সব মানুষের নিজস্ব গল্প থাকে।
বিভাবতী গল্প বলেন। মনোযোগ দিয়ে শোনে তিস্তা। ঠাম্মাও গল্প বলতেন। সে গল্প শুনতে তিস্তার ভাল লাগতো। বিভাবতীর গল্প অন্য গল্প। অন্য মানুষ অন্য পরিবেশ। বু গল্প তো গল্পই।
ধীরে ধীরে শাশুড়ি বৌএর মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠতে লাগলো। এখন তিস্তা আর নিয়ম করে ওপরে ওঠে না। যখন মন চায় বিভাবতীর ঘরে চলে যায়। সম্পর্ক যখন গড়ে ওঠে নিজের থেকেই গড়ে ওঠে। বিভাবতীর মনও উন্মুখ হয়ে থাকে এই মেয়েটির আশায়। তার মেয়ে ছিল না। মেয়ে জুটলো। পড়ন্ত বেলায় ঠাকুর তার মনোবাঞ্ছা পূরণ করলেন।
কিন্তু মানুষের চাওয়ার বুঝি শেষ নেই।
এবার চাই দুটো কচি হাতের গলা জড়িয়ে ধরে আধ-আধরবে একটি ডাক, দিদা।
বিভাবতী কথাটা পাড়লেন, চার বছর হয়ে গেল এবার কোলে ছেলে আসুক। তিস্তা সলজ্জভাবে বললো, ছেলেই শুধু। মেয়ে না?
বিভাবতী তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, মেয়ে তো ভাল। খুবই ভাল। তবে কথাটা কি জানো বৌমা, বংশরক্ষার ব্যাপারটাও তো আছে। সম্পত্তি টাকা ধনদৌলত সব অন্যের হাতে চলে যাবে, ভাবতে কষ্ট হয়। তাই ছেলে-ছেলে করা।
আরও একটা বছর কেটে গেল।
তিস্তার ছেলে বা মেয়ে হলো না।
বিভাবতীর মন ভেঙে পড়ছে। শরীর ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। বড় বড় ডাক্তার আসছে। ঘরে ওষুধের পাহাড় জমছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। ডাক্তার বললেন, হাওয়া বদল করে দেখা যেতে পারে। অনেক সময় পরিবেশ বদলালে ফল পাওয়া যায়।
তেজেন্দ্র সঙ্গে করে নিয়ে বিভাবতীকে শিমুলতলার বাড়িতে রেখে এল। সঙ্গে রইলো তিস্তা।
দুদিনেই অস্থির হয়ে উঠলেন বিভাবতী। এভাবে রোগ সারাতে গিয়ে সংসারে বিপত্তি এসে পড়বে। খোকাকে একা রেখে আমি স্বস্তি পাচ্ছি নে। কলকাতায় যাওয়ার ব্যবস্থা করো বৌমা।
আবার কলকাতা।
ভাঙা মন জোড়া লাগছে না বিভাবতীর। উত্তরাধিকারী চাই।
তিস্তাকে ডাক্তার দেখানো হলো। ছোট একটা আপারেশনও করানো হলো কিন্তু ফল হচ্ছে না।
তিস্তা বললো, তোমাকেও ডাক্তার দেখাতে হবে।
তেজেন্দ্র উত্তর দিল, না। ছেলেরা বাঁজা হয় না।
হয়।
তর্ক করো না তিস্তা। যা জানো না তা নিয়ে তর্ক করো না।
তিস্তা এখন আর নববধূটি নেই। এ বাড়িতে এসে অনেক সুখ স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছে সে। তার মনে অসন্তোষের আগুন জ্বলে উঠলো। স্বার্থপরের গুষ্ঠী। যেমন মা তেমন ছেলে। শুধু বিষয়সম্পত্তি আগলাবার ফিকির। মা বলে, মেয়ে না— চাই ছেলে! ছেলে বলে পুরুষ বাঁজা হয় না! বেশ হয় না তো হয় না, একজন গাইনি দেখালে কি অঙ্গ ক্ষয়ে যাবে তোমার।
অসন্তোষ থেকে আসে ক্ষোভ।
দাবানলের মত ক্ষোভ তিস্তাকে গ্রাস করতে উদ্যত হলো।
শাশুড়ি তো একদিন বলেই বসলেন, কর্তার আমল হলে ছেলের আবার বিয়ে দিতেন।
আপনার আমলে কি করবেন?
