অতি যত্নে যেমন গাছের শ্রীবৃদ্ধি হয় না, নারায়ণীও হয়ে উঠলো অতিমাত্রায় আত্মসচেতন, উদ্ধত এবং অসহিষ্ণু। একদিন সে রতিকান্তকে বললো, আমার নামটা পাল্টে দাও। নারায়ণী থেকে আমি তিস্তা হতে চাই।
মা কষ্ট পাবে মা-মণি।
ঠাম্মাকে বোঝাবার ভার আমার। তুমি অন্য সব ব্যবস্থা করে দাও।
ব্যবস্থা হয়ে গেল। নারায়ণী তিস্তা হলো। রতিকান্ত প্রশ্ন করলেন, বুঝলুম পাত্র সৎবংশজাত, বিদ্বান, ধন সম্পত্তি আছে। বয়স যা বললেন তাতে আমার মেয়ের সঙ্গে মানাবে। পাত্র দেখতে কেমন?
পুষ্ট টিকির ওপর দিয়ে হাত বুলোতে বুলোতে ঘটক বললেন, কার্তিকের মত।
কার্তিককে আপনি দেখেছেন?
হ্যাঁ, বহুবার।
রতিকান্ত ধমক লাগালেন, মিছে কথা বলবেন না।
পুরহিতের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো, একবার দুবার দেখলে ভুলে যাওয়া যেত কিন্তু ফিবার ফুল বেলপাতা দিয়ে যাকে পুজো করতে হয়–।
ফুল না হয় বুঝলুম কিন্তু বেলপাতা তো শিবপুজোয় লাগে।
শিবঠাকুরের পুজোয় বেলপাতা লাগে বলে কি অন্য ঠাকুরের কাছে বেলপাতা অস্পৃশ্য মশাই।
এই মশাই সম্বোধন রতিকান্তর পছন্দ না হলেও তিনি উচ্চবাচ্য করলেন না। ঘটক যে পাত্রের সন্ধান এনেছে মনে হয় সবদিক দিয়ে সে নারায়ণী বা তিস্তার উপযুক্ত হবে।
রতিকান্ত চুপ করে গেলেও ঘটকের চুপ থাকা চলে না। এই কথা বেচেই তাকে খেতে হয়। সে যেমন দেবতার পূজারী বাদেবীকেও সে কম ভক্তি করে না। দু হাত কপালে ঠেকিয়ে সে বলে চললো, কার্তিক ঠাকুরে: পুজোর মজা কি জানেন স্যার, রামবাগানের মেয়েমানুষের নজর খুব উঁচু। তারা যেমন তেমন নৈবদ্য সাজিয়ে ঠাকুরকে খেতে দেয় না।
এখানে টিপ্পনী কাটার লোভ সামলাতে পারলেন না রতিকান্ত। বললেন, দেবতার নাম করে সবই তো যায় নিজের পেটে।
আশ্চর্য দক্ষতা পুরুষটির। সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করলো, নিজের পেটে আর কতটুকু জায়গা। গিন্নী, তাও তিনটি, ছেলে পুলে নাতি নাতনী, সে এক এলাহারি কাণ্ড। দুবেলা ঘরে ক’টা পাত পড়ে বলুন তো।
এতক্ষণ পর্যন্ত রতিকান্ত গম্ভীর মুখে কথা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এখন কৌতুকের ছোট্ট পাখিটা তার মনের মধ্যে ফরফর করে উড়তে শুরু করলো। তিনি হাসি মুখে উত্তর দিলেন, আপনার বাড়িতে ক’টা পাত পড়ে আমার জানার কথা নয় কারণ আমি জ্যোতিষ না।
গণকার না হয়েও আমি কিন্তু বলতে পারি আপনার বাড়িতে পাত পড়ে পাঁচটি।
রতিকার চোখ কপালে ওঠার যোগাড়। আপনি জানলেন কি করে?
