সে কী, বাপ হয়ে মেয়েকে কেপট রাখনে!
রাখুন তো আপনার তত্ত্ব কথা। বলে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। দিন, কী দেবেন দিন।
রতিকার চোখের সামনে তখন হাতিবাগান নাচছে। চৌধুরী বাড়ির নাম তিনি আগেই শুনেছে। এক লাফে মেয়ে কোটি পত্নি হয়ে যাবে। ভাবা যায়! একশো টাকার একটা নোট ঘটকের সামনে বাড়িয়ে ধরলেন রতিকান্ত।
তিস্তা এসে ঘরে ঢুকলো। এতক্ষণ কার সঙ্গে কথা বলছিলে বাপি?
তোর জন্যে সম্বন্ধ নিয়ে এসেছিল। রতিকান্ত মেয়ের কাছে কথা লুকোন না। পাল্টি ঘর। হাতিবাগানের চৌধুরীরা টাকার কুমীর। ছেলেটিও সুন্দর। লেখাপড়া জানে। এম. এ. পাশ।
তিস্তা চুপ করে রইলো।
তোর মত আছে তো মা?
একটু ভেবে নিয়ে উত্তর দিল তিস্তা, হ্যাঁ আছে। নিয়ম করে কলেজে যেতে আমার ভাল লাগছে না। ঠাম্মাও বলছিল, মেয়েদের নাকি সময়কালে বিয়ে করতে হয়। নইলে পরে পস্তাতে হয়।
এ বাড়ির লোক ও বাড়িতে গেল ও বাড়ির লোক এ বাড়িতে এল। বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।
মহাধুমধাম করে চার হাতের মিলন ঘটলো। লোকে ধন্য ধন্য করতে লাগলো। এমন মহামিলন সচরাচর দেখা যায় না। এক কথায় রাজ-জোক।
.
৩.
সুখের দিন উড়ে চলে। দুঃখের দিন লেংচে লেংচে হাঁটে।
দুই বছর কেটে গেল! কোথা দিয়ে এতগুলো দিন কেটে গেল তার হিসাব তেজেন্দ্র রাখে না। তিস্তা তো রাখেই না। সে খায় দায় ঘুরে বেড়ায়। যখন তখন তেজেন্দ্রকে আদর করে। ভালবাসার কথা শোনায়।
তেজেন্দ্রর ভাল লাগে। খুবই ভাল লাগে। কিন্তু বরাবর সে উচ্ছ্বাসহীন জীবনের বাহক। মনের কথা মুখে ফোটে না।
একদিন তিস্তা বললো, এ ভাবে শুয়ে বসে দিন তো আর কাটে না।
বাড়িতে দুটো গাড়ি রয়েছে। বাপের বাড়ি যাও রোজ।
তা তো যাচ্ছিই। তবে একা একা যেতে ভাল লাগে না।
আমিও তো যাই মাঝে মাঝে।
এখন থেকে রোজ যাবে। বাপি বলছিল, জামাই বাড়িতে একা বসে কি করে। সব সময় একা থাকা নাকি ভাল না।
আমি ছেলেবেলা থেকেই একা থাকতে ভালবাসি।
তোমার কোন বন্ধু নেই? বন্ধু ছাড়া মানুষ আমি দেখিনি আগে।
তেজেন্দ্রর ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে, কে বলেছে আমার বন্ধু নেই। দাদুর সঙ্গে গল্প করেই তো আমার দিন কেটেছে এতদিন।
কী সুখ যে পাও একটা বুড়োর সঙ্গে গল্প করে। আমি তো দাদুর আর্ধেক কথাই বুঝতে পারি না।
ক্ষুণ্ণভাবে বললো তেজেন্দ্র, বুড়ো হলে সবারই এরকম হয়।
তিস্তা আর কথা বাড়ালো না। চুপ করে গেল।
যে উচ্ছ্বাস আহলাদ নিয়ে দু বছর আগে এ বাড়িতে পা রেখেছিল তিস্তা সে আলোয় যেন ছায়া নামতে শুরু করেছে। একদিন রাতে তেজেন্দ্রকে আদর করতে করতে তিস্তা বললো, ক্লাবে ভর্তি হবো।