মনোস্থির করতে পারছি না।
যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে খুব ধীরে সেই সম্পর্ক যায় মুহূর্তের ভুলে।
তিস্তা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তেজেন্দ্র মনোযোগ দিয়ে মনোস্তত্ত্বের একটা বই পড়ছিল। বই কেড়ে নিয়ে তিস্তা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। অতর্কিত এই আক্রমণের জন্য তেজেন্দ্র প্রস্তুত ছিল না। সে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। কি হয়েছে তিস্তা এমন করছো কেন?
তুমি আবার বিয়ে করো। উত্তেজনায় তিস্তার বুক ওঠা নামা করছে অতি দ্রুত।
কী বলছো পাগলের মত।
আমি পাগল, না তোমরা পাগল। তুমি তোমার মা। একজন বলে পুরুষ বাঁজা হয় না। আর একজন বলছে ছেলের আবার বিয়ে দেবে।
তেজেন্দ্ৰ ভয় পেয়ে বললো, বেশ আমি গাইনি দেখাবো।
তাতেও যদি বাচ্চা না হয় আবার বিয়ে করবে? নাকি পোয্যপুত্র নেবে। নাকি–। একটু থেমে আবার বললো তিস্তা, নাকি প্রয়োগ প্রথা।
ছিঃ! তেজেন্দ্র ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তিস্তা দরজা আগলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলো, দাঁড়াও পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো না।
তেজেন্দ্রর মুখ রক্তিম বর্ণধারণ করেছে। ফর্সা মানুষের বিপদ এখানেই, তাদের উত্তেজনা মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তেজেন্দ্র মুখমণ্ডল জ্বলন্ত আগুনের মত গনগন করছে, সে চেয়ারে এসে বসলো। প্রাণপণ শক্তিকে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করছে সে।
তিস্তা তার সামনে এসে দাঁড়ালো।
একটা বড় দম নিয়ে বলতে লাগলো, তোমাদের কীর্তিকলাপ জানতে বাকী নেই আমার। তোমরা না পারো এমন কাজ নেই।
তেজেন্দ্র নিরুত্তর। তিস্তার এমন রূপ সে আগে দেখেনি। সে দেখতে চায় তিস্তা কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে।
তোমরা, এই জমিদাররা না পারো এমন কাজ নেই। মানুষের ভাগ্য ভাল তোমাদের, গুটিকয়েক নিষ্ঠুর মানুষের দিন শেষ হতে চলেছে। এ বাড়ি যখন ভাঙা হবে, কত কঙ্কাল কত ব্যভিচার এর নিচে চাপা পড়ে আছে। কিন্তু কিছুই চাপা থাকবে না। তোমাদের গুম-ঘরের কথা আমি জানি। ঠাম্মার মুখে শুনেছি তোমাদের সেই ভয়ানক অত্যাচারের কাহিনী। সেই বংশের ছেলে তুমি। খুনী ডাকাতের রক্ত তোমার শিরায় শিরায়। বলে কিনা, ছিঃ। কী ছি, এ্যাঁ? তোমরা বাগান বাড়িতে রক্ষিতা পোষ না? পাপ পাপ। সেই পাপে জ্বলছো তুমি। তাই ভয়ে ডাক্তার দেখাতে চাও না। ভয় পাও। হা হা ভয়। তোমাদের এতগুলো ঝি পোর কথা আমি বুঝি না ভেবেছো। আমাদের বাড়িতে ঝি রাখা হয় না। শুধুই চাকর। ভাবো, আমি বুঝিনা কিছু। বিলাসিনীর মত সুন্দর ঝি রাখা হয় কেন। আমি বুঝি না ভেবেছো। ওকে দিয়ে একটা ছেলে করিয়ে নাও। বংশ বংশ করে তোমরা মা ব্যাটায় মরছে। সেই বংশরক্ষা হবে। ভগবানের কৃপা যে আমার ছেলে হয়নি। একটা নিষ্পাপ শিশুকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছি ভেবে আমার সুখ হচ্ছে। খুব সুখ। বুঝলে খুব-খুব সুখ।
