরে বার্ধক্য নামিয়া আসিল।
এখন জলের কুমীর ডাঙায় উঠিয়া আসে। বাঘ আসিয়া জলের ধার ঘেঁসিয়া বসে।
দুই জনে পাশাপাশি বসিয়া আছে। তাদের মুখ পশ্চিম দিকে ফেরানো। সূর্য অস্ত যাইতেছে। তাহার তেজ ক্রমশ স্তিমিত হইয়া আসিতেছে।
সেইদিকে তাকাইয়া বসিয়া আছে দুইজন।
বিষণ্ণ সূর্যের রশ্মি তাহাদের উপর ঝরিয়া পড়িতেছে।
পথ, হে পথ – নাসরীন জাহান
আমার যদি আলাদা একটি গোপন ঘর থাকতো এই স্বপ্নটি আমি প্রায়ই দেখি। বিছানায় ল্যাপটে থাকা সবুজ চাদর পাল্টানোর সময়, অথবা ছাতলা পড়া ঘটর ঘটর ফ্যানের দিকে চেয়ে যখন শুয়ে থাকি, সেই ঘরটির কথা গম্ভীরভাবে মনে হয়। আমি যে ঘরটিতে থাকি, সেই ঘরটিও খুব ছিমছাম, গোছানো। যদিও মাঝে মাঝে একসেট ভালো সোফা, একটি ফ্রিজ, রঙিন টি.ভি. বিশেষ করে একটি টেলিফোন এসবের অভাব অনুভব করি। মনে হয় ফোন থাকলে মহেন্দ্র, ইরফান অথবা আবদুল্লাহর সাথে গল্প করে অনেক একঘেয়ে সময়কে মুখ করে তোলা যেতো। বুও এসবের অভাব সত্ত্বেও আমি আমার ছোেট রুম দুটোকে যথেষ্ট ভালোবাসি। বারান্দাটিকে ভালোবাসি, যেখানে দাঁড়িয়ে আমার অনেক নিঃসঙ্গ সময় অতিবাহিত হয়। আমার একটাই অসুবিধে একটি জিনিস একভাবে দেখতে খুব হাঁপিয়ে উঠি। তাই আমি আমার ঘরে যা-ই আসবাব আছে তাকেই অদলবদল করে মাঝে মাঝে অন্যরকম করার চেষ্টায় নানাভাবে সাজাই। খাট, ড্রেসিং টেবিল আয়না….এই যথাস্থান থেকে সরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় রাখলে ভেতরে এক আশ্চর্য অনাবিলতা অনু করি। তো কথা হচ্ছিলো ঘর নিয়ে। এতো যে মাঝে মাঝে টানা হ্যাচড়া তাতেও কিন্তু আমি কম হাঁপিয়ে উঠি না। কিন্তু জিনিসগুলো এক জায়গায় বেশিদিন স্থির থাকলে আমার যতটুকু শাস কষ্ট হয়, তার চেয়ে ওগুলোকে স্থানাস্ত্র করার কষ্ট যথেষ্ট কম। মনে হয় মাঝে মাঝেই আমি এক নতুন স্থানে সময় কাটাচ্ছি।
২.
এখন গভীর রাত।
দেড় বছরের শিশুর মতো টলমল হাঁটছে মইন। অনেক জরুরি ব্যাপার মনে থাকার কথা ছিলো আজ। মনে থাকেনি। সারাদিন শুধু একটি কথাই মনে থেকেছে তার অনেকগুলো জরুরি কাজ সারতে হবে। আর কিছু মনে থাকেনি। যা তোক পাঁচ পেগ গেলার পর যে কোন জরুরি ব্যাপারকেই ফানুস বানিয়ে উড়িয়ে দেয়া যায়, এমন একটা ভাবনা ওকে ফুরফুরে করে দেয়। যেন, যে পাঁচ পেগ, কিংবা দুই পেগ, কিংবা এক পেগ-যা-ই পান করে, যে পান করে তাকে কোন জরুরি অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়াটাই অন্যায়। তার কাছে যে কোন কৈফিয়ত চাওয়া অন্যায়। সে ঘরে। ফিরলে ঘরের মানুষের কুঞ্চিত হওয়া অন্যায়…..। অন্তত বিয়ের আগে মইন যখন দিনরাত বাংলা মদ, আর মেথরপট্টির মধ্যে থাকতো, তাই মনে হতো তার। আজও মনে হচ্ছে। অন্তত মইন তেমন অন্যায় বরদাস্ত করবে না। তাই সে বেশ দূরে মেইন রোডে রিকশা ছেড়ে দিয়ে রাজার মতো হাঁটতে শুরু করেছে।