মনে মনে চমকে উঠলেও তেজেন্দ্র উত্তর দিল, বেশ তো।
এত সহজে যে এই ঘরমুখী মানুষটি ক্লাবের হৈ হট্টগোলের মধ্যে যেতে রাজী হবে তিস্তা বিশ্বাস করতে পারলো না। সংশয় দূর করার জন্যে আবার বললো, তোমার গায়েও বাইরের বাতাস লাগবে একটু। সারাক্ষণ তো বই মুখে বসে থাকো না হয় দাদুর সঙ্গে গল্প করতে যাও। একবার ভেবে দেখেছো আমার সময় কাটে কী করে।
তুমি ক্লাবে ভর্তি হয়ে যাও। গল্পের বই পড়তে যদি ভাল লাগে লাইব্রেরি থেকে আনিয়ে নিতে পারো।
তু তুমি ক্লাবে যাবে না! তোমাদের অনেক টাকা পয়সা কিন্তু তার মানে এই না যে শুয়ে বসে দিন কাটাবে। কাজের জন্যে তুমি ব্যবসা করতে পারো। তোমার সঙ্গে আমিও না হয় মাঝে মাঝে যাব।
কোথায় যাবে!
কেন, অফিসে।
তুমি যাবে আপিসে!
তিস্তা হাসতে হাসতে বললো, কেন অফিসে কি জুজু থাকে যে তোমার সুন্দরী বৌকে টুক করে গিলে খাবে। এভাবে বৌকে আগলে রেখো না-গো পড়ুয়া মশাই। লোকে বৌ-পাগলা বলবে যে।
তেজেন্দ্র তিস্তার কথার উত্তর দিল না। অহেতুক বাক্য ব্যয় করে সে মনোমালিন্যের সৃষ্টি করতে চায় না।
আরও দুটো বছর কেটে গেল।
হলধর বিশ্বাস মারা গেলেন। মহাধুমধাম করে শ্রাদ্ধ করলো তেজেন্দ্র। বহু লোক নিমন্ত্রিত হলো। সবাই ধন্য ধন্য করলো। এস্টেটের নায়েব বই তো নয় তার শ্রাদ্ধ স্বস্ত্যয়ন এমন জাঁকজমক করে হবে এ ঘটনা শুনেছে কেউ। লোকে বাপ মার শ্রাদ্ধই নমোনমো করে সারে আর এ তো পরমানব।
সময়ের পলিমাটিতে শোক দুখ সবই চাপা পড়ে যায় একদিন। তেজেন্দ্র এখন অনেকটা সামলে নিয়েছে। তার জীবনযাত্রা আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। যতদিন। হলধরদাদু বেঁচেছিলেন সে কাছারি ঘরে বড় একটা যেত না। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে হলধর প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন তেজেন্দ্রকে দিয়ে যে সে নিয়ম করে অন্তত ঘন্টা দুই তিনেক কাছারি ঘরে গিয়ে বসবে, কর্মচারিদের কাজ দেখবে।
তেজেন্দ্র তার কথা রেখেছে।
আর একটা কথাও সে রেখেছে। এতদিন পর্যন্ত সে নিয়ম করে বিভাবতীর ঘরে গিয়ে বসতো না। এখন যায়। শুধু নিজেই যায় না। প্রথম প্রথম তিস্তাকে নিয়ে যেত। এখন তিস্তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তিস্তা নিজে থেকেই যায়। তার বাল্যকাল কেটেছে ঠাকমার সঙ্গে। সেই অভ্যেসটা ভেতরেই ছিল। মাঝে কয়েকটা বছর পরিবেশ বদল হওয়ায় অভ্যাসে ছেদ পড়েছিল। কিন্তু কিছুই হারিয়ে যায় না। পুরনো অভ্যেস আবার ফিরে এসেছে। বিকেল হতেই গা ধুয়ে সাজগোজ করে সে ওপরে উঠে যায়। বিভাবতীর সঙ্গে গল্প করতে তার ভালই লাগে। ঠাম্মার
অদর্শনের অভাব অনেকটা পূরণ হয়।