কি করে জানলাম সেটা বড় কথা না। আসল কথা হচ্ছে কথাটা সত্যি কিনা। আরও বলছি। একটা নিরামিষ। দুটো মাছ মাংস সহকারে। আর দুটি মোটা ভাত ডাল একটা আলু কুমোড়ার ঘ্যাট, দুটো চাকর পুষছে তাদের রাদ্দ। গাড়ি চালকটির আহার যত্রতত্র অর্থাৎ কিনা তার ভোজনের নির্দিষ্ট স্থান নেই। গাড়ি চালাতে চালাতে যখন যেখানে সময় সুযোগ আসে। কিন্তু যে বাড়ির সঙ্গে সম্বন্ধ করতে যাচ্ছেন সে বাড়িতে দাসদাসীর হিসেব নেই। তাদের নায়েবের বরাদ্দ আফিমের মাত্রা শুনলে ভিরমি খাবেন। সাহেরা যে জাল টানিয়ে ব্যাট নিয়ে বল পেটাপেটি করে সেই বলের সাইজ।
সে কী! লোকটা এখনও বেঁচে আছে।
বেঁচে আছে কি, বহাল তবিয়তে লাটি ঠকঠকিয়ে বাড়িময় ঘুরছে। আর বাড়ির কথা কী বলবো। লাখনৌয়ের খুলখুলিয়ার নাম শুনেছেন তো। তার চেয়েও বড়, আর টাকার কথা যদি শোনেন।
আপনি কি ওদের সিন্দুকে উঁকি মারতে গিয়েছিলেন?
উঁকি মারতে হয় না স্যার। গন্ধেই বোঝা যায়। এই যেমন আপনাদের। ঠাট বাঁট আছে কিন্তু ধন সম্পত্তির ব্যাপারে। কিছু মনে করবেন না স্যার। মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল। আসলে কি জানেন হুজুর, এই ঘটকালি পেশায় এত বকতে হয় যে জিভের ব্রেকটা ফেল মেরে যায়। কি বলতে কি বলে ফেলি।
তার মানে আপনি যা যা বললেন তা আপনার জিভের ব্রেক ফেল করার ব্যাপার। বিশ্বাস না করার যুক্তি আছে।
ঘটক অম্লান বদনে স্বীকার করলো, তা আছে। কে কবে শুনেছে ঘটক হেরম্ব মৈত্রের মত সদাসত্য কথা বলে।
আপনি হেরম্ব মৈত্রের নাম শুনেছেন? রতিকান্ত বাঁকা চোখের প্রশ্ন।
শুনবো কি মশাই, তিনি সম্পর্কে আমার বড় দাদু ছিলেন। কপালের কি গেরো দেখুন সে বংশের সন্তান হয়ে কী ডাহা মিথ্যে কথা বলতে হচ্ছে আমাকে।
আপনার পদবী তো বলেছেন ভট্টাচার্য আর উনি মৈত্র। এক বংশ হলো কি করে।
ঐ লতায় পাতায় আর কি। রক্তের সম্পর্কই শুধু সম্পর্ক। লতা পাতারও একটা দাম আছে। এবার উঠবো। এই যে এতক্ষণ ধরে বকবকম করে গেলাম দুটো মিষ্টিও এল না। আর চৌধুরী বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে চাকর ছুটে আসবে আদর করে ঘরে বসাবে। পুঁটিম দ্বারিক ভীম নাগের বন্যা বইয়ে দেবে থালায়। অবিশ্যি তা নিয়ে দুঃখু করিনে। খেতে দেন নি, দেন নি। কিন্তু ঘটক বিদায় দিতে হবে মোটা টাকায়। আপনাদের মিষ্টি আমার মুখে রুচবেও না। প্রজাপতি ঠাকরুণের কৃপায় যদি কাৎলা মাছটা গেঁথে ফেলতে পারি আমাকে আর পায় কে।
রতিকান্তের চোখে মুখে আবার কৌতুক ফুটে উঠলো। সরস ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, আবার বিয়ে করবেন।
ভট্টাচার্য অম্লান বদনে উত্তর দিল, পাঁচ সাত বছর আগে হলে করতুম। তবে দিনকাল খুব তাড়াতাড়ি পাল্টাচ্ছে। গোঁড়া ব্রাহ্মণের ছেলেরা পৈতা ফেলে দিয়ে মদ মাংস খেতে শুরু করেছে। সেটা অবিশ্যি আমার সমস্যা নয়। তিন তিনটে বিয়ে করলুম একটাও ছেলে পয়দা করা গেল না। সাত আটটাই মেয়ে। তাও যা চেহারা, হা হতো যদি আপনার মেয়ের মত রূপ, দিতুম কোন রইস আদমির রাখেল করে।
